রুদ্র-প্রচেতা : পর্ব ০১

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০১:১৪ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০১৯

বাল্যকালে বহুবার শুনিয়াছি প্রেম ও প্রণয় নচেৎ এক মনুষ্য পাপাচরণ। ইহার নামও শুনিলে তখন বেবাকে কেন যে হঠাৎ আঁতকে উঠিত—মনে হইত যেন এই বুঝি শনিদেবের কুদৃষ্টি পড়িবার লাগিল। অতঃপর কেউ প্রেম করিতেছে তা শুনিবা মাত্র পাড়া-পড়শীদের কেমন জানি নিদ্রা হারাম হইয়া যাইত। ‘ওগো শুনেছ’, ‘ওগো শুনেছ’ বলিয়া তাহারা একটি বিষধর কালনাগিনী স্বর্পের মত ‘ফিসফিস’ করে দিন অতিবাহিত করিত। তখন খুব ছোট ছিলেম, তাই আমার এসব কিছুর তেমন বোধগম্য হইত না। শুধু ইহাদের কর্মকাণ্ডগুলো গভীর মনোযোগ দিয়া দেখিতাম আর ভাবিতাম ‘প্রভু ইহাদের করো আশীর্বাদ।’ আজও আমি আমার জীবনের সায়াহ্নে তাহাদের জন্য সেটাই যে কামনা করিলাম।

বিগত কয়েকদিন ধরিয়া আমি নিউইয়র্কের ‘লিনক্স হিল’ বৈদ্যশালার বিছানাতে শুইয়া কেবল যমের অপেক্ষাই যে করিতেছি। ডাক্তার বাবু কহিলেন আমার যকৃতের ক্যান্সারের এখন শেষ পর্যায় চলিতেছে। আর বেশিদিন আমি এই মানবজগতে থাকিব না। এই শুনিয়া আমি পরমানন্দিত হইলাম। না, আমার আত্মহত্যার ইচ্ছা কোনদিনই ছিল না। ছোটবেলায় ঠাকুরদাদা বলিতেন, ‘হ্যাঁ রে রুদ্র! আত্মহত্যা মহাপাপ। যত কষ্টই তোর হোক না কেন জীবনেও এসব একদম ভাববি না।’ তারপর উনি সুযোগ পেলেই গীতার দুই একটা বাণী শুনাইয়া ছাড়িতেন। গীতায়ও নাকি এসব স্পষ্ট করে লিখিত রহিয়াছে। যাহাই হউক না কেন, নিউইর্য়কের ব্যস্তজীবনের কারণে আর আমার গীতার লিখনিগুলো নিরীক্ষণ করার সুযোগ এই জীবদ্দশায় হইল না। ভাবিলাম, কিভাবে আমার জীবনের এতগুলো সময় অতিবাহিত হইল তা একমাত্র বিধাতাই বলিতে পারে। তবে মৃত্যুর শেষ সময়ে আমি ঠাকুরদাদার কথা রাখিতে পারিয়াছি ভাবিয়া বিন্দু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। আবার ভাবিলাম, কতই না কষ্টে আমার জীবন বিফলে কাটিল।

প্রেমহীন জীবন সে জীবন নহে—শুধু সময় অতিবাহিত করার। তেমনি আমার জীবনটি কাটিল—প্রেমহীন। প্রেম সবার জীবনে একবার আসে—আমারও জীবনে একবার আসিল কিন্তু তাহা ধরিতে পারিলাম না। প্রেম যেন পুকুরের কাদাতে থাকা শোল মাছের মত—ইহা ধরিতে লাগিলে পিচ্ছিলে ‘ফুরুত’ করিয়া নিরুদ্দেশে চলিয়া যায়। আবার কেউবা প্রেম পাইবার লাগি শোল মাছের মত ইহার কানে ছিপে ধরিয়া টানিত। এতে তাহারা প্রেম অর্জন করিতে সক্ষম হইত কিনা জানি না, তবে এই পদ্ধতিতে যে মাঝে মাঝে শোল মাছ ধরা যায় তাহা আমি বাল্যকালে স্বচক্ষে লক্ষ্য করিয়াছি।

