মানবতাবিরোধী অপরাধ

চট্টগ্রামের শওকাতুলের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪৩ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২২

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির সৈয়দ শওকাতুল ইসলাম ওরফে পাতলা ডাক্তারের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

সোমবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে ধানমন্ডিতে তদন্ত সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক এম সানাউল হক। এটি তদন্ত সংস্থার ৮৬তম প্রতিবেদন।

এর আগে ২০১৯ সালের ৬ মার্চ আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। এরপর তিন বছর ৮ মাস ২০ দিন অনুসন্ধান শেষে ২০২২ সালের ২৬ নভেম্বর প্রতিবেদন প্রস্তুত করার পর প্রসিকিউশনের কাছে তা দাখিল করা হয়। এরপর আজ সেটি প্রকাশ করা হলো।

আসামির বিরুদ্ধে ১০ হত্যাকাণ্ডসহ তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এরমধ্যে চারজনকে ধর্ষণ, দেড় শতাধিক লোককে আটক-নির্যাতন এবং দুই শতাধিক বাড়ি ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করার অভিযোগ আনা হয়।

এ মামলায় আসামি ছিলেন দুজন। এর মধ্যে একজন করোনায় মারা গেছেন। তার নাম সৈয়দ ওমর ফারুক ওরফে সৈয়দ মো. ফারুক হায়াত। তিনি ২০২১ সালের ৮ মার্চ মারা গেছেন। আর এখন একজন কারাগারে।

তদন্তে জব্দ তালিকাসহ মোট একশ ৪৪ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনের সঙ্গে সাক্ষীর জবানবন্দী নিয়ে পূর্ববর্তী তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) ২ জন এবং বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ৩ জন (আইও) মামলাটি তদন্ত করেছেন।

অপরাধ সংঘটনের স্থান হলো চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার বিভিন্ন এলাকায় মামলায় মোট ৩টি অভিযোগে ১০ জনকে হত্যা, সম্ভ্রান্ত ৪ জন মহিলাকে ধর্ষণ। আসামির ছোড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ জখম ১ জন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেড় শতাধিক লোককে আটক ও নির্যাতন এবং প্রায় দুই শতাধিক বাড়ি ঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ।

অপরাধের ধরণ গুলো হলো-অগ্নিসংযোগ, হত্যা, গণহত্যা এবং ধর্ষণ আটক, নির্যাতন, লুটপাটসহ ইত্যাদি মানবতাবিরোধী অপরাধ।

মো. নুর হোসেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা (এএসপি), আগের তদন্তকারী কর্মকর্তা, (অবসরে রয়েছেন) মো. ফারুক হোসেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা (এএসপি) (তদন্তকাল ২৭ জানুয়ারি থেকে ১১ জুন) ও মো. বদরুল আলম (তদন্তকাল: ১২জুন থেকে ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত)। এর মধ্যে আসামিদের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ৮ মার্চ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল ট্রাইব্যুনাল।

আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ

প্রথম অভিযোগ:
১৯৭১ সালের ২ জুন সকাল অনুমান ৬টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৫টা পর্যন্ত আসামি রাজাকার শওকতুল ইসলাম ওরফে পাতলা ডাক্তারসহ অনুমান ১০/১৫ জন সশস্ত্র রাজাকার এবং অনুমান ১০০/১৫০ জন পাকিস্তানি আর্মি চট্টগ্রাম জেলা সার্কিট হাউজের আর্মি ক্যাম্প থেকে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানাধীন ১৪ নম্বর নানুপর ইউনিয়নের নানুপুর সৈয়দপাড়া গ্রাম এবং মাইজভান্ডার আমতলী গ্রামের ওয়াইজ কাজী বাড়ি, সিকদার বাড়ি ও আমতলী বাজার এলাকায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নানুপুর সৈয়দ পাড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মির্জা আবু আহম্মদের কোম্পানির ম্যানেজার হিরণ্য কুমার দত্ত বাবু ও ১৪ নম্বর নানুপর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নূর আহমদ, মির্জা আবু আহম্মদের ছেলে মির্জা মোহাম্মদ আকবর ও বোন সৈয়দা গুল চম্পা বেগম এবং তাদের প্রতিবেশি মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর সুবেদারের স্ত্রী তাহেরা বেগমসহ প্রায় দুই শতাধিক লোককে আটক ও নির্যাতন করে।

এরপর আটক হিরণ্য কুমার দত্ত বাবু ও চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নুর আহম্মেদকে নানুপুর বিনাজুড়ি খালের পাড়ে নিয়ে সন্ধ্যা অনুমান সাড়ে ৫টার গুলি করে হত্যা করে। এছাড়াও রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি আর্মিরা অস্ত্রের মুখে আটক অন্যান্যদের ছেড়ে দিয়ে মির্জা মোহাম্মদ আকবর, সৈয়দা গুল চম্পা বেগম ও তাহেরা বেগমকে আটক ও অপহরণ পূর্বক ওই দিন রাত অনুমান ৮টার দিকে চট্টগ্রাম সেনানিবাস নিয়ে যায়।

