‘অর্থ কেলেঙ্কারিতে জড়িতদের বিষয়ে দুদক যা করছে, যেন নাটক দেখছি’

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:২৫ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২২
ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংকগুলোতে অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়ে হাইকোর্ট বলেছেন, সব ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে- আমরা কি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো। এটা কি হয়? এসব অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন যা করছে তাতে মনে হয়, আমরা যেন নাটক দেখছি। হাততালি দেওয়া ছাড়া আর কী করার আছে, না হয় বসে থাকতে হবে।

আলোচিত বেসিক ব্যাংকের অর্থপাচারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আসামি মোহাম্মদ আলীর জামিন প্রশ্নে জারি করা রুল শুনানিতে সোমবার (২৮ নভেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। পরে আদালত দুদকের বক্তব্য শুনতে এবং এ বিষয়ে রায়ের জন্য আগামীকাল মঙ্গলবার দিন ঠিক করে দেন।

আদালতে এদিন মোহাম্মদ আলীর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন ও মো. জোবায়দুর রহমান। দুদকের পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আন্না খানম কলী।

শুনানির সময় আইনজীবী আবুল হোসেন বলেন, পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও দুদক এ মামলায় চার্জশিট দিচ্ছে না। বিচারও শেষ হচ্ছে না। আমার মক্কেল মাত্র একজন কেরানি হিসেবে কাজ করেছেন। এখানে তার অপরাধ কী, দুদক সেটিও সুনির্দিষ্ট করতে পারেনি। মামলায় টাকা ও সম্পদের যে বিবরণ এসেছে সেখানে আমার মক্কেলের নিয়ন্ত্রণে কিছুই ছিল না। এখানে বিশ্বাসভঙ্গেরও কিছু ছিল না।

তিনি আদালতকে বলেন, আমার মক্কেলের অপরাধ কী সেটাই দুদক শনাক্ত করতে পারেনি। এ মামলায় এখনো ১০৪ জন আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। অথচ আমার মক্কেল ২০১৯ সাল থেকে কারাগারে।

এ সময় আদালত বলেন, আমরা তো মনে হয় নাটক দেখছি। নাটক দেখে হাততালি ছাড়া আর তো কিছু দেওয়ার নেই। হয় হাততালি দিতে হবে, না হলে বসে থাকতে হবে।

হাইকোর্ট বলেন, জজ-আইনজীবী আর যে লাখ লাখ চোখ চেয়ে আছে। কেউ কোনো কাজ করতে পারছে না। কেন সবাই নীরব। সব ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবো।

এ সময় বিচারকের সঙ্গে সুর মিলিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, দুদক ড্রামা (নাটক) করছে। আমার বলার কিছু ছিল না।

পরে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতে এসে তার বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য সময় প্রার্থনা করেন। আদালত আগামীকাল মঙ্গলবার দুদকের আইনজীবীর বক্তব্য শেষে রায়ের জন্য রাখেন।

বেসিক ব্যাংকের দুই হাজার ৭৭ কোটি আত্মসাতের ঘটনায় আলামত চেয়ে মালয়েশিয়ায় অনুরোধ পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন- এমনটি জানিয়ে সোমবার হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে দুদক। প্রতিবেদন দাখিল করে দুদক জানায়, পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির (এমএলএআর) আওতায় মালয়েশিয়ায় অনুরোধ পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় দায়ের করা ৫৬ মামলার মধ্যে ১২ মামলার আাসমি, ব্যাংকটির সাবেক কর্মকর্তা মোহম্মদ আলীর জামিন শুনানিতে গত ৮ নভেম্বর হালনাগাদ তথ্য চেয়েছিলেন হাইকোর্ট। সে অনুসারে এ প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

মামলায় আত্মসাৎ করা অর্থের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে দুই হাজার ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ দুই হাজার ৯৯১ টাকা, যা সুদসহ দুই হাজার ৫৯০ কোটি ৪৯ লাখ ৯১ হাজার ৪৫৩ টাকা আত্মসাতের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রাথমিক অনুসন্ধান করে মোট ৫৬টি মামলা দায়ের করেছে।

দুদকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলাগুলো দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন। তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো- আত্মসাৎকৃত অর্থ সম্পূর্ণরূপে নগদে উত্তোলনের মাধ্যমে টাকার অবস্থান গোপন করা হয়েছে। মামলায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের শনাক্তকরণ ও তাদের জবানবন্দিগ্রহণ (১৬১ ধারায়) কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। সব সাক্ষীর কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বর্ণিত মামলায় আলামত প্রচুর এবং ব্যাংকের বিশাল পরিমাণ কাগজপত্র থেকে প্রকৃত সব আলামত শনাক্ত করা সময়সাধ্য। এছাড়া প্রকৃত আসামিদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়াটিও বেশ জটিল। মামলার প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহের জন্য মালয়েশিয়ায় এমএলএআর করা হয়েছে। সে সংক্রান্ত এর প্রতিবেদন ও আলামত এখনো পাওয়া যায়নি।

মামলাগুলোর আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা বদলিসূত্রে অন্যত্র চলে যাওয়ায় একাধিকবার তদন্তকারী কর্মকর্তাও পরিবর্তন করা হয়েছে। মামলাগুলোর তদন্তকাজ এগিয়ে চলছে। আসামি ও আলামত শনাক্ত করা, সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করা ও এমএলএআর-এর প্রেক্ষিতে বিদেশ থেকে মামলার প্রয়োজনীয় আলামত পাওয়া সাপেক্ষে এবং প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

৫৬ মামলায় আত্মসাৎকৃত অর্থের মধ্যে এরই মধ্যেই ১১৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা উদ্ধার/ব্যাংকে জমা করা হয়েছে। এ মামলায় ৮২ জন ঋণগ্রহীতা ছাড়াও বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন এমডি কাজী ফকরুল ইসলাম, ডিএমডি ফজলুস সোবহান, সাবেক ডিএমডি শেখ মঞ্জুর মোরশেদ, জিএম এ. মোনায়েম খান, জিএম মোহাম্মদ আলী ওরফে মোহাম্মদ আলী চৌধুরীসহ ব্যাংকের ২৭ জন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের গুলশান শাখা, প্রিন্সিপাল/প্রধান শাখা, দিলকুশা শাখা এবং শান্তিনগর শাখাসহ মোট চারটি শাখার ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে গুলশান থানায় ২৩টি, মতিঝিল থানায় ১২টি এবং পল্টন থানায় ২১টিসহ মোট ৫৬টি মামলা করা হয়। মামলার আসামিদের মধ্যে বেসিক ব্যাংক কর্মকর্তা ২৭ জন, ব্যবসায়ী ৮২ জন এবং বেসরকারি সার্ভেয়ার ১১ জনসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। এরমধ্যে ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং আত্মসমর্পণ করেছেন একজন।

এফএইচ/বিএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।