রিনি ও তার বাইশ গজের সংসার : নারী ক্রিকেট সংগ্রামের অসাধারণ গল্প

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল , স্পোর্টস এডিটর
প্রকাশিত: ০৫:৪৮ পিএম, ০৬ মার্চ ২০১৯

বইটির পৃষ্ঠা সংখ্যা মাত্র ৬২। মূল লেখা শুরু হয়েছে ১৩তম পৃষ্ঠা থেকে। সে হিসেবে মূল লেখার পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৯ কিংবা ৫০ হবে। শব্দ সংখ্যা হবে বড়জোর ১২ থেকে ১৩ হাজার। যে বিষয়টি বইটির প্রতিপাদ্য, তাতে ১২ হাজার শব্দ নিতান্তই নগণ্য। বাংলাদেশের ক্রিকেট কিংবা এর আশপাশের কিছু নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কিছু লিখতে গেলে এক লাখ শব্দ ছাড়িয়ে যাবে, তাতেও তো কোনো লেখার পূর্ণতা পাওয়ার কথা নয়। সেখানে যদি বিষয়টি হয় একটি সংগ্রামমুখরতা এবং নারী ক্রিকেট, তখন বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলাও তো কঠিন ও কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার।

কিন্তু কবিগুরুর ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’- কথাটিকেই যেন পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করে দিলেন নাজমুল হক তপন। আমাদের অতিপ্রিয় তপন দা। ‘রিনি ও তার বাইশ গজের সংসার’, গল্পের ছলে লেখা বইটি যেন কোনো প্রচলিত গল্প কিংবা উপন্যাস নয়, একটি জীবন্ত জীবন কাহিনি। যেখানে ফুটে উঠেছে একজন নারীর ক্রিকেটার হয়ে ওঠার স্বপ্ন এবং তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথের নানা বাঁকে বাধা আর বিপত্তি। সহযোগিতা এবং সমর্থনের নানামুখিতা, শেষ পর্যন্ত হার না মেনে এগিয়ে চলা- সব কিছুই ফুটে উঠেছে রিনি ও তার ২২ গজের সংসার বইটিতে।

অল্প পরিসরে নারী জীবনের একটি সংগ্রামের পূর্ণতা পাওয়াকে, বিশেষ করে ক্রিকেট নিয়ে একজন নারীর এগিয়ে চলাকে যেভাবে অল্প কথায়, স্বল্প জায়গায় চিত্রায়িত করেছেন তপন দা, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। দিশারী ক্লাবের কোচ রিনি। তার কাছে ক্রিকেট শিখতে আসা একজন মেয়েকে খাঁটি জহুরির চোখে দেখে তাকে মূল্যবান কিছু পরামর্শ দেওয়া থেকে কাহিনির পটভূমি শুরু।

এরপর লেখক চলে গেলেন নারী ক্রিকেটে জনপ্রিয় শিক্ষক (কোচ) হয়ে ওঠা সাফিনা রিনি কীভাবে এতদূর পথ পাড়ি দিয়ে এলেন, কীভাবে এ দেশে নারী ক্রিকেটের জাগরণ ঘটালেন, কীভাবে অদম্য মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে চললেন, কীভাবে প্রমাণ করলেন শুধু ছেলেরাই নয়, ইচ্ছা করলে এ দেশের নারীরাও সমানতালে এগিয়ে চলতে পারে- সেটাই খাঁটি চিত্রশিল্পীর মতো চিত্রায়িত করেছেন রিনি ও তার বাইশ গজের সংসারে।

নারীদের এগিয়ে চলতে হলে যতই অদম্য মানসিকতা থাকুক, কোনো না কোনো পর্যায়ে কারো না কারো সহযোগিতা-সমর্থন প্রয়োজন এবং সেটা খুব বেশি প্রয়োজন পরিবারের পক্ষ থেকে। রিনি তার বাবার কাছ থেকে সেই সহযোগিতা এবং সমর্থন পেয়েছেন। ক্রিকেট নিয়ে এগিয়ে চলার পথটা মূলত মসৃণ হয়েছে সেখান থেকেই।

