তাজরীন ট্র্যাজেডি

ছয় পুলিশসহ ২৬ সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১২ পিএম, ২৩ নভেম্বর ২০২২
অগ্নিকাণ্ডের পর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় তাজরীন ফ্যাশনস

‘কাল কভু চুপ নাহি রয়, কথা কয়, সে যে কথা কয়’- কবি সুফিয়া কামালের এ পঙক্তি যেন ভুল হতে চলেছে তাজরীন ট্র্যাজেডির ঘটনায় করা মামলায়। দিন-মাস-বছর গড়িয়ে পার হয়ে গেলো এক দশক, তারপরও শেষ হয়নি বিচার! এমনকি মামলার ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১১ জন। সাক্ষ্য দিতে না আসায় ছয় পুলিশ সদস্যসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীরা আদালতে হাজির হচ্ছেন না। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় মামলা শেষ করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। এ অবস্থায় আলোচিত এ ঘটনার মামলা শেষ হতে আর কতদিন লাগবে জানে না কেউ।

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর রাজধানীর অদূরে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরীন ফ্যাশনস নামের পোশাক কারখানায় আগুন লাগে। ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন নিহত হন, যাদের প্রায় সবাই-ই ওই কারখানার শ্রমিক ছিলেন। এতে আহত ও দগ্ধ হন আরও দুই শতাধিক শ্রমিক।

আলোচিত ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারকাজ চলছে ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। মামলাটির বিচার শুরু হওয়ার সাত বছর পার হয়েছে। এ সময়ে ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১১ জন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, সাক্ষীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও তারা আদালতে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হচ্ছেন না। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় মামলা শেষ করতে পারছে না রাষ্ট্রপক্ষ। অনেকটা একই অভিযোগ আসামিপক্ষেরও। তাদের মতে, সাক্ষীরা হাজির না হওয়ায় মামলাটি গতি পাচ্ছে না। মামলাটি দ্রুত শেষ হলে ন্যায়-অন্যায় আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।

আরও পড়ুন: খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সাক্ষীদের

মামলার নথি থেকে জানা যায়, আলোচিত এ মামলায় ২০১৬ সালে ৫ জন, ২০১৭ সালে দুজন, ২০১৯ ও ২০২১ সালে একজন করে মোট দুজন এবং ২০২২ সালে এ পর্যন্ত দুজন সাক্ষ্য দিয়েছেন। ২০১৮ ও ২০২০ সালে কোনো সাক্ষ্য হয়নি। চলতি বছরের ৪ অক্টোবর আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার দিন ছিল। তবে ওইদিন সাক্ষী উপস্থিত না হওয়ায় আদালত পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী বছরের ১ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।

ছয় পুলিশসহ যাদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা
বার বার আদালত থেকে সমন পাঠানোর পরও ২৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হননি। এদের মধ্যে ছয়জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন, যারা এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ছয় পুলিশ সদস্যসহ ২৬ সাক্ষীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এরপরও তারা আদালতে উপস্থিত হননি বা তাদের গ্রেফতার করে সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত করা হয়নি। আলোচিত এ মামলার সাক্ষীদের এমন আচরণে হতাশ রাষ্ট্রপক্ষ।

জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া ছয় পুলিশ সদস্য হলেন- ঘটনার (অগ্নিকাণ্ডের) সময়ের আশুলিয়া থানার পুলিশ পরিদর্শক এস এম বদরুল আলম, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোস্তফা কামাল, উপ-পরিদর্শক মো. হাফিজুর রহমান, সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী উপ-পরিদর্শক মো. জাহিদুর রহমান, উপ-পরিদর্শক মো. রবিউল আলম ও এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম।

আরও পড়ুন: বিচারহীনতার কারণে তাজরীনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে

এছাড়াও জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া অন্য ২০ সাক্ষী হলেন -আশুলিয়ার বাসিন্দা মো. মঞ্জুর আলম, তাজরীন ফ্যাশনসের কর্মচারী চায়না বেগম, ধলা মিয়া, আকলিমা, রাবেয়া খানম, আরিফা, নূরজাহান, মো. আকাশ, মো. শাহীন, শামীম, মো. মোক্তার, মো. আলম, মোছা. পারভীন, মোর্শেদা বেগম, শ্যামলী আক্তার, মমিনুর রহমান, আলেনুর, রমেসা বেগম, আরফুজা বেগম ও জব্দ তালিকার সাক্ষী মো. আলী হোসেন।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি এ কে এম শাহনেওয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে দায়ের করা মামলাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মামলার ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১১ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ছয় পুলিশ সদস্যসহ ২৬ সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হচ্ছেন না। সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় মামলাটি শেষ করা যাচ্ছে না। সাক্ষীদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেন না। মামলার সাক্ষ্য দিতে সাক্ষীদের কোনো আগ্রাহ-ই যেন নেই।

ছয় পুলিশসহ ২৬ সাক্ষীর বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা

আলোচিত এ মামলা শেষ করতে আর কতদিন লাগবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলেন, মামলাটি শেষ করতে কত সময় লাগবে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। সাক্ষী এলে (আদালতে উপস্থিত হলে) ছয় মাসে শেষ করে দেওয়া সম্ভব। তবে সাক্ষী না এলে আরও ১০ বছরেও শেষ হবে না।

আরও পড়ুন: উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চান তাজরীন ফ্যাশনের আহত শ্রমিকরা

আসামিপক্ষের আইনজীবী এ টি এম গোলাম গাউস বলেন, অধিকাংশ তারিখে মামলার সাক্ষী আদালতে হাজির হচ্ছেন না। সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মামলাটি গতি পাচ্ছে না। আমরা চাই মামলাটি যেন দ্রুত শেষ হয়। ন্যায়-অন্যায় আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হবে।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশনস নামের পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন নিহত হন। এতে আহত ও দগ্ধ হন আরও দুই শতাধিক শ্রমিক। ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) খায়রুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় নাশকতার পাশাপাশি অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ এনে দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারা যুক্ত করা হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক এ কে এম মহসিনুজ্জামান খান ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিজিএম) আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে তাজরীন ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।

২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ এস এম কুদ্দুস জামান। মামলার ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ১১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ হয়েছে।

আরও পড়ুন: সাক্ষীরা বলছেন ডাকা হয় না, রাষ্ট্রপক্ষ ‘খুঁজে পাওয়া যায় না’

মামলার আসামিরা হলেন- প্রতিষ্ঠানের মালিক ও এমডি দেলোয়ার হোসেন, চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, লোডার শামীম, স্টোর ইনচার্জ (সুতা) আল-আমিন, সিকিউরিটি ইনচার্জ আনিসুর রহমান, সিকিউরিটি সুপারভাইজার আল-আমিন, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলাম লাভলু, অ্যাডমিন অফিসার দুলাল উদ্দিন, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, সিকিউরিটি গার্ড রানা ওরফে আনোয়ারুল, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক, প্রোডাকশন ম্যানেজার মোবারক হোসেন মঞ্জু ও শহীদুজ্জামান দুলাল।

আসামিদের মধ্যে মো. শহিদুজ্জামান দুলাল, মোবারক হোসেন মঞ্জু, মো. রানা ওরফে আনোয়ারুল ও মো. শামিম মিয়া পলাতক।

জেএ/কেএসআর/জেআইএম

বার বার আদালত থেকে সমন পাঠানোর পরও ২৬ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হননি। এদের মধ্যে ছয়জন পুলিশ সদস্য, যারা এ মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আলোচিত এ মামলার সাক্ষীদের এমন আচরণে হতাশ রাষ্ট্রপক্ষ।

জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত হচ্ছেন না। ফলে মামলা শেষ করা যাচ্ছে না। সাক্ষীদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেন না। মামলার সাক্ষ্য দিতে তাদের কোনো আগ্রাহ-ই যেন নেই।

মামলাটি শেষ করতে কত সময় লাগবে তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। সাক্ষী এলে ছয় মাসে শেষ করে দেওয়া সম্ভব। তবে সাক্ষী না এলে আরও ১০ বছরেও শেষ হবে না।

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।