আমার এক বাল্যবন্ধু শুভাঙ্ক, বিশাল দেহ তার—আবার খুব দ্রুত হাঁটিবার চেষ্টা করিত—মনে হত যেন তাহার রাজ্যের তাড়া। উচ্চতায় ঠিক আমার মত—ছয় ফুট, এক ইঞ্চি। চুল তার ছোট—আমার তা ব্যতিক্রম। সে কহিল, ‘রুদ্র, প্রেম মানবজীবনে বহুবার আসিতে পারে—একবার নয়।’ আমি তাহার বিশাল মুখের দিকে তাকাইয়া থাকিতাম আর ভাবিতাম, ‘তোর মুখে যেন পুষ্প-চন্দন পড়ুক’। অদ্য জীবন সায়াহ্নে আসিয়া বুঝিলাম শুভাঙ্ক আমাকে কী ডাহা মিথ্যাটি না বলিয়াছে। মাঝে মাঝে ভাবিতাম, প্রেমহীন আমি কি ঠাকুরদাদার কথা রাখিবার জন্য বিফল জীবন অতিবাহিত করিলাম। নাকি বাল্যবন্ধু জনির কথায় বিশ্বাস করিয়া প্রেমের সন্ধান করিতে করিতে জীবনটা মূলত অনর্থকভাবে কাটিলাম। কারণ অন্য সবার মত আমার জীবনেও একদিন প্রেম এসেছিল—বাল্যবয়সেই। কিন্তু শোল মাছের মত সে প্রেম ‘ফুরুত’ করিয়া পালায়।

যকৃত ক্যান্সারের লক্ষণ দেখিয়া সম্প্রতি আমার ডাক্তার বলিয়াছেন যমবাবু আগামী ত্রিশ দিনের মধ্যে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিবেন। এত আত্মবিশ্বাসের সহিত ডাক্তার মশাই আমাকে বলিলেন যেন তাহার সাথে যমবাবুর নিত্য যোগাযোগ চলিতেছে। একটু ভাবিলাম—তখন বুঝিতে পারিলাম আসলেই তাদের যোগাযোগ আছে বৈকি। ডাক্তারের সাথে যমবাবুর যোগাযোগ যেন বউ-শাশুড়ির মত—দুজনে দুজনকে ভালোভাবে বুঝিতে পারে কিন্তু যতটুকু সম্ভব তাহারা বাক্যালাপ এড়িয়ে যায়। যাই হোক, ডাক্তার বাবুর কথায় আত্মবিশ্বাসের সুর—তাই অগত্যা আমি মনে মনে যমের বাড়ীতে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইতেছি। আজ কেন জানি বারবার আমার জীবনের সেই ‘ফুরুত’ করে চলে যাওয়া প্রেমের কথা বারবার মনে পড়িতেছে—আর দুই চক্ষুর জল নীরবে পড়িতেছে।

প্রেমহীন জীবন আমার বৃথা কাটিল—তবে প্রেমিকার জীবন বৃথা হইতে পারে না। তাই ভাবিলাম—একটু লেখালেখি করিব। জগতকে আমার বৃথা প্রেমকাহিনী শুনাইব। কিন্তু লিখিতে চাইলে তো আর লেখা যায় না। তা যদি হইত তাহলে এই ব্রহ্মাণ্ডে হাজার হাজার লেখক-লেখিকা হইত—কাহারো চাষাবাদ করে খাইতে হইত না। শুধু বই পড়িয়া এবং বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন টানিয়া তাহারা দিন কাটাইত। কী আর করিব— ‘লিনক্স হিল’ বৈদ্যশালার যমের বিছানাতে শুইয়া আমি একজন সেবিকা ডাকিলাম। প্রেম-গল্প লিখিবার জন্য তাহার পরামর্শ আমি চাহিলাম। ধরিত্রীতে এত মানুষ থাকিতে লিখিবার জন্য কেন একজন সেবিকার পরামর্শ চাহিলাম? এই প্রশ্ন এখানে অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আমার মত আপনি একেলা বৈদ্যশালাতে তো যমবাবুর জন্য অপেক্ষা করিতেছেন না। তাই বুঝিতে হয়তো আপনি নাহি পারিবেন। একজন মানুষ খুবই তৃষ্ণার্ত-বোধ করিয়া প্রথমে নলকূপের দিকে দৌড়াইয়া যায়—কিন্তু নলকূপ অকেজো হইলে কি না সে করিতে বাধ্য হইবে। প্রথমে সে হয়তো পুকুরের জল পান করিতে চাইবে—পুকুর যদি আশেপাশে না দেখিতে পাওয়া যায় তাহলে বেচারা আর কোন কিছু যাচাই-বাছাই করিবে না। সেজন্য জল যেখান থেকে পাওয়া যায় তাহাই পান করিবার তুল্য—সে নর্দমার জলই হোক না কেন।

