রুদ্র-প্রচেতা : পর্ব ০৫

ড. রাজুব ভৌমিক
ড. রাজুব ভৌমিক ড. রাজুব ভৌমিক , কবি ও লেখক
প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

বিকেলের খেলা শেষে আমি গোধূলিতে বাসায় ফিরিয়া গেলাম। উত্তাল তরঙ্গভঙ্গের একটু পরে পড়ার টেবিলে পড়িতে বসিলাম। এখন পড়াশুনাতে কি আর এই মন আছে? এই হৃদয় চলে যেন শুধু তাহার পাশে পাশে। কিছুক্ষণ পর জোর জোর শব্দ করিয়া পীথাগোরাসের উপপাদ্য আমি পড়িতে লাগিলাম। স্কুলের মাস্টারমশাই যে বলিয়াছিলেন, পীথাগোরাসের উপপাদ্যটি মাধ্যমিক পরীক্ষায় আসিবে। তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধে উপপাদ্যটি পড়িবার চেষ্টা করিলাম। ‘কোনো সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্র অপর দুই বাহুর উপর অঙ্কিত বর্গক্ষেত্রের সমষ্টির সমান।’ লাইনটি আমি কয়েকবার উচ্চস্বরে শব্দ করিয়া আমার দুই কান দিয়া মগজের গহ্বরে বারবার ঠেলিতেছিলাম—কিন্তু বারবার চেষ্টা করিয়াও আমি পীথাগোরাসের উপপাদ্যটি মগজের গহ্বরে ঠেলিতে সফল হইলাম না। ভাবিলাম, পীথাগোরাস মশাই এত কঠিন কিছু যে কেনই বা লিখিতে গেলেন—তাহা একমাত্র বিধাতাই জানে। উপপাদ্য—একে তো জ্যামিতি, তাহার উপর ইহাকে যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। তবে পীথাগোরাস মশাইয়ের সাথে যদি একবার দেখা হইত, তাহলে উনাকে একটি বার হইলেও ধন্যবাদ দিতাম—কারণ যখনি উনার উপপাদ্যটি পড়িতাম; তখনি আমার মাথার ভেতর প্রচেতার ভূতটি কেমনে জানি লাফাইয়া পালাইয়া যাইত। এরপর কয়েক ঘণ্টা একটু প্রচেতাবিহীন মগজ নিয়া সময় কাটাইতাম—এতে প্রচেতাকে সাময়িক হারাইলেও বিদ্যা নিশ্চিত অর্জন করিবার সুযোগটি পাইতাম। এ জীবনে পীথাগোরাস মশাইয়ের দেখা অসম্ভব। তাই ঠিক করিলাম বৈকুণ্ঠে যাইলে প্রথমে আমি তাহার সাথেই একটু দেখা করিব। আমি সেদিনই বুঝিতে পারিলাম যে, পীথাগোরসের জীবনে বোধ হয় কভু প্রণয় এসেও আসেনি—যদি সামান্য প্রেমও তাহার জীবনে আসিত। তাহলে তিনি সাক্ষাৎ রবীন্দ্রনাথ হইতেন, কখনো এই জ্যামিতিক উপপাদ্য লিখিতেন না।

