পারিবারিক আদালতের মামলার হালচাল

পারিবারিক দ্বন্দ্বের বলি অসহায় শিশু

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪৮ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০২২
ছবি জাগো নিউজ

একটি জাতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ মনে করা হয় শিশুকে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। কিন্তু দেশে ক্রমেই বাড়তে থাকা পারিবারিক কলহ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে অনেক শিশুকে। স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা আলাদা হয়ে যাওয়ার পর সন্তান কার কাছে থাকবে, এটা নিয়ে অধিকাংশ পরিবারে বিরোধের সৃষ্টি হয়। মা-বাবা দুজনই সন্তানকে নিজের হেফাজতে রাখতে চান। দুজনের মধ্য এক্ষেত্রে আপস না হলে আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি।

শিশুসন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতকারী নিযুক্তির জন্য পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ আইনে মামলা করেন মা-বাবা কিংবা তাদের অভিভাবক। মামলার পরই শিশুসন্তানকে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয় আদালতপাড়ায়। পুলিশের দফতর কিংবা কাঠগড়ায় এ ছোটাছুটিতে শিশু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। নীরবে তার মনে চলতে থাকে বিচ্ছেদের রক্তক্ষরণ, যা তাকে ঠেলে দেয় অগোছালো-অস্বাভাবিক জীবনে।

ঢাকায় কলহের মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম তিনটি পারিবারিক আদালতে পরিচালিত হয়। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত ছয় বছরে (২০১৬-২০২১ সাল) পারিবারিক আদালতে ৪৩ হাজার ৪৩৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার করার পর্যাপ্ত উপাদান না থাকায় পাঁচ হাজার ৭৫৭টি মামলা খারিজ হয়েছে। এক হাজার ৪৩৯টি মামলার রায় হয়েছে। এর মধ্যে অভিভাবকত্ব ও হেফাজত নিযুক্তির জন্য হয়েছে ১০ শতাংশ মামলা। অভিভাবকত্ব ও হেফাজত নিযুক্তির জন্য মামলার পর অনেক সময় আদালত সন্তানকে কোর্টে আসার জন্য আদেশ দেন। সন্তানের কাছে আদালত জানতে চান, কার কাছে থাকতে চায়। আদালতে শিশুদের উপস্থাপন করার পর তাদের মন-মানসিকতা ভেঙে পড়ে। এর কারণ হচ্ছে আদালতে শিশু আইনের কোনো শর্তই মানা হয় না। এর মধ্যে তো রয়ে গেছে অবুঝ শিশুকে নিয়ে দুই পরিবারের টানাটানি। শিশু বুঝতে পারে না এই অবস্থায় সে কী করবে। দুই পরিবারের মধ্যে শিশু যেখানে নিরাপদ থাকবে সেদিকে বিবেচনা করে রায় দেন আদালত। অনেক সময় দুই পরিবারের মধ্যে আপস-মীমাংসায় নিষ্পত্তি হয় মামলাগুলো। দুই পরিবারের মধ্যে টানাটানি ও আদালতে আসার কারণে মানসিকভাবে ভেঙে যায় অবুঝ শিশু। মূলত বাবা-মায়ের রেষারেষির কারণে সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সময় যদি কোনো বিচারক শিশু কার কাছে থাকবে তা নির্ধারণ করে দিতেন তাহলে এমন হতো না।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, ২০১৬ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ১০৩টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ২৪০টি এবং রায় হয়েছে ৩৩৫টি মামলার। পরের বছর ২০১৭ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৩৩০টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৯৮১টি এবং রায় হয়েছে ২৯৪টি মামলার। ২০১৮ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে সাত হাজার ৪৯২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৭৪১টি এবং রায় হয়েছে ১৯০টি মামলার। ২০১৯ সালে পারিবারিক মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৩৪৫টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে এক হাজার ৩৯১টি এবং রায় হয়েছে ২৭৫টি মামলার। ২০২০ সালে পারিবারিক আইনে মামলা হয়েছে আট হাজার ৪৫২টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৬৭৭টি এবং রায় হয়েছে ১৫৮টি মামলার।

গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে পারিবারিক আইনে মামলা হয়েছে তিন হাজার ৭১১টি। এর মধ্যে খারিজ হয়েছে ৭২৭টি এবং রায় হয়েছে ১৪৭টি মামলার। অনুসন্ধানে দেখা যায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক কলহের মামলা বেড়েই চলছে। এই পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অবুঝ শিশুরা। শিশুদের এই ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন আইনের সংশোধন।

আদালতের পরিবেশ দেখে স্বাভাবিকভাবে কথাও বলে না শিশু হাবিব

শারমিন জাহান রুপা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় পরিচয় হয় সতীর্থ জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে। পরিচয় থেকে পরিণয়। এই প্রেমের সম্পর্ক থেকে ২০০৫ সালে তাদের বিয়ে হয়। প্রথমে পরিবার তাদের বিয়ে মেনে নেয়নি। পরে অবশ্য অবস্থা বিবেচনায় দুই পরিবার বিয়ে মেনে নেয়। প্রথম দিকে তারা সুখে-শান্তিতে সংসার করছিলেন। কিছুদিন পর থেকে তাদের সংসারে ঝগড়াঝাটি শুরু। এরপর থেকে ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো। কোনো ক্রমেই থামতো না তাদের এই ঝগড়াঝাটি।

এরই মধ্যে বিয়ের চার বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০০৯ সালে তাদের ঘর আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। নাম রাখা হয় হাবিব রায়হান। সন্তান জন্মের পর রুপা মনে করছিলেন তাদের সংসারে শান্তির বাতাস বইবে। চিত্র সম্পূর্ণই বিপরীত দেখা যায়। অশান্তি ক্রমেই বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ২০১৬ সালে সাদিয়াকে তালাক দেন তার স্বামী জাহিদুল।

jagonews24মা-বাবা উভয়কেই পাশে চায় শিশুরা-প্রতীকী ছবি

বিচ্ছেদের পর সন্তান হাবিবকে নিয়ে দুজনের মধ্যে শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। হাবিবের বাবা চান সন্তানকে তার সঙ্গে রাখতে, একই চাওয়ায় লড়াই জারি রাখেন রুপাও। তাদের এই লড়াই গড়ায় ঢাকার আদালত পর্যন্ত। শিশু হাবিবকে নিজের হেফাজতে রাখতে ২০১৭ সালে আদালতে মামলা ঠোকেন রুপা। মামলায় বিবাদী করা হয় জাহিদুলকে। সেই মামলায় মা-বাবার সঙ্গে দৌড়াতে হচ্ছে হাবিবকেও। এই দৌড়ে ছোট্ট হাবিব এখন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। যাদের জন্য হাবিবের দুনিয়ার আলো দেখেছে, যাদের কোলে-পিঠে হেলতে-দুলতে সে স্নেহ-মায়া শিখছিল, তাদের এ লড়াই মানসিকভাবে মুষড়ে দিয়েছে হাবিবকে। সে এতোটাই ভেঙে পড়েছে যে, এখন স্বাভাবিকভাবে কারও সঙ্গে কথাই বলে না। আদালতের বারান্দায় ছোটাছুটি, কাঠগড়ায় যুক্তিতর্কের চেঁচামেচি তাকে যেন বিষিয়ে তুলেছে।

আদালতের বারান্দায় কথা হচ্ছিল ১২ বছরের শিশু হাবিবের সঙ্গে। সে জাগো নিউজকে বলে, ‘আমাকে নিয়ে বাবা-মায়ের মধ্যে মামলা চলছে। মামলার জন্য মায়ের সঙ্গে আমাকেও আদালতে আসতে হয়। আমি তো এখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ি। আমি বাবা-মা দুজনকেই ভালোবাসি। আমি দুজনকেই চাই।’

শিশু হাবিবের মা শারমিন জাহান রুপা বলেন, ‘আমাদের প্রেমের বিয়ে। বিয়ের পর সংসারে এ সন্তান আসে। আমার ও আমার স্বামীর মধ্যে তালাক হয়েছে। হাবিব আমার কাছে থাকে। তার বাবাও তাকে নিতে চায়। আমি তাকে নিজ হেফাজতে রাখার জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করেছি।’

