সালাম সালেহ উদদীনের ‘অমৃত কথা’

ড. মিল্টন বিশ্বাস
ড. মিল্টন বিশ্বাস ড. মিল্টন বিশ্বাস , অধ্যাপক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:৪৩ পিএম, ০২ নভেম্বর ২০২০

২ নভেম্বর কবি, কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও সাংবাদিক সালাম সালেহ উদদীনের জন্মদিন। তিনি ১৯৬৫ সালের এই দিন ঢাকা জেলার দোহারে জন্মগ্রহণ করেন।সম্প্রতি কয়েক বছর তিনি কবিতা রচনায় নিয়োজিত থাকলেও অনেকদিন থেকে লিখছেন গল্প-উপন্যাস-কলাম-প্রবন্ধ-নিবন্ধ। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একাধিক সমালোচনামূলক গ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর নিজের গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ১০০টি। তিনি কেবল সস্তা জনপ্রিয়তা পাবার জন্য লেখেননি। তাঁর রয়েছে জীবন সম্পর্কে নির্দিষ্ট অবলোকন। তিনি পরিশ্রমী ও সৎ লেখক দলের অন্তর্ভুক্ত। লেখকের লেখনির ভেতর আন্তরিকতা থাকলে এবং সেখান থেকে জগৎ ও জীবন সম্পর্কে নতুন বোধের উৎসারণ ঘটলে পাঠককে তা আন্দোলিত করে। সালাম সালেহ উদদীনের লেখায় স্বতন্ত্র জীবনবোধ তৈরির প্রচেষ্টা অনেক আগে থেকেই লক্ষণীয়। তাঁর গল্প-উপন্যাস থেকে লেখকের জীবন, সমাজ ও মানবিক দৃষ্টি আবিষ্কার করা যায়। মানবজীবন রহস্যের সন্ধানে নিয়ত নিমগ্ন এই লেখক ২০১৩ সালে তাঁর বিভিন্ন সময়ের অনন্য ভাবনাগুলোকে এক মলাটে বন্দি করেছেন। নাম দিয়েছেন ‘অমৃত কথা’। একটি, দুটি বাক্যে নির্মেদ চিন্তাগুলো আমাদের কাছে হীরক দ্যুতির মতো মনে হয়েছে; যার আলোকছটা অনেক অব্যক্ত রহস্য উন্মোচনে সহায়ক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘লেখন’-এর অন্তর্গত ছোট ছোট রচনা রয়েছে তিন পঙ্ক্তির জাপানি ‘হাইকু’ কবিতার মতো আবার কবির ‘কণিকা’য় রয়েছে নীতি-আদর্শ ও প্রগাঢ় ভাবসত্যের যুক্তিময় প্রকাশ। এখানে ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি সমস্ত কিছুই তিনি দুই থেকে আট চরণে ব্যক্ত করেছেন। অনুরূপভাবে হুমায়ূন আজাদ তাঁর ‘প্রবচনগুচ্ছে’ জ্ঞানগর্ভ তত্ত্ব বা উপদেশ প্রচারের জন্য নয় বরং বাঙালি জীবনের গম্ভীর ও হালকা চিন্তার নির্যাস ব্যক্ত করেছেন। যাতে নতুনত্ব রয়েছে আর চমক সৃষ্টির প্রয়াসও লক