আমারও বুঝি একই দশা হইয়াছে। যমের বাড়ীর যাত্রী—যে যমবাবুর অপেক্ষাতে সময় অতিবাহিত করিতেছে। অন্যদিকে, একলাও বটে কারণ আমার এই ধরিত্রীতে যে কেউ নেই। প্রথম এবং একমাত্র প্রেম বৃথা হইবার কারণে আমার সংসারটি করাই হয়নি। সারাজীবন একাই তাহার স্মৃতি লালন-পালন করিয়া কাটিয়াছি। আজ তাহার স্মৃতি অক্ষুণ্ন রাখিবার জন্য আমার লিখিবার এই ক্ষুদ্র চেষ্টা। ‘লিনক্স হিল’ বৈদ্যশালার বিছানাতে শুইয়া আমি এক সেবিকার পরামর্শের শরণাপন্ন হইলাম। সৌভাগ্যবশত সেবিকাটি বাঙ্গালী ছিল। ইনি তাই আমাকে লিখিবার জন্য উৎসাহ দিতে কহিলেন, ‘আমি জীবনে কিছু লিখিনি মশাই তবে বহু বই পড়িয়াছি—তাই এটা বলিতে পারিব যে লিখিতে হইলে অন্তরকে ঢালিতে হইবে।’ কি দারুণ উপদেশ না সেবিকা শুনাইলেন—হৃদয়ে কিছু আশার সঞ্চার হইল। তাই আমি ঠিক করিলাম ত্রিশ দিনের মধ্যে যমবাবুর সাথে সাক্ষাৎ হইবার পূর্বে আমাকে আমার ব্যর্থ প্রেমের কাহিনী লিখিতে হইবে। সেবিকা আমার কক্ষে আসিয়া একটি খাতা ও কলম দিল। অতঃপর একটি মুচকি হাসি এই বুড়ো যমযাত্রীকে দিয়া কক্ষ প্রস্থান করিল।

বয়স আমার মাত্র তেরো অতিক্রম করিল। ওটার হাট বিদ্যাপীঠে দশম শ্রেণীর একজন বিহ্বল ছাত্র। আপনি আশ্চর্য একদম হইবেন না। আমি অত মেধাবী ছাত্র ছিলাম না যে তের বছর বয়সে দশম শ্রেণীর ছাত্র হয়ে গেলুম—এটি নিছক একজন অতি উৎসাহী পিতার দুর্বল আয়াস ছিল। বয়স পাঁচ বছর না পেরুতেই পিতাশ্রী কি ভাবিয়া আমাকে জ্যেষ্ঠ সহোদরা মিলির সাথে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করিয়া দিল। তারপর থেকেই শিক্ষা জীবনের সংগ্রাম তথা আমার জীবন সংগ্রামের সূচনা হইল। আমাদের ঘরের চার কোণাতে চড়ুই পাখিদের বাসা ছিল। মাঝে মাঝে দেখিতাম দু-একটি চড়ুই পাখির বাচ্চা মাটিতে পড়িয়া ভীষণ যন্ত্রণায় ক্লেশিত বা ইহাদের মরদেহ মাটির উপরে পড়িয়া বাতাসে তাহাদের ডানার পালক উড়িতেছিল। একদিন ঠাকুরদাদাকে উৎসুক হইয়া জিজ্ঞেস করিলাম, ‘দাদা মশাই, কেন এই চড়ুই পাখিরা এমনভাবে মাটিতে পড়িয়া মরিতেছে?’ ঠাকুরদাদা চ্যাবনপ্রাশ গিলিতেছেন আর বিরক্ত হইয়া কহিলেন, ‘চড়ুই পাখির বাচ্চার পিতা-মাতা ইহাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়া জগত মোকাবেলা করিতে পাঠাইছে তাই ইহাদের এই করুণ অবস্থা।’ আমারও ঠিক সে রকম বোধ হইয়াছিল সেদিন; যেদিন থেকে আমি পাঁচ বছর বয়সে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়াশুনা করিতেছিলাম। ভাগ্যক্রমে শুধু ক্লেশিত হইলাম—ঐ বাচ্চা চড়ুই পাখিদের মত মারা যাইনি।