লেখক এখানে শুধু একজন নারী ক্রিকেটারের উঠে আসার সংগ্রামকেই চিত্রায়িত করেননি, গল্পের ছলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জাগরণের সূচনালগ্নটাকেও টেনে এনেছেন। সেই ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয়ের গল্প। যেখান থেকে আজকের বাংলাদেশে আধুনিক ক্রিকেটের সূচনা হয়েছিল।

শুধুই ক্রিকেট আর সংগ্রামের গল্প? নাহ! এতটা রস-কষহীন হলে তো পাঠকের কাছেও কিছুটা বিরক্তি এসে যেতে পারে। লেখক তাই দারুণ দক্ষতার সাথে কিছু প্রেম-ভালোবাসার ছোঁয়াও দিয়েছেন বইটিতে। ছন্নছাড়া-ডাকাবুকো রিনির জীবনেও যে রঙ লেগেছিল, সেটাও তুলে ধরেছেন নিখুঁতভাবে। তবে এখানেও ক্লাইমেক্সের জন্ম দিয়েছেন লেখক। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর হাসিব সাহেবের সঙ্গে বিয়ে এবং ভালোবাসার বিষয়টিও রিনির সংগ্রামমুখরতার সঙ্গে নিপুণ কারিগরের মতো মিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত রিনির সংগ্রামের সঙ্গে খাপ খায় তো তার ভালোবাসা?

মানুষের জীবন কখনোই সম্পূর্ণ নয়। মানুষ যা চায় তা সব সময় পায়ও না। কিছু কিছু অপূর্ণতাও থেকে যায়। যে রিনি সারাজীবন ক্রিকেটকেই ধ্যান-জ্ঞান করে এসেছেন, তিনিই কি-না শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়ি জীবন থেকে বিদায় নিয়েছেন জাতীয় দলে খেলতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে! কিন্তু সেই আক্ষেপকে তিনি শক্তিতে পরিণত করে মন দিয়েছে খেলোয়াড় তৈরিতে। যে কারণে, তার হাতে গড়া অনেকেই আজ জাতীয় দলে খেলে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা বিশ্বের ক্রিকেট মাঠগুলো। রিনির এটাও তো কম প্রাপ্তি নয়! অপূর্ণতাকে তিনি ঢেকে দিয়েছেন এই প্রাপ্তি দিয়ে।

তবুও রিনিরা এ দেশের নারী ক্রিকেটের পাইওনিয়ার। তারা এগিয়ে এসেছেন বলেই আজ নারী ক্রিকেটে বাংলাদেশ ভারতের মত দেশকে হারিয়ে এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন। বিশ্ব ক্রিকেটেও কড়া নাড়তে শুরু করে দিয়েছে। হয়তো বা বিশ্বকাপও জিতবে একদিন।

রিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই, নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’ রিনিরা প্রাণ দেয়নি হয়তো, তবে ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাণাতিপাত করেছেন। লেখক নাজমুল হক তপন সেই চিত্রটিই দারুণ দক্ষতায় চিত্রায়ন করেছেন।

আমার বিশ্বাস, আড্ডাপ্রিয় মানুষটি যদি নিয়মিত কলম নিয়ে বসতে পারতেন, তাহলে আরও অসাধারণ এবং অমূল্য সব সাহিত্য উপহার দিতে পারতেন বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের।

রিনি ও তার বাইশ গজের গল্প। বইটি একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৯ এ প্রকাশ করেছে পারিজাত প্রকাশনী। মূল্য মাত্র ১৫০ টাকা। বইমেলা তো শেষ, পারিজাত প্রকাশনীর শোরুম ছাড়াও বইটি পাওয়া যাবে বই বিক্রয়ের জনপ্রিয় অনলাইন রকমারি ডটকমে।

আইএইচএস/এসইউ/এমকেএইচ

আপনার মতামত লিখুন :