যাক, যামিনী একটু গভীর হইলে মমতাময়ী ভোজন করিবার জন্য ডাকিল। ‘আয় রুদ্র, খাইতে আয়’, কহিলেন মমতাময়ী। কার্পু মৎস্যের ঝোল, ডাল, আলুর ভর্তা এবং ডিম ভাজি দিয়া ভোজন করিতে আমি উদ্যত হইলাম। ডাল এবং আলুর ভর্তা দিয়া নিশি ভোজন শুরু করিবার পর আমি কার্পু মৎস্যের একটি টুকরা আমার থালাতে নিলাম। হঠাৎ কোন এক চিন্তাতে নিমত্ত হইলাম—আর মৎস্যের টুকরাটি খাইতে পারিলাম না। হিন্দু পরিবারে যেহেতু আমার জন্ম সেহেতু শৈশবকাল থেকে বহুবার শুনিয়া আসিলাম—এইটা খাওয়া বারণ আবার ওটা খাওয়া বারণ; সে কত কি নিয়ম। এতেই আমি অভ্যস্ত ছিলাম। আমাদের পরিবারের মধ্যে আমি আর সহোদরারা ব্যতীত কেউ হাঁস কিংবা মোরগের মাংস খাইত না। আমার দিদিমাদের পরিবারের সবাই তো কোনদিন মৎস্যাহারও করিল না। কিন্তু আমাদের পরিবারের সবাই এবং গ্রামের প্রায় সবাই সানন্দে দৈনিক মৎস্যাহার করিত—আবার অনেকেই মাংস ছুঁইয়াও দেখিত না। মাংস খাইলে নাকি হিন্দুদের নিশ্চিত নরকবাসী হইতে হয়। কিন্তু গো-ভক্ষণ করিলে আত্মার ধ্বংস নাকি হইত—হিন্দুত্ব চলিয়া যাইত। আরও কত কি। যাহারা গো-ভক্ষণ করিত; তাহাদের আমরা ছোটবেলায় মানুষ না—মুসলমান বলিয়া জানিতাম। কারণ গরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় প্রাণি ছিল। শ্রীকৃষ্ণ গরুর লালন-পালন করিত—তাই তাহার আরেক নাম গোপাল। বৈকুণ্ঠবাসী ঠাকুরদাদা একদিন কহিলেন, গো-ভক্ষণ হিন্দুদের জন্য সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কারণ গরু আমাদের মায়ের মত। সবই বুঝিলাম—তাই আজ অবধি কোনদিন গো-ভক্ষণের চিন্তা মাথায়ও আসেনি। কিন্তু আজ নিশি ভোজনকালে মনে হইল ভগবান বিষ্ণুর নানা অবতারের কথা। স্কুলের হিন্দুধর্মের বইতে বিষ্ণুর দশ অবতার সম্পর্কে বহুবার পড়িয়াছি। বিষ্ণুর প্রথম অবতার ছিল মৎস্য অবতার। তিনি মৎস্যরূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন ধর্ম প্রতিষ্ঠা এবং মানবজাতি রক্ষা করার জন্য। ধর্ম বইয়ের ভেতর যে মৎস্যটি অঙ্কিত; তাহা দেখিতে অবিকল কার্পু মাছের মত। কার্পু মাছের টুকরাটি থালার মধ্যে দেখিয়া ভাবিলাম, হিন্দুরা বুঝি এবার কুটিলতা এবং ভণ্ডামির সীমা অতিক্রম করিল। যেখানে গরু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় প্রাণি ছিল বা মাতৃতুল্য বলিয়া হিন্দুরা গো-ভক্ষণ নিষিদ্ধ মানিল; সেখানে হিন্দুরা ভগবান বিষ্ণুর মৎস্য অবতারের কথা ভুলিয়া কেমন সানন্দে চোয়াল ভর্তি করিয়া মৎস্যাহার করিতেছে। ভাবিলাম আমার জেঠা মশাইকে এ নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করিব। কারণ উনার সমুদ্রসম শাস্ত্রের ভান্ডার। কিন্তু পরে জেঠা মশাইয়ের থাপ্পড়ের ভয়ে আর কিছু কহিলাম না।