সন্তানের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করে রুপা বলেন, ‘মামলার পর আমার ছেলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সে ঠিকভাবে কারও সঙ্গে কথা বলে না। ঠিকভাবে খেতে চায় না। সবসময় অন্য মনষ্ক থাকে। আমি আমার ছেলেকে চাই। আশা করি আদালত আমার পক্ষে রায় দেবেন।’

হাবিবের বাবা জাহিদুর রহমান পলাশ বলেন, ‘হাবিব আমার সন্তান। তাকে নিজ হেফাজতে রাখতে তার মা আদালতে মামলা করেছেন। আমাকে মামলার বিবাদী করা হয়েছে। আইনগতভাবে মামলায় আমি জিতবো। আমার সন্তানকে আমিই লালন-পালন করতে চাই।’

হাজারো মানুষের ভিড়ে চুপসে থাকে সায়েমা

লালমনিরহাটের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন পরশ ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা। ২০১৩ সালে বিয়ে করেন লালমনিরহাটের মেয়ে রোকসানা আক্তারকে। বিয়ের পর রোকসানাকে নিয়ে ঢাকার লালবাগের একটি বাসায় ওঠেন পরশ। দু-তিন মাস তারা ভালোই সংসার করছিলেন। এরপর সামান্য বিষয় নিয়ে তাদের ঝগড়া শুরু হতে থাকে। সংসারে সুখের কথা চিন্তা করে পরশ নওগাঁ শহরে বাসা ভাড়া করে দেন রোকসানাকে। এর মধ্যে বিয়ের তিন বছর পর তাদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান, যার নাম রাখা হয় সায়েমা । ঢাকা থেকে সেই বাসায় গিয়ে মেয়েকে দেখে আসতেন পরশ।

একপর্যায়ে পরশ মেয়েসহ রোকসানাকে ঢাকায় আনার কথা বলেন। কিন্তু রোকসানা তাতে সায় দেন না। তিনি মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে বড় করার কথা বলেন। পরশ অনেক অনুনয়ের চার মাস পর সায়েমা নওগাঁ থেকে তার ঢাকার বাসায় নিয়ে আসেন মেয়ে সায়েমাকে।

পরশের অভিযোগ, রোকসানা ছিলেন দাম্পত্য জীবনের প্রতি উদাসীন। সংসারের দায়-দায়িত্ব পালনেও তার মানসিক অপরিপক্বতা ছিল। এরই মধ্যে রোকসানার মা ও বাবা তাদের ঢাকার বাসায় আসেন। সেখানে ঝগড়াঝাটির একপর্যায়ে পরশের মা ও বোনকে গালিগালাজ করে চলে যান তারা।

পরশের দাবি, ২০১৮ সালের প্রথম দিকে রোকসানা কিছু স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ এক লাখ টাকা নিয়ে তাকে না জানিয়ে সায়েমাকে নিয়ে তার মায়ের কাছে নওগাঁ শহরে চলে যায়। চারদিন পর পরশ ও তার বোন রোকসানাকে ফিরিয়ে আনতে সেখানে গেলে তাদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে শ্বশুরের পরিবার। এমনকি পরশের বোনকে মারধরও করা হয়। এসময় তারা পাশের একটি বাসায় আশ্রয় নেন। এরপর রোকসানা তার শিশুসন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাটে চলে যান। পরশ কোনো উপায় না পেয়ে এক মাস পরে সন্তানের অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার একটি আদালতে মামলা করেন। মামলায় বিবাদী করেন রোকসানা, তার মা লায়লা ও বাবা সামিউলকে।

সেই মামলার কার্যক্রমে অংশ নিতে প্রতি নির্ধারিত তারিখে শিশুসন্তান সায়েমাকে নিয়ে আদালতে আসেন রোকসানা । আদালতপাড়ায় হাজারো মানুষের ভিড়ে চুপসে থাকে সায়েমা। কারও সঙ্গে কথাও বলতে চায় না শিশুটি।