আমার ঠাকুরদাদা বহু-বছর পূর্বে বৈকুণ্ঠ গমন করিয়াছিলেন—কিন্তু তাহার স্মৃতি সবসময় আটকাইয়া ধরিয়াছি। তিনি অসম্ভব বিজ্ঞ এক ব্যক্তি ছিলেন। গ্রামের সবাই আমার ঠাকুরদাদাকে কবিগানের ‘সরকার’ বলিয়া জানিত। ছোটবেলায় যখন মাতাশ্রী স্কুলের বিরতিতে কিছু খাইবার জন্য একটি এক টাকার নোট দিত তখন একটু হতভম্ব হতাম—কারণ এক টাকার নোটের উপর লিখা থাকত ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’। ভাবিতাম—এ নিশ্চয় আমার দাদা মশাইয়ের কৃতকর্ম, কারণ তিনিই তো ‘সরকার’। আমাদের সংসারে আরেকজন বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন আমার জেঠা মশাই। ইনি এমন কিছু না জানিতেন সেটা বোধ হয় এই ধরিত্রীতে এখন পর্যন্ত জন্ম নেয়নি। জেঠা মশাই একটি ছোট্ট শহর ‘বসুরহাট’ এ থাকিতেন—আর আমরা সবাই গ্রামে থাকিতাম। গ্রাম হতে জেঠা মশাইয়ের শহরটি তিন মাইলের বেশি হইবে না। কতবার যে গিয়েছিলাম জেঠা মশাইয়ে শহরের বাসাতে—সবাই মিলিয়া কত মজাই না করিতাম। জেঠতো দুই ভাই ও দুই বোনের সহিত কত সুন্দর খেলা করিয়া সময় কাটাইতাম। জেঠা মশাইয়ের বাসার পিছনে খেলাধুলা করার জন্য একটু জায়গা ছিল। আর ঐ জায়গাটুকুতে জেঠতো ভাইসহ এবং ঐ পাড়ার প্রতিবেশীদের ছেলেসহ ফুটবল ও ক্রিকেট খেলিতাম। জেঠা মশাইয়ের শহরে একটি কাপড়ের দোকান ছিল। মাঝে মাঝে জেঠার দোকানে আমাকে একলা বসাইয়া জেঠা মশাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যবসার অন্য কাজে চলিয়া যাইত আর যাইবার আগে বলিতেন কিভাবে কোন কাপড় বিক্রী করিতে হইবে। ইনি আমাকে যথেষ্ট বিশ্বাস ও আদর করিতেন। কেনই বা করিতেন তাহা এখন বুঝিতে পারিলাম না।

দশম শ্রেণীতে সবেমাত্র উত্তীর্ণ হইলাম। একদিন সকালবেলা ঠাকুরমা বলিলেন তিনি শহরে জেঠা মশাইয়ের বাসাতে বেড়াতে যাইবেন। ঠাকুরমা মাঝে মাঝে আমাকে পিসিদের বাড়ি এবং জেঠার বাড়িতে তাহার সঙ্গে নিয়া যাইতেন। কিন্তু আজ তিনি কেন জানি ঠিক করিলেন আমাকে উনার সঙ্গে জেঠাদের বাসায় বেড়াতে নিয়ে যাইবেন না। সঙ্গে সঙ্গে আমি সজোরে কান্না করিতে লাগিলাম। পরক্ষণে উনি আমার কান্না সহ্য করিতে না পারিয়া কহিলেন, ‘জামা-কাপড় পরে তৈরি হ, তোরে আমি সঙ্গে নিয়া যাইব।’ কিন্তু ঠাকুরমা যে সেদিন আমার সহিত এত বড় একটি প্রবঞ্চনা করিবে তাহা আমার জানা ছিল না। আমি পরম পরিতোষে পুরনো জামা-কাপড় পরিবর্তন করিয়া নতুন জামা-কাপড় পরিধান করছিলুম। অথচ কিছুক্ষণ পরে মা বলিলেন যে তিনি গোপনে আমাদের বাড়ি ছাড়িয়া শহরের উদ্দেশে প্রস্থান করিলেন। ঠাকুরমার এ অভ্যাসটি নতুন নহে—কিন্তু কেন জানি ঐ দিন ভাবিলাম—আজ আর নয়। সকাল তখন প্রায় দশটা। আমিও লুকিয়ে বাড়ি থেকে পালালাম। কিছুদূর হাঁটিয়া গ্রামের বাজারে পৌঁছলাম। অতঃপর আমাদের গ্রামের রিক্সাচালক কবীরের রিক্সাতে উঠিলাম। কবীরের রিক্সা চড়িয়া শহরে জেঠাদের দোকানের সামনে পৌঁছলাম—জেঠা মশাই আমাকে রিক্সাতে একলা দেখিয়া সব বুঝিতে পারিলেন। তাই তিনি রিক্সার ভাড়াটি দিয়ে দিলেন। জেঠা মশাই জিজ্ঞেস করিলেন, ‘কিরে রুদ্র তুই কিছু খেয়েছিস?’ আমি নিশ্চুপ হইয়া দাঁড়াইয়া থাকি। জেঠা মশাই সব বুঝিতে পারিলেন। তখন তিনি কহিলেন, ‘তুই দোকানে একটু বস রুদ্র—আমি কিছু মাছ ও সবজি কিনে আসতেছি।’ আমি জেঠা মশাইয়ের কথামত দোকানে বসিয়া পড়িলাম।