যা-ই হোক, আমার এই অদ্ভুত ভাবনার জন্য না হয় পীথাগোরাস মশাইয়ের উপপাদ্যকে দায়ী করিলাম। কেননা উনার উপপাদ্য তো এক ধরনের জ্যামিতি; যাহা যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করিতে হয়। এতে জ্ঞানের ফটক সহজে উন্মুক্ত হইয়া যায়। জ্ঞান আহরণ সত্যিই ভয়ংকর—সেটা সেই নিশিতে ভোজনকালে বুঝিতে পারিলাম। আর তাই বুঝি তৎকালীন ব্রাহ্মণেরা হিন্দুদের নিচু জাতের কাউকে জ্ঞান আহরণ করিতে দিতেন না। এমনকি তখনকার ক্ষত্রিয়দেরও জ্ঞান আহরণের সীমা ছিল। যদিও ক্ষত্রিয়রা রাজা বা রাজবংশের ছিল কিন্তু তাহাদের জ্ঞান আহরণের বিষয়টি ব্রাহ্মণদের নিয়ন্ত্রণে সর্বক্ষণ ছিল। ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়দের শুধু অস্ত্রবিদ্যা শিখাইতেন—ইচ্ছে করিয়া অন্যকিছু তেমন শিখাইতেন না। আর বৈশ্য বা শুদ্রজাতের হইলে তো কথাই নেই। সারাজীবন ইহাদের গো-খাটনি করিতে হইত। আর ব্রাহ্মণদের পূজিত—দুহাত ভরিয়া দক্ষিণা দিত।

কোনমতে খাওয়া শেষ করিয়া—অযথা আর কিছু না ভাবিয়া আমি শুইতে গেলাম। বিছানায় মাথা লাগানোর পরপরই পীথাগোরাস মশাইয়ের উপপাদ্যের প্রভাবটি ধীরে ধীরে চলিয়া যাইতেছিল—আর মনে প্রচেতার ভাবনার উদয় হইতে লাগিল। শহরে স্থানান্তর হইবার পর বহুদিন আর প্রচেতার সাথে আমার দেখা হইল না। ভাবিয়া অজান্তে মোর নয়নে অশ্রুধারা বইতে লাগিল। না জানি প্রচেতা এখন কোথায় আছে? যদিও পাড়ার এক মাসি বিকেলে বলিয়াছিলেন যে, প্রচেতাদের পরিবারের সবাই তাদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াইতে গিয়াছে এবং তাহারা সবাই কিছুদিনের মধ্যে শীঘ্রই চলিয়া আসিবে। কিন্তু এ ভগ্নহৃদয় যেন আর কিছু বুঝিতে চায় না। প্রাণের অঙ্গনাকে শুধু একটিবার দেখিতেই চায়।

অঙ্গনা রে, তুমি থাক কত যোজন দূরে
নাও সখি তুমি কোন বাতাসের শোঁকান
কোথায় তোমার নাচে কেশ সংগীত সুরে
তুমি বিনে আঁখি মোর করে সর্বে সন্ধান।

তোমা পদছায়া বিনে বিবর্ণ নব্য ঘাসে
শিশির করে রোদন প্রভাতে চুপিচুপি
গলার সুর ভাঙ্গিয়া কোকিল গো উদাসে
বিমর্ষতাপূর্ণ গান গায় যেন কদাপি।

নীল গগনে শুভ্রতা অপেক্ষায় তোমাতে
ঝরে কাল হয়ে হঠাৎ অপ্রসন্ন পরাণে
অকালে শিউলি ঝরে গগনের কান্নাতে
কানন শূন্য হইল বিনে সখির ঘ্রাণে।

থাক তুমি কত দূরে মনে প্রেমদহন
তুমি বিনে মেঘে ঢাকা এ বিস্তর গগন
সূর্য ওঠে সূর্য নামে না দেখিল এ মন।

তাহার চিন্তা করিতে করিতে কখন যে ঘুমাইয়া পড়িলাম একটু টের পাইলাম না। এভাবে আরেক সপ্তাহন্ত হইল। এক প্রাভাতিতে মমতাময়ী আমার হাতে পাঁচশত টাকার একটি নোট দিয়া কহিলেন, ‘যা কিছু কাঁচা বাজার ও মাছ—বাজার থেকে কিনে আন।’ সকাল তখন দশটার বেশি হইবে না—আমি মমতাময়ীর হাত থেকে পাঁচশত টাকার নোটটি নিয়া আমাদের বাসা থেকে বাজার করিবার উদ্দেশে হাটিয়া রওনা দিলাম। আমাদের বাসাটির বামদিকে ছিল প্রচেতাদের বাসা—তারপর ছিল বাজারে যাইবার প্রধান সড়কটি। আমাদের বাসা হইতে কোথাও যাইতে হইলে আমাদের প্রচেতাদের বাসাটি অতিক্রম করিতে হইত। যেহেতু প্রচেতাদের বাসার বামদিকে প্রধান সড়ক এবং ডানদিকে আমাদের বাসা, তাই প্রচেতাদের কখনো আমাদের বাসাটি অতিক্রম করিতে হইত না। যদি তা হইত তাহলে আমাদের জানালার পাশে বসিয়া প্রতিদিন প্রচেতাকে দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতাম।