আদালত প্রাঙ্গণে শাহাদাৎ হোসেন পরশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘রোকসানা ও তার পরিবার কুটিল মনের অধিকারী। তারা আমার সন্তান লালন-পালনে অপারগ। তাই আমি আমার সন্তানকে নেওয়ার জন্য আদালতে মামলা করেছি।’

অন্যদিকে রোকসানার অভিযোগ, ‘পরশ ভালো মানুষ নন।’ তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরশ আমার সঙ্গে সব সময় খারাপ আচরণ করতেন। তাই আমি আমার সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে এসেছি। বাচ্চাকে কষ্ট করে বড় করছি। আমি আমার সন্তানকে দেব না।’

jagonews24হাজারো মানুষের ভিড়ে আদালতপাড়ায় চুপসে থাকে অসহায় শিশু-ফাইল ছবি

মেয়ে সায়েমার মানসিক কষ্টের কথা স্বীকার করে রোকসানা বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মামলা-মোকদ্দমার কারণে শিশুসন্তান মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। জানি না আমার সন্তানের কপালে কী রয়েছে।’

শারমিন জাহান রুপা ও শাহাদাত হোসেন পরশের মতো অনেকে সন্তান চেয়ে মামলা করেন পারিবারিক আদালতে। মামলার পর দিনের পর দিন আদালতের বারেন্দায় ঘোরাঘুরি করতে থাকেন। বিচারকের নির্দেশে অনেক সময় শিশুসন্তানকে আনতে হয় আদালতে।

আদালতে মানুষের ভিড় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ না থাকায় চুপসে যায় অসহায় শিশুরা। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে অনেক শিশু। স্বামী-স্ত্রী বিচ্ছেদের সময় শিশুসন্তান কার কাছে থাকবে এটা যদি কোনো বিচারক ঠিক করে দিতো তাহলে এ ধরনের হয়রানির শিকার হতো না বলে মন্তব্য করেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

আইনে যা বলা রয়েছে

বাংলাদেশ পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ ১৯৮৫-এর ৫ ধারা মতে, সন্তানের কাস্টডির (হেফাজত) বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একচ্ছত্র এখতিয়ার পারিবারিক আদালতের। কাস্টডি প্রদানের ক্ষেত্রে আদালত কী কী বিবেচনা করবেন, সেগুলো গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট, ১৮৯০-এর ১৭ ধারায় বিস্তারিত বলা রয়েছে। ওই ধারার বিধান মতে, নাবালক-নাবালিকা যে ধর্মীয় অনুশাসনের অধীন, সেই অনুশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং তার সার্বিক কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনা করে আদালত অভিভাবক নিয়োগ করবেন। নাবালক-নাবালিকার কল্যাণ কী হবে, তা নির্ধারণ করা হবে নাবালক-নাবালিকার বয়স, লিঙ্গ, ধর্ম, প্রস্তাবিত অভিভাবকের চরিত্র, সামর্থ্য এবং নাবালকের সঙ্গে নৈকট্য ও আত্মীয়তার সম্পর্ক, মৃত মা-বাবার কোনো ইচ্ছা (যদি থাকে) এবং প্রস্তাবিত অভিভাবক নাবালক-নাবালিকার সম্পত্তির বিষয়ে সম্পর্কযুক্ত কি না ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে। এ বিষয়ে নাবালক-নাবালিকার কোনো বুদ্ধিদীপ্ত মতামত থাকলে আদালত সেই মতামতকেও প্রাধান্য দেবেন।

শিশু আইনে রয়েছে—কোনো শিশু যখন আদালতে উপস্থিত হবে, তখন আদালতের পরিবেশ হবে অন্যরকম। আদালতে লাল কাপড় মোড়ানো থাকবে না। কোনো আইনজীবী কালো পোশাক পরতে পারবেন না। আদালতের ভেতর শিশু ছাড়া অন্য কেউই থাকবে না।