প্রায় আধ-ঘণ্টা অন্তর জেঠা মশাই তার দুই হাতে দুই পলিথিন ব্যাগে বাটা মাছ, লইট্যা মাছ এবং কিছু সবজিসহ দোকানের সামনে আসিলেন। তিনি কহিলেন, ‘ধর, এই দুটি ব্যাগ নিয়া তোর জেঠিকে দিয়া চলে আসবি—দুপুরের জন্য তোর জেঠিকে এগুলো দিয়া রান্না করিতে হইবে।’ জেঠা মশাইয়ের দোকান থেকে তাহাদের বাসাটি বেশি দূরে নহে। পায়ে হাঁটিয়া যাইলে বড় জোর দশ মিনিট সময় লাগিবে। আমি আর কিছু না বলিয়া জেঠা মশাইয়ে হাত থেকে বাজারের ব্যাগ দুটি নিয়েছিলাম। এরপর হাঁটিতে শুরু করিলাম। দুটি পলিথিনের ব্যাগের মধ্যে একটি ব্যাগ এত ভারী ছিল যে আমার হাতে পলিথিনের কাটা দাগ পড়িতেছিল। তাই বারবার আমি রাস্তার পাশে একটু জিরিয়ে নিতাম—আর হাতের মধ্যে পলিথিনের ব্যাগগুলো পরিবর্তন করিতেছিলাম। এভাবে কিছুক্ষণ অন্তর আমি জেঠা মশাইদের পাড়ার এলাকায় প্রবেশ করিলাম। ভাবিলাম—আরও কয়েক-মিনিট একটু জিরিয়ে নিই। প্রাথমিক স্কুলে থাকাকালীন খরগোশ আর কচ্ছপের গল্প শুনিয়াছি। আমার সেদিন খরগোশের অবস্থা হইল।

অকস্মাৎ আমি যাহা দেখিলাম তাহা মুহূর্তের মধ্যে আমার জীবনযাত্রা পরিবর্তন করিল। এই ছিল সেই ক্ষণ—যে ক্ষণ আমার অস্তিত্ব নির্ধারণ করিল। ঐ দিন আমি যদি ঐ স্থানে খরগোশের মত একটু জিরিয়া না নিতাম তাহলে আমার জীবনটি কেমন হইত—এখন আবার তাহা ভাবিলাম। মানুষের জীবনে এমন কিছু কিছু মুহূর্ত আসিবে—যে মুহূর্তটি তাহাদের জীবন-স্রোত পরিবর্তন করিবে। যেমন টাকার উপরে বর্ণিত থাকে, ‘চাহিবা মাত্র ইহার বাহকে দিতে বাধ্য থাকিবে।’ তেমন কিছু মানুষের জীবনে কিছুকিছু মুহূর্ত আসে যাহা আমাদের সত্তা পরিবর্তন করিতে বাধ্য থাকিবে। যেমন, কেউ লটারীতে লক্ষ টাকার পুরস্কার পাইয়া—আবার কেউবা প্রেমে পড়িয়া; আবার কেউ বা সরকারী চাকরি পাইয়া—কেউ বা প্রেমে ছেঁকা খাইয়া। আমার জীবনে সেদিন কি ঘটিল তৎক্ষণাৎ তাহা বিন্দুমাত্র হয়ত বুঝিতে পারিলাম না। আজ যমযাত্রী হয়ে কিন্তু সবি বুঝিতে পারিলাম। এই দিনটি ছিল আমার জীবনে সর্বাপেক্ষা অধিক সুখের দিন। এ দিন প্রায়ই আমার চোখে কচুপাতার উপরে স্মৃতির পানির কণার মত ভাসিতে থাকে।