আমি সবেমাত্র প্রচেতাদের বাসাটি অতিক্রম করিলাম—এবং প্রধান সড়কের দিকে চলিতেছিলাম। প্রধান সড়ক থেকে প্রায় বিশ ফুট দূর থেকে দাঁড়াইয়া দেখিলাম, একটি রিক্সা আসিয়া প্রধান সড়কের এক কোণায় থামিল।

রিক্সাটিতে তিন জন মহিলাকে দেখিতে পাইলাম—এরমধ্যে দুইজনের চেহারা দেখিলাম। কিন্তু তাহাদের চিনিতে পারিলাম না। তাহারা দুইজন রিক্সার দুইপাশে বসিয়া ছিল—আর আরেকজন যে রিক্সার মাঝখানে বসিয়া আছে তাহা টের পাইলাম। রিক্সার মধ্যখানে আসনধারীর চেহারাটি এখনো দেখিতে পাইলাম না। তবে এইটুকু বুঝিতে পারিলাম যে, তাহার অদ্য রিক্সায় ভ্রমণকালটি তেমন সুখকর হয়নি। তদতিরিক্ত রিক্সাটিকে পরক্ষণে দেখিবার পর মনে হইল, প্রতিদিন ইহার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চালক মশাই জোর খাটিয়ে চালাইতেছে। ‘আহা, যন্ত্রের উপর মানুষের কি অযান্ত্রিক নির্যাতন!’ রিক্সাটির মরিচা-পূর্ণ জীর্ণ শরীর দেখিয়া আমার মনে যন্ত্রের জন্য একটু মায়া লাগিল। রিক্সাটির ছিদ্র-পূর্ণ শরীর দেখিয়া আমাদের গ্রামের সূর্যবাবুর গায়ের পরিহিত গেঞ্জির কথা সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়িল। সূর্যবাবুকে সেই ছোটবেলা থেকে দেখিতাম, তিনি একটি শ্বেত গেঞ্জি পরিধান করিয়া মাঠে বোরো ধান রোপণ করিতেছেন। তাহার গেঞ্জির মধ্যে যত ছিদ্র ছিল; তত ছিদ্র সম্ভবত মাছ ধরিবার জালেও ছিল কিনা সন্দেহ আছে। উপরন্তু মাছ ধরিবার জালে ছিদ্র সাধারণত একটু ছোট হইয়া থাকে। কিন্তু কেউ যদি সূর্যবাবুর গেঞ্জি দিয়া মাছ ধরিবার চাইত, তাহলে সেটা দিয়ে বড় বড় বোয়াল মাছ ছাড়া আর কোন মাছের সন্ধান মিলিত না। আজ আমি এই জীর্ণ রিক্সাটির নিঃশব্দ আর্তনাদ শুনিয়াছি। দেখিয়াছি চালকবাবু কিভাবে হাতের ব্রেকের সাহায্য না নিয়া রিক্সাটিকে জোর করিয়া পায়ের বাটার স্যান্ডেল দিয়া থামাইতেছিল। রিক্সাতে ছিল না কোন ঘণ্টার নিশানা—না ছিল চালকবাবুর বসিবার পীঠিকা। বুঝিতে পারিলাম, চালকবাবু সারাটি পথ রিক্সাটিকে দাঁড়াইয়া চালাইয়াছে। ‘আহা, বেচারার কতই না কষ্ট।’ এবার চোখ পড়িল রিক্সা চালকবাবুর পাকানো শ্মশ্রুধারী কাল বদন—বয়স তাহার নিশ্চিত ষাটের কাছাকাছি। চালকবাবুর খালি গায়ের শরীরটি দেখিলে ত্রিশ বছরের বেশি কারো ধারণা হইবে না। কিন্তু তাহার মুখমণ্ডল দেখিয়া মনে হইল, প্রতিদিন তিনি যাত্রীর ভার বহন করিবার পাশাপাশি তিনি কোন এক অজানা ভারী পৃথিবীরও ভার দৈনিক বহন করিয়া থাকেন। যেই ভারের কথা তিনি কাউকে বলিতে পারেন না—শুধু একাকী সেই ভার বহন করিতে করিতে ধীরে বসুন্ধরা তলে প্রবেশ করিতেছেন। মানুষের জীবন আসলেই কতই না সংগ্রামপূর্ণ—তাহা চালকবাবুকে না দেখিলে বুঝিতাম না।

