বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রধান বিচারপতির কাছে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৩ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২

দেশের বিচার বিভাগের মর্যাদা, সংবিধান রক্ষা, বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের বিশ্বাস, আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ, বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখাসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর কাছে আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

সোমবার (৫ডিসেম্বর) প্রধান বিচারপতির কাছে এসব দাবি জানানো হয়। আইনজীবী এ কে এম এহসানুর রহমান বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান।

আবেদনটি প্রধান বিচারপতির কাছে জমা দেওয়ার সময় ছিলেন বিএনপির জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সাবেক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরোজ্জা বাদল ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।

তাদের দাবি-দওয়ার মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের উপলব্ধি, বিশ্বাস এবং আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য এমন পদক্ষেপ যেন গ্রহণ করা হয় যাতে প্রমাণিত হয় যে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দায়ের হওয়া ২০১৮ সালের মামলাসহ রাজনৈতিক মামলাগুলি এমনভাবে পরিচালনা/বিচার করা যাতে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরে আসে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি, মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

মোট ২১ পৃষ্ঠার এ লিখিত আবেদনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম (বিজেএএফ) বিচার বিভাগের মর্যাদা ও সম্ভ্রমের ওপর ধারাবাহিকভাবে আসা অবমাননাকর প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

আবেদনের বলা হয়, আপনি এটা জেনে খুশি হবেন যে বিজেএএফ আইনি ভ্রাতৃত্বের কণ্ঠস্বরকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ইত্যাদির পক্ষে কথা বলা মানুষের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি করে।

আমরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যরা শুধু আইনজীবীদের সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবেই নয়, বরং নাগরিক হিসেবেও সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধীনে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন। আমরা সচেতন যে সংবিধান ও আইন মেনে চলা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, সরকারি দায়িত্ব পালন করা এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।

বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছার মূর্ত প্রতীক হিসেবে সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্য বজায় রাখা, এর নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং একে সমর্থন করাও আমাদের পবিত্র দায়িত্ব। আমরা আরও অবগত যে, প্রজাতন্ত্রের সেবায় নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য জনগণের সেবা করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট হওয়া।

আবেদনে বলা হয়, কেবলমাত্র বিচার বিভাগের কার্য সম্পাদনের পবিত্র দায়িত্ব পালনের কারণেই নয়, বরং এর প্রধান হিসেবে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্য সম্পাদনের কঠোর দায়িত্ব পালনের কারণেও আপনি ভাল করেই জানেন যে, বিভিন্ন মামলা দ্বারা এটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক। উল্লিখিত পটভূমির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু তথ্য ঘটনার প্রতি আপনার সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই--

২০২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের অবস্থান ১২৭তম স্থানে রয়েছে। আমরা লক্ষ্য করছি চলতি বছর বিচার বিভাগের স্থান তালিকার নিচের দিকে অবস্থান করছে। যা ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৪তম স্থানে।

চলতি বছরের ১২ মার্চ ইউএসএআইডির এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আইনের শাসন ও বিচার খাতের চূড়ান্ত মূল্যায়ন প্রতিবেদন শিরোনামে প্রতিবেদনেটি প্রকাশ করা হয়েছে যে ২০০৭ সালে শুরু হওয়া ক্ষমতার সুস্পষ্ট নতুন রুপের অবাস্তব সংস্কার, বিচার বিভাগের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্য এবং উচ্চ আদালত ও অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগে ক্রমবর্ধমান রাজনীতিকরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতাকে আরও খর্ব করেছে।

এর ফলে বিচার বিভাগকে স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং দক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় না এবং এর প্রতি জনগণের আস্থা কমে গেছে।

এছাড়া এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনে ২০২০ সালের ১৩ জুলাই একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশে বিচার-বর্হির্ভূত হত্যা এবং গুম সম্পর্কে বলা হয়েছে। ‘বাংলাদেশ: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে নির্বিচারে আটকের ঢেউ সংকটকে গভীরতর করে তুলছে।

বিবৃতিতে বলা হয়-‘এটা সুস্পস্ট যে কঠোর আইনের পদ্ধতিগত অপব্যবহার বাংলাদেশে একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা। বর্তমান সরকার মতামত এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রোধ করার প্রচারণা জোরদার করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮সহ বেশ কয়েকটি আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২১ সালের ২৫ জুলাই ‘বাংলাদেশ: এ্যান্ড ক্র্যাকডাউন অন ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন অনলাইন’ শিরোনামে একটি বিবৃতি দেয় যেখানে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর অপব্যাবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়-অনলাইনে শেয়ার করা একটি মন্তব্যের জন্য ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে তল্লাশি চালানো, ডিভাইস এবং তাদের বিষয়বস্তু বাজেয়াপ্ত করার এবং ওয়ারেন্ট ছাড়াই ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা দেয়। এটি স্বাধীনতার অধিকারের লঙ্ঘন।

তারা বলেন, লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, সারাদেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারা নিপীড়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সারাদেশে প্রায় ৪০ লাখ বিরোধী কর্মীকে প্রায় এক লাখ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ ধরনের রাজনৈতিক মামলাগুলি রাজনৈতিক নিপীড়নের উৎকৃষ্ট উদাহরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।

দেশের সচেতন নাগরিকদের সংগঠন হিসেবে বিজেএএফ উপরোক্ত তথ্য, ঘটনা এবং বিবরণ গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে মনে করে এবং একই ভাবে বিশ্বাস করে যে এসব তথ্য, ঘটনা এবং বিবরণ আমাদের দেশের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি, মর্যাদা দেশে এবং বিদেশে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। অধিকন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির এ ধরনের অনুসন্ধানগুলি জনগণের মনে একটি যুক্তিসঙ্গত আশংকা তৈরি করেছে যে, সরকার চলমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমন করার জন্য বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করছে। যার ফলে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস পাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি দ্বারা প্রকাশিত তথ্যের আলোকে প্রধান বিচারপতির কাছে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের দাবি সমূহ-

ক. বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের উপলব্ধি, বিশ্বাস এবং আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য এমন পদক্ষেপ যেন গ্রহণ করা হয় যাতে প্রমাণিত হয় যে বিচার বিভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।

খ. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ এর অধীন মামলাসহ রাজনৈতিক মামলাগুলি এমনভাবে পরিচালনা/বিচার করা, যাতে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের বিশ্বাস এবং আস্থা ফিরে আসে।

গ. আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো আমলে নিয়ে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি, মর্যাদা এবং সম্ভ্রম পুনরুদ্ধারের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

এফএইচ/এমআইএইচএস/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।