পরদিন সকাল অনুমান ৯টায় তাদের চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিয়ে আটক রেখে নির্যাতন করে মির্জা মোহাম্মদ আকবর ১৫ দিন পরে ছেড়ে দেয় এবং আটক ভিকটিম সৈয়দা গুল চম্পা বেগম ও তাহেরা বেগমকে ২৬ দিন পর্যন্ত চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আটক রেখে নির্যাতন ও ধর্ষ ণ করে।

দ্বিতীয় অভিযোগ:
১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত আসামি রাজাকার শওকতুল ইসলাম ওরফে পাতলা ডাক্তারসহ ১৫/২০ জন রাজাকার নিয়ে অনুমান ৪০/৫০ জন পাকিস্তানি আর্মিদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের সমর্থক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ লোকদের আটক, নির্যাতন, অপহরণ ও হত্যা করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম জেলার নাজিরহাটে তৎকালে স্থাপিত অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্প থেকে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানাধীন ১৪ নম্বর নানুপর ইউনিয়নের মাইজভান্ডার আমতলী গ্রাম ও আমতলী বাজার এলাকা এবং ১৫ নম্বর রোসাংগিরী ইউনিয়নের পূর্ব আজিমনগর গ্রামের শীল পাড়াসহ আশপাশ এলাকায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ছাত্রলীগ কর্মী সৈয়দ জসিম উদ্দিন, আব্দুস সালাম, মোহাম্মদ ইসহাক এবং হাজী নূর আহম্মেদকে অস্ত্রের মুখে আটক ও অপহরণ করে আজিমনগর শীল পাড়ায় নেওয়া হয়।

এরপর শীল পাড়ার হিন্দু সম্প্রদায়ের দেবেন্দ্র কুমার শীল, হেমেন্দ্র কুমার শীল, মোহন্ত কুমার শীলকে অস্ত্রের মুখে আটক ও নির্যাতন পূর্বক তাদের বাড়ির মালামাল লুটপাট করে। রাজাকার ও আর্মিরা আকটক সৈয়দ জসিম উদ্দিন, আব্দুস সালাম, ইসহাক ও নূর আহম্মদকে জনৈক রায় মোহন শীল ওরফে বোঁচা ডাক্তার (বর্তমানে মৃত)-এর বাড়ির উঠানে দাড় করিয়ে বেলা অনুমান সাড়ে ১২টায় গুলি করলে হাজী নূর আহম্মদ ব্যতীত অন্য ৩ জন ঘটনাস্থলেই মারা যান। গুলিবিদ্ধ নূর আহম্মদ ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

এছাড়াও আজিমনগর শীলপাড়ায় আটক হেমেন্দ্র কুমার শীল, দেবেন্দ্র কুমার শীল ও মোহন্ত কুমার শীলদের বসত বাড়ির নিকটস্থ পুকুর পাড়ে দেবেন্দ্র কুমার শীলকে এবং অনুমান ৩০০ গজ দক্ষিণে আবাদী জমিতে হেমেন্দ্র কুমার শীল ও মোহন্ত কুমার শীলকে বেলা অনুমান ১টায় গুলি করে হত্যা পূর্বক উল্লেখিত পাকিস্তান আর্মি ও রাজাকাররা নাজিরহাট অস্থায়ী ক্যাম্পের দিকে চলে যায়।

তৃতীয় অভিযোগ:
১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর ভোর ৪টার থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত আসামি রাজাকার শওকতুল ইসলাম ওরফে পাতলা ডাক্তারসহ ১০/১২ জন রাজাকারদের নিয়ে ৩০/৪০ জন পাকিস্তানি আর্মি স্বাধীনতাকামী হিন্দুদের ওপর চট্টগ্রাম জেলার নাজিরহাটে অস্থায়ী আর্মি ক্যাম্প থেকে চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানাধীন ১৪ নম্বর নানুপর ইউনিয়নের হিন্দু অধ্যুষিত মাইজভান্ডার সূত্রধর পাড়া (সূতার পাড়া) আশপাশ এলাকায় অতর্কিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে অনুমান ৩০/৩৫টি বাড়ির সমস্ত মালামাল লুটপাট করে ও অগ্নিসংযোগ করে।

এছাড়াও রাজাকার ও পাকিস্তানি আর্মিরা পলায়নরত গ্রামবাসীদের মধ্যে সূত্রধর পাড়ার নিকুঞ্জ সূত্রধর, অনিল চন্দ্র সূত্রধর, রনজীত সূত্রধর, কল্পনা সূত্রধর, কানন বালা সূত্রধর (বর্তমানে মৃত) এবং সূত্রধর পাড়ার লাগোয়া মাইজভান্ডার পাঠান পাড়ার আকবর খান ওরফে আবু, নজির আহম্মদ, মো. ফজল কাদেরদেরকে আটক করে।

এফএইচ/জেডএইচ/জেআইএম/এমআইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।