জামাই-শ্বশুরের ১৫ বছরের দ্বন্দ্ব মেটালো লিগ্যাল এইড

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫৩ এএম, ২৪ জুন ২০২২

লক্ষ্মীপুরের রামগতির আব্দুল ওদুদ খান সৌদি আরব যাওয়ার আগে ৫টি গরু ও ৮টি মহিষ তার শ্বশুর নূর মোহাম্মদের জিম্মায় রেখে যান। সেটি ছিল ২০০৭ সালের ঘটনা। এর প্রায় ১১ বছর পর দেশে ফিরে ২০১৮ সালে এসে দেখেন সেখানে ২০টি মহিষ ও ৭টি গরু হয়েছে। তবে ৩টি মহিষ মারা যায়। সেই গরু ও মহিষ ফেরত চাওয়া নিয়ে জামাই-শ্বশুরের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়।

এরপর ওই বিষয় নিয়ে মামলা হয়। সেই যে শুরু। এরপর তা বিচারিক আদালত থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে।

অবশেষে গরীব অসহায় দরিদ্রদের সেবা দেওয়ার জন্য সরকারি সহায়তাকারী সংস্থা সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড বিষয়টির একটি সুন্দর সমাধান দিয়েছে। নিজেদের দ্বন্দ্ব ও মনোমালিন্য ভুলে তাতে শ্বশুর ও জামাই খুশি হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুন) সুপ্রিম কোর্টের লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টা দীর্ঘ সালিশি বৈঠক শেষে বিষয়টি নিষ্পত্তি ও সমাধান হয়েছে।

২০০৭ সালে লক্ষ্মীপুরের রামগতির আবদুল অদুদ বিদেশ যান। সেখানে যাওয়ার আগে তার কেনা মহিষ ও গরু লালন-পালনের জন্য দিয়েছিলেন শ্বশুরকে। লালন-পালনের পর গবাদি পশুগুলো সংখ্যায় বেড়েছে। এক দশক পর বিদেশ থেকে দেশে ফেরেন অদুদ। ফেরত চান তার গবাদি পশুগুলো। কিন্তু সেগুলো দিতে অস্বীকৃতি জানান শ্বশুর নূর মোহাম্মদ। তদন্তের পর দায়রা আদালতের সিদ্ধান্ত যায় জামাই অদুদের পক্ষে। সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আসেন শ্বশুর।

মামলার বিষয়বস্তু শোনার পর হাইকোর্টের বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সালিশের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য উভয় পক্ষকে নির্দেশ দেন। দায়িত্ব দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে।

এরপর কয়েকঘণ্টা ধরে চলা সালিশি বৈঠকের পরই বিরোধ নিষ্পত্তি হয় জামাই-শ্বশুরের। সালিশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি মহিষের মধ্যে ৫টি বড় ও ৪টি ছোট মহিষ পাবেন অদুদ। আর ৬টি বড় ও ২টি ছোট মহিষ নেবেন শ্বশুর। বিরোধ নিষ্পত্তির এ সিদ্ধান্ত এখন অবহিত করা হবে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চকে।

সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের কর্মকর্তা রিপন পৌল স্কু জাগো নিউজকে জানান, লক্ষ্মীপুরের রামগতির আব্দুল ওদুদ খান সৌদি আরব যাওয়ার আগে ৫টি গরু ও ৮টি মহিষ তার শ্বশুরের জিম্মায় রেখে যান। ১১ বছর পর ২০১৮ সালে সৌদি থেকে ফিরে এসে দেখেন ২০টি মহিষ ও ৭টি গরু হয়েছে।

পরে ৩টি মহিষ মারা গেলে ১৭টি মহিষ থাকে। একপর্যায়ে এসব গরু-মহিষ শ্বশুরের কাছে ফেরত চান জামাই আব্দুল ওদুদ। কিন্তু শ্বশুর এসব ফেরত দিতে অস্বীকার করলে বিরোধ দেখা দেয়।

এ নিয়ে গ্রামে কয়েক দফা সালিশ হয়, কিন্তু তাতে কোনো সমাধান হয়নি। একপর্যায়ে জামাই সেগুলো উদ্ধারের জন্য লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পিটিশন মামলা করেন।

এডিএম কোর্ট পুলিশকে জামাই-শ্বশুরের বিরোধের বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন। পুলিশ তদন্ত করে গরু-মহিষ জামাইয়ের বলে সত্যতা পেলে আদালত জামাইকে তা বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দেন।

মামলাটি তদন্ত করে ২০২১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন রামগতি থানা পুলিশ। একই সঙ্গে গবাদিপশুগুলোও উদ্ধার করে জিম্মায় নেয় পুলিশ।

ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে গরু ও মহিষ নিজের দাবি করে আদালতে আবেদন করেন নূর মোহাম্মদ। এরপর এডিএম কোর্টের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে শ্বশুর লক্ষ্মীপুর দায়রা আদালতে যান।

পরবর্তীকালে দায়রা আদালত স্থানীয় একজন অধ্যক্ষের মাধ্যমে এ বিষয়ে আরেকটি তদন্তের নির্দেশ দেন। সে তদন্তেও ২০২১ সালের ১ ডিসেম্বর গরু-মহিষ জামাইয়ের বলে সত্যতা মেলে। লক্ষ্মীপুরের দায়রা জজ মো. রহিবুল ইসলাম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দেওয়া ওই আদেশ বহাল রাখেন।

তবে শশুর এখানেই থেমে থাকেননি। দায়রা আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্টে আসেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি।

এরপরই হাইকোর্ট বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসকে
নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পর বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে বিবাদমান দুই পক্ষ ও তাদের আইনজীবীদের নিয়ে সালিশে বসে লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা জজ ফারাহ মামুন ও সমন্বয়কারী রিপন পৌল স্কু। বৈঠকে দুই পক্ষই তাদের মতামত তুলে ধরেন।

সেই অনুযায়ী গরু-মহিষ নিয়ে জামাই শ্বশুরের বিরোধের বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে কয়েক ঘণ্টা দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়।

দীর্ঘ আলোচনার পর উভয়পক্ষের সম্মতিতে বিরোধীয় ১৭টি মহিষের মধ্যে বড় ৫টি ও ছোট ৪টি মহিষ জামাই আব্দুল ওদুদ আর বড় ৬টি ও ছোট ২টি মহিষ নূর মোহাম্মদ নিতে সম্মত হন। সবশেষে জামাই-শ্বশুর উভয়ই লিগ্যাল এইড অফিসে হওয়া সিদ্ধান্ত মেনে হাসি-খুশি হয়ে বাড়ি ফেরেন।

এফএইচ/ইএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]