‘মা, আমার ব্যাগটি কই?’ রিক্সার মধ্যখানে আসনগ্রহণ করা মেয়েটি হঠাৎ আরেক ভদ্রমহিলাকে বলিলেন। এতক্ষণেও মেয়েটির চেহারা আমি দেখিতে পারিলাম না—কিন্তু এ মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনিবামাত্র আমার কলিজায় হঠাৎ এক অজানা শীতল কামড় অনুভব করিতে পারিলাম। যেমন নেকড়ে তাহার শিকার হরিণ শাবককে হঠাৎ এক কামড়ে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়া দূরে চলিয়া যায়। তেমনি ঐ কণ্ঠস্বর আমায় হঠাৎ ছোঁ মেরে কোন এক অজানা রাজ্যের গহীনে টানিয়া নিয়া যাইতেছিল। সেটা টের পাইলাম। না, আমি এমন কণ্ঠস্বর এই জীবনে কখনো শুনিনে—তবে কেন জানি মনে হইতেছিল এই কণ্ঠস্বর আমার হাজার বছরের চেনা, যা শুনিবার লাগি আমি জনম জনম তপস্যা করিয়াছিলাম। যে কণ্ঠস্বর শুনিবার জন্য সময় প্রকৃতির নিয়ম না মানিয়া সাময়িক কার্যান্তর করে। গানের কোকিল সে যে সুর শুনিয়া লজ্জায় কাঁপিতে কাঁপিতে কোন এক অজানায় উড়িয়া যায়। বাতাসে উড়ানো ধূলিকণারা যাহার কণ্ঠস্বর শুনিবার লাগি মাটির উপরে দুহাত মাথার নিচে দিয়া আকাশের পানে চাহিয়া অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। ‘ও ঈশ্বর! একি আবার কাহার প্রেমে আমি পড়িলাম।’ তার এই কণ্ঠে ছিল কোন এক অদৃশ্য শক্তি; যাহা এ হৃদয়ে হঠাৎ প্রাণের সঞ্চার করিল। মনে হইল যেন এতদিন মৃত ছিলেম—এই মাত্র এই কণ্ঠস্বরের আহ্বানে আমি হঠাৎ জাগিয়া উঠিলাম।

আমার বাল্যবন্ধু শুভাঙ্ক একদা আমারে কহিয়াছিলেন, ‘মানুষ মরে গেলে মাটি তাহারে টানে, আর বেঁচে থাকলে তাহারে টানে সর্ব প্রেম। নানা ধরনের প্রেম, নানা ভাবের প্রেম, নানা রঙের প্রেম, নানা মানুষের প্রেম।’ শুভাঙ্ক এক প্রেমে কভু বিশ্বাস করিত না। একদা সে আমারে তার দন্ত খিছিয়া কহিয়াছিল, ‘বেটা তুই একটা মেয়ের প্রেমের পিছনে ছুটছিস, আর আমি এতদিনে কতবার যে প্রেমে পড়িয়াছিলাম, আবার কতবার প্রেম আমার উপরে পড়িয়াছে। এর কোন অন্ত নাই।’ এই মুহূর্তে আমার শুভাঙ্কের কথা বহুবার মনে পড়িতেছে। কারণ এতদিন শুধু আমি প্রচেতাকে মনে প্রাণে ভালোবাসিয়াছি—এখনো তাহাকে অনেক ভালোবাসি। কিন্তু আজ আমি কোন এক অজানা মেয়ের নতুন প্রেমে পড়িলাম। যার মুখখানিও এখনো দেখিলাম না। তাহলে কি শুভাঙ্কর কথাই সত্য? আজ আমি এক অজানা মেয়ের কণ্ঠস্বর শুনিয়া প্রেমে পড়িলাম—না জানি অন্যদিন আবার কী হবে?