আমি একটি বিশাল পুকুরের উত্তর কোণাতে দাঁড়াইয়া আছি। গগনে নীল আকাশ—সূর্যমামা এখনো ঠিক মাথা বরাবর আসেনি। তখন মৃদু হাওয়া বইছে। আমার ডানদিকে একটি টিনের পাকা ঘর—বামদিকে বিশাল পুকুরটি—আর মধ্যখানে পাড়ার মানুষের চলাচলের চিকন রাস্তাটি। টিনের পাকাঘরের জানালা দিয়ে কেউ যেন উঁকি দিয়া কি দেখিতেছে। তাহার চোখে আমার দুই চোখ পড়িল। অতঃপর সে কেন জানি জানালার পর্দাটি বন্ধ করিয়া দিল। তাহাকে দেখিবার মাত্র আমার বুকে একটি জোরে কামড় উপলব্ধি করিলাম। সহসা আমার হিয়াতে একটি অজানা কালবৈশাখী ঝড় আরম্ভ হইল। ভাবিলাম—এ আমি কোন স্বর্গের অপ্সরীকে দেখিলুম। মানুষ কি কখনো এত সুন্দর হইতে পারে? তাহাকে আরেকবার দেখিবার লোভ সামলাতে পারিলাম না। আমি ঠিক ঐ জায়গাতে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া ছিলাম—ইশ, আর একবার যদি তাহারে দেখিতে পারিতাম।

প্রায় আধ-ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করিবার পরেও তাহার সাথে পুনরায় চক্ষুর মিলন হইল না। এদিকে হাতে ব্যাগের মাছের প্রায় গলিত অবস্থা। বিধাতার এ কেমন শাস্তি—বুঝিতে পারিলাম না। তাহার বদনটিতে এত মায়া-ভরা—এত নেশারী তাহা মুহূর্তের মধ্যে বুঝিতে পারিলাম। তাহার বদনের অপেক্ষা করিয়া পুনরায় না দেখিয়া ভাবিলাম—তাকে না দেখিয়া সারাজীবন কাটানো কিছুতেই সম্ভব নহে। মনে মনে প্রভুর কাছে প্রার্থনা করিলুম, ‘প্রভু, আমি যেন এই বদন সারাজীবন দেখিতে সমর্থ হই।’ প্রার্থনা করিবার পূর্বে পবিত্র হবার জন্য হাত-মুখ ধুইতে হয়। ঠাকুরদাদা তাহা সবসময় আমাকে বলিতেন। তিনি আরও বলিতেন, হাত-মুখ না ধুইয়া বা অপবিত্র হইয়া প্রার্থনা করিলে প্রভু খুশি হন না। সেদিন ওখানে দাঁড়িয়ে ঠাকুরের নিকট প্রার্থনা করিবার পূর্বে পবিত্রতার নিয়ম-কানুন কিন্তু আমি মানিলাম না। আজ ভাবিতেছি বোধ হয় সেজন্যই ঠাকুর সেদিন আমার মনের বাঞ্ছা পূর্ণ করিবেন না বলে ঠিক করিলেন। তাই বলিয়া তিনি আমাকে লঘু পাপে গুরু দণ্ড দিবেন? যা হোক, আর বেশিদিন নাই, ডাক্তারের দেওয়া তথ্যমতে ত্রিশ দিনের মধ্যে আমার সহিত যমবাবুর সাক্ষাৎ মিলিবে। সেদিন না হয় যমবাবুর মাধ্যমে পরমেশ্বরকে জিজ্ঞেস করিব, কেন তিনি আমাকে এমন একটি নির্দয়ী সাজাটি দিলেন।

চলবে...

এসইউ/জেআইএম