কিন্তু আমাদের দেশে এসব কিছুই মানা হয় না। তাই প্রতিনিয়ত শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক পরিবেশ দেখে ভেঙে পড়ে অবুঝ শিশুরা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার জাগো নিউজকে বলেন, ‘মুসলিম আইন অনুযায়ী বাবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আইনগত অভিভাবক। মা হচ্ছেন সন্তানের তত্ত্বাবধায়ক। সন্তানের মা যদি বাবার কাছ থেকে আলাদা থাকেন কিংবা তাদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়, তাহলে মা তার সন্তানের তত্ত্বাবধান করার ক্ষমতা হারাবেন না। ছেলের ক্ষেত্রে সাত বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ের বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত মা সন্তানদের নিজের কাছে রাখতে পারবেন। সন্তানের ভালোর জন্য যদি তাকে মায়ের তত্ত্বাবধানে রাখার আরও প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে এ বয়সসীমার পরও মা সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারবেন। এজন্য ক্ষেত্রবিশেষে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন হতে পারে। মা যদি দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে সন্তানকে নিজের হেফাজতে রাখার ক্ষমতা হারাতে হতে পারে তাকে।’

ঢাকার আদালতে বেশিরভাগ পারিবারিক আইনের মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী মলয় কুমার সাহা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভিভাবকত্বের মামলার কারণে অসহায় শিশু মানসিভাবে ভেঙে পড়ে। মা-বাবার দ্বন্দ্বের বলি হয় অসহায় শিশু। কারণ শিশুকেও আদালতে আসতে বলা হয়। আদালতের পরিবেশ দেখতে হয় শিশুকে। শিশু আইন মানা হয় না আদালতে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সময় যদি কোনো বিচারক শিশু কার কাছে থাকবে তা নির্ধারণ করে দিতেন তাহলে এমন হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিশু আইনে রয়েছে, কোনো শিশু যখন আদালতে উপস্থিত হবে, তখন আদালতের পরিবেশ হবে অন্যরকম। আদালতে লাল কাপড় মোড়ানো থাকবে না। কোনো আইনজীবী কালো পোশাক পরতে পারবেন না। আদালতের ভেতর শিশু ছাড়া অন্য কেউই থাকবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে এসব কিছু মানা হয় না। তাই শিশুরা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানজিম আল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘অভিভাবকত্বের মামলায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে শিশুরা। সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতে নেওয়ার জন্য বাবা-মা রীতিমতো যুদ্ধে নামেন। ফলে শিশুদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অনেক সময় আদালত সন্তানকে কোর্টে আসার জন্য আদেশ দেন। সন্তানের কাছে আদালত জানতে চান, কার কাছে থাকতে চায় ওই শিশু। বাবা-মায়ের রেষারেষির কারণে সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আয়েশা সুলতানা বলেন, ‘শিশুরা আদালতের পরিবেশ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। তাদের মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়। কোমল মন শক্ত হয়ে যায়। মানুষের প্রতি তাদের আস্থা কমতে থাকে। এর প্রভাব তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। শিশুদের বিনা প্রয়োজনে আদালতে নেওয়া মোটেও ঠিক নয়। যতদূর সম্ভব তাদের আদালতের বাইরে রাখতে হবে। এতে শিশুরা মানসিক সমস্যায় ভুগবে না।’

জেএ/এসএইচএস/জিকেএস

অভিভাবকত্বের মামলায় সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়ে শিশুরা। সন্তানের অভিভাবকত্ব বা হেফাজতে নেওয়ার জন্য বাবা-মা রীতিমতো যুদ্ধে নামেন। ফলে শিশুদের মনোজগতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। অনেক সময় আদালত সন্তানকে কোর্টে আসার জন্য আদেশ দেন। সন্তানের কাছে আদালত জানতে চান, কার কাছে থাকতে চায় ওই শিশু। বাবা-মায়ের রেষারেষির কারণে সন্তানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অভিভাবকত্বের মামলার কারণে শিশুরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। মা-বাবার দ্বন্দ্বের বলি হয় অসহায় শিশু। কারণ শিশুকেও আদালতে আসতে বলা হয়। আদালতের পরিবেশ দেখতে হয় শিশুকে। শিশু আইন মানা হয় না আদালতে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের সময় যদি কোনো বিচারক শিশু কার কাছে থাকবে তা নির্ধারণ করে দিতেন তাহলে এমন হতো না।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।