আমাদের গ্রামে রতন নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি বয়সে আমার পিতৃ-সমতুল্য—তবে কোন এক অজানা কারণবশত ভদ্রলোকটি কখনো বিয়ে করেননি। একদিন গ্রামের বয়স্করা রতনকে মজা করিয়া জিজ্ঞেস করিলেন, ‘কিরে রতন, তুই কি আর কখনো বিয়ে করবি না। বয়স তো তোর কম হয়নি।’ শুনে রতনের মেজাজটা হঠাৎ গরম হইয়া যায়। আমি তাহা বসিয়া বসিয়া দেখিতেছিলাম। তিনি উত্তরে বলিলেন, ‘জীবনে যত প্রেম করিয়াছি, এতে আমার বিয়ে না করলেও হবে, কাকা।’ পরে অবশ্য আমি জানতে পারছিলুম, রতন যুবক বয়সে বহুবার প্রেমে ব্যর্থ হইয়াছে। তাই সে একবার সিদ্ধান্ত নিল যে, আর কখনো সে মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করিবে না। আমি রতনের কথা প্রায় ভুলিয়া গিয়াছিলাম। কারণ এতদিন শুধু ভাবিলাম যে প্রেম শুধু জীবনে একবারই আসে—এবং এ কথা আমি মনে-প্রাণে ভীষণ বিশ্বাসও করিতাম। কিন্তু আমার আশেপাশে এমন কোন মানুষের উদাহরণ ছিল না যে, কেউ মাত্র একবার প্রেমে পড়িয়া সুখী হইয়াছে। সবাই তাদের জীবনে বহুবার প্রেমে পড়িয়াছে। আমি কিছুতেই বহুবার প্রেমে পড়ার বিষয়টি মানতে পারিলাম না। কারণ প্রকৃত প্রেম স্বর্গীয় যা বিধির বিধান—এতে মানুষের দুইবার প্রেমে পড়ার সুযোগ নেই। তাই আজি নিজেকে দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়িতে দেখিয়া কিছুটা আশ্চর্য ও বিব্রত হইলাম। এতদিন নিজেকে জানিতাম বলে কতই না বড়াই করিয়াছিলাম। কিন্তু আজ আর আমি নিজেকে চিনিতে পারিলাম না।

আসলে প্রকৃত প্রেম সব মানুষের জীবনে একবার আসে। দুই বা ততোধিক বার আসিলে তখন মানুষকে যাচাই করিতে হয়, আসলে কোনটা প্রকৃত প্রেম এবং তখন আমাদের প্রকৃত প্রেমকেই বাছাই করিতে হয়। নকল প্রেমকে প্রকৃত ভাবিয়া সংসার জড়াইলে জীবনে অত্যধিক দুঃখ ভোগ করিতে হয়। বিধাতার লীলা মানুষের বোঝা দায়। কখনো কখনো বিধাতা আমাদের প্রথমেই প্রকৃত প্রেমের সন্ধান দেন। আমার তাহা আসল না বুঝিতে পারিয়া অন্যত্র প্রেম খুঁজিতে মগ্ন থাকি। আবার কখনো কখনো বিধাতা আমাদের নকল প্রেমের সন্ধান দিলে, আমরা তাহা আসল বুঝিয়া সাথে কুরুক্ষেত্র জয় করিয়া তাহার সাথে সংসার করি। তাহাতে আমাদের জীবনে নামে যত বিপদ। আবার কখনো কখনো বিধাতা আমাদের জীবনে আসল-নকল মিলিয়ে বহুবার প্রেমের সন্ধান দেন আর আমরা সেটা শুধু দর্শকের মত দেখিতে থাকি। সব বুঝেও না বোঝার ভান করিয়া থাকি—আবার পরে ‘এই জীবনে প্রেম এলো না’ বলে বিধাতার দোষ দিতে কার্পণ্য করি না। এটাই আমাদের স্বভাব। তাহলে কোনটা প্রকৃত প্রেম বা কোনটা নকল প্রেম সেটা চেনা যাইবে কেমনে? আসলে মানুষের জীবনে ‘প্রকৃত প্রেম’ আসিল কি-না তাহা বুঝিতে হইলে তাহাকে স্বর্ণকার হইতে হইবে। একজন স্বর্ণকারের কাছে প্রতিদিন নানাধরনের স্বর্ণ ক্রেতা বা বিক্রেতারা নিয়ে আসে—কিন্তু স্বর্ণকার যদি সব স্বর্ণ আসল ভাবিয়া কিনিয়া নেয়, তাহলে কিছুদিনের মধ্যে সে ফকির হইয়া যাইবে। সে আর স্বর্ণকার থাকিবে না।

