ফারইস্ট লাইফে লুটপাট: সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল কারাগারে

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪১ পিএম, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

গ্রাহকের টাকা আত্মসাতের মামলায় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

শুক্রবার (২৩ সেপ্টেম্বর) চার দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাকে ফের আট দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। অন্যদিকে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা তাদের রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

এর আগে ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম তার চারদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তারও আগে ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রশিদুল আলম তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আহম্মেদ দুইদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এদিন মামলার আসামি কোম্পানিটির সাবেক পরিচালক ও শিল্পপতি এমএ খালেক এবং তার ছেলে রুবায়াত খালেককে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর শাহবাগ থানায় করা মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১৫ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অন্যদিকে, আসামির পক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে দুদিন জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দেন।

গ্রাহকের ৮০০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে সেপ্টেম্বরের শুরুতে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। মামলার পর তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ।

এক সময় ভালো ব্যবসা করা ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন লুটপাটের তথ্য বেরিয়ে এলে গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিতে ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ রহমত উল্লাহকে চেয়ারম্যান করে নতুন পর্ষদে পরিচালক হিসেবে রাখা হয় মোহাম্মদ সানাউল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের সিইও মোহাম্মদ সানাউল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও বিমা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. মোফাজ্জল হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল গাজী মো. খালিদ হোসেন, স্নেহাশীষ অ্যান্ড কোম্পানির পার্টনার স্নেহাশীষ বড়ুয়া, একাত্তর মিডিয়ার প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মোজাম্মেল হক, জি সেভেন সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান সাজেদুর রহমান, জনতা ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জিকরুল হক এবং নর্দান ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের সাবেক চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম চৌধুরীকে।

বিএসইসি থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার ১৫ দিনের মাথায় কোম্পানিটির সিইও পদ থেকে হেমায়েত উল্লাহকে বহিষ্কার করে বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ। আইডিআরএ’র এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রে হেমায়েত উল্লাহর বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, আর্থিক অনিয়ম, বিমা পলিসি গ্রাহক ও বিমাকারীর স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর এবং নিয়ম পরিপন্থি কর্মকাণ্ডের তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে আইডিআরএ’র নজরে এসেছে। বিমা গ্রাহকদের অভিযোগসহ অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

এছাড়া হেমায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে নিজ ভোগদখলে রেখে এবং মিথ্যা তথ্য সম্বলিত সম্পদ বিবরণী দাখিলের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে এবং তার বিদেশগমনে জারি করেছে নিষেধাজ্ঞা। এ সংক্রান্ত তথ্য আইডিআরএ’র কাছে রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এরপর গত বছরের ২১ ডিসেম্বর হেমায়েত উল্লাহকে কোনো বিমাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ না দিতে নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। সব বিমা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও সিইও বরাবর পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, হেমায়েত উল্লাহ ২০১১ থেকে ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে উক্ত বিমা কোম্পানিতে (ফারইস্ট ইসলামী লাইফ) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি বিমা আইন, ২০১০ ও বিমা আইনের বিভিন্ন বিধিবিধান অনুযায়ী কোম্পানি পরিচালনার জন্য দায়ী থাকবেন মর্মে তার নিয়োগপত্রে সুস্পষ্টভাবে শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্বকালে কোম্পানিতে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে মর্মে সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়। এ জন্য তিনি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দায়ী।

এদিকে লুটপাটের শিকার হওয়া নানা সমস্যায় পতিত ফারইস্ট লাইকে উদ্ধারে নেমেছে চট্টগ্রামভিত্তিক এক শীর্ষ ব্যবসায়ী গ্রুপ। পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানিটির বিপুল শেয়ার কিনে গ্রুপটি ফারইস্ট লাইফের দখল নেয়।

এদিকে বিএসইসির এক তদন্তে উঠে আসে, বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা কোম্পানির আমানতের বিপরীতে অবৈধ ঋণ সুবিধা নিয়ে ৪২১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন উদ্যোক্তা পরিচালক এমএ খালেক।

অভিযোগ, এর বাইরে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে অবৈধ বিনিয়োগ ও ঋণের মাধ্যমে কোম্পানির ৬৫৯ কোটি টাকা পাচার করেছেন নজরুল, এমএ খালেক ও অন্যান্য পরিচালক। কোম্পানির কর্মচারীদের নামে দুটি সমবায় সমিতি বানিয়ে আরও ১৯১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা। সব মিলিয়ে ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেছেন। তবে আত্মসাতের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা আমানতের ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকার কোনো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি।

২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় জীবন বীমা কোম্পানিতে পরিণত হয় ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এক সময়ের দেশের শীর্ষস্থানীয় এ প্রতিষ্ঠানটি লুটপাটের কারণে এখন বিমাকারীর দাবি মেটাতে পারছে না। বিমা দাবি নিষ্পত্তি না করায় আইডিআরএতে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে। কোম্পানিটি ২০০৫ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

১০ বছর ধরে লুটপাট চললেও এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি আইডিআরএ। সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন একসময় ফারইস্ট লাইফে উচ্চপদে চাকরি করেছেন। পরবর্তীকালে এমএ খালেকের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করেছেন; ফারইস্ট লাইফে পরিচালক পদেও ছিলেন। ফারইস্ট লাইফ ও এর কয়েকজন উদ্যোক্তা-পরিচালকের মাধ্যমে সুবিধাভোগী হওয়ায় কোম্পানিটির অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি আমলে নেননি বলে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

অবশ্য ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন তিনি। কিন্তু তদন্ত কমিটি ফারইস্ট লাইফের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করে।

জেএ/জেএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।