‘আমি আলবদর বলছি’ বইয়ের লেখক কনডেম সেলে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৪২ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২২

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি স্বঘোষিত আলবদর আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীকে কনডেম সেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামি ‘আমি আলবদর বলছি’ ও ‘দুই পলাশী দুই মীরজাফর’ নামের দুটি বই লিখেছেন।

রোববার (৩ জুলাই) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য সদস্যরা হলেন বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার ও বিচারপতি কেএম হাফিজুল আলম।

মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, গণহত্যা, আটক, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পলাতক সাবেক ছাত্রসংঘ ও মুসলিম লীগ নেতা হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মো. লিয়াকত আলী (৬১) ও কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আমিনুল ইসলাম (৬২) ওরফে রজব আলীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেছিলেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। তাই সাতটি অভিযোগেই তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ওই মামলায় দুই আসামির মধ্যে হাওর এলাকার অধিবাসী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও আত্মস্বীকৃত আলবদরকে এম আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলীকে গ্রেফতর করেছে র‌্যাব। গত শনিবার (১ জুলাই) রাতে রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

নিয়ম অনুযায়ী রজব আলীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়েছিল। এরপর তাকে কারাগারে ফাঁসির সেলে (কনডেম সেলে) পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল।

তিনি জানান, যেহেতু গ্রেফতার হওয়া আসামি মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পলাতক ছিলেন তাকে আজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত করা হয়েছিল। পরে নিয়ম অনুযায়ী আসামিকে কারাগারের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসির সেলে রাখার নির্দেশ দেন আদালত। ট্রাইব্যুনাল থেকে মৃত্যু পরোয়ানা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল শুনানি করেন। আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।

এ বিষয়ে মামলার রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম আইনজীবী প্রসিকিউটর রানা দাসগুপ্ত জাগো নিউজকে বলেন, আমরা ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা পরিচালনা করেছিলাম। সেখানে দুজন আসামি পলাতক ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন আসামি আমিনুল ইসলাম ওরফে রজব আলী। ‘আমি আলবদর বলছি’ তার নিজের লেখা বই। সেখানে আসামি স্বীকার করেছেন তিনি আলবদর ছিলেন।

তিনি জানান, ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই মানবতাবিরোধী অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেন। এর আগে থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন। স্বঘোষিত আলবদর নেতা রজব আলীর বাড়ি কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আলীনগরে।

আসামির বিরুদ্ধে একাত্তরে অষ্টগ্রাম এলাকায় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও লুটপাটের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দেন।

তদন্ত সংস্থার তথ্যানুসারে, কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার আলীনগর গ্রামের রজব আলী ১৯৭০ সালে ভৈরব হাজী হাসমত আলী কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময় ইসলামী ছাত্রসংঘের কলেজ শাখার সভাপতি হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ভৈরবে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে তিনি অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেন এবং পরে এলাকায় ফিরে আলবদর বাহিনী গঠন করেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আটক হয়েছিলেন রজব। ১৯৭২ সালে তার বিরুদ্ধে দালাল আইনে তিনটি মামলা হয়েছিল, যাতে তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। কিন্তু দালাল আইন বাতিলের সুযোগে ১৯৮১ সালে রজব ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন। পরে ‘আমি আলবদর বলছি’ নামে একটি বই তিনি প্রকাশ করেন। ওই বইয়ে রজবের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগের আত্মস্বীকৃতি রয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এর আগে ২০১৬ সালের ১৮ মে ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে র‌্যাব তাকে আটক করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৮ সালের ৫ নভেম্বর তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক এম সানাউল হক জাগো নিউজকে বলেন, গ্রেফতার আমিনুলের বিরুদ্ধে অনেক আগেই ফাঁসির রায় হয়েছে। আসামি আমিনুল ‘আমি আলবদর বলছি’ ও ‘দুই পলাশী দুই মীরজাফর’ নামের দুটি বই প্রকাশ করেন। এসব বইয়ে তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৯৭৫ সালের শোকাবহ ১৫ আগস্টসহ বিভিন্ন বিষয় নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেন। বইয়ে নিজেকে তিনি ‘আলবদর কমান্ডার’ হিসেবে দাবি করেন। এসব বই ট্রাইব্যুনালে আমাদের তদন্ত সংস্থায় রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, তার বিষয়ে আমরা আগে থেকেই ট্র্যাকিং করছিলাম। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথেও যোগাযোগ ছিল। আমরা মনে করি ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনদণ্ড প্রাপ্ত যেসব আসামি পলাতক রয়েছে তাদের গ্রেফতারের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হোক।

তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে আমরা সব অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। তাই আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন। আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের সাজা কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এখন আসামিকে ফাঁসির কাষ্ঠে যেতেই হবে বলে জানান তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক সানাউল হক।

এফএইচ/এসএইচএস/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]