প্রেমিকের স্বর্ণকারের মত সরল কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখ থাকিতে হইবে—আর সেই চোখ দিয়া প্রকৃত প্রেমের মানুষের চোখের সাথে মিলিয়া দেখিতে হইবে। পৃথিবীর সকল ভাষাতে মিথ্যা থাকিলেও চোখের ভাষাতে বিন্দুমাত্র মিথ্যার আশ্রয় নাই। উপরন্তু স্বর্ণকার যেমন কষ্টিপাথর ঘষিয়া আসল বা নকল স্বর্ণ চিনিয়া কিনে নেয়; তেমনি মানুষের হৃদয়কে কষ্টিপাথরের মত গড়িতে হইবে। হৃদয়খানি জলের মত তরল হইলে আজীবন সেই জল দুই চোখ দিয়া বইয়া যাইবে। তাই আমি মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনিয়া প্রেমে পড়িবার পর ঠিক করিলাম, তাহার চোখের ভাষা আমায় একটু বুঝিতে হইবে। তাহাকে দেখিবার জন্য বহুবার আমি চেষ্টা করিলাম কিন্তু একটি মহিলার জন্য আমি তাহার মুখ দেখিতে পারিতেছি না।

রিক্সার মাধ্যখানে আসন-গৃহিত মেয়েটি এবার রিক্সা থেকে নামিয়া তাহার পায়ের জুতাগুলো ঠিক করিতেছিল। এদিকে আমি তাহার বদন দেখিবার জন্য চেষ্টা করিতেছিলাম—কিন্তু তাহার বদন দেখিতে পারিতেছি না। পায়ের জুতাগুলো ঠিক করিয়া এবার মেয়েটি তাহার মাথা উপরে উঠাল। আমি তাহার বদন দেখিয়া পুরোপুরিভাবে স্তব্ধ হইলাম। আশ্চর্য তবে হইলাম না। এই সেই বদন; যেটি বিন্দুমাত্র দেখিবার জন্য হাসিতে হাসিতে গ্রেনেড থামাতে রাজী। যে বদনের বর্ণনা দেবার মত কোন ভাষা এখনো পৃথিবীতে রচিত হয়নি। চন্দ্র, পুষ্প, নীল-আকাশ—এ ধরায় এমন কোন কিছু সৃষ্টি হয় নাই; যাহা দিয়া বর্ণনা করা যাইবে তাহার সৌন্দর্য। কতই না নিখুঁত করিয়া বিধাতা যেন তাহাকে সৃষ্টি করিয়াছে। সে যে আর কেহ নহে—সে মোর প্রাণের প্রচেতা। যাহাকে দেখিয়া সেই কবে প্রেমে পড়িলাম। যার কণ্ঠস্বর শুনিবার পর আমি প্রায় উন্মাদ হইয়াছিলাম।

চলবে...

এসইউ/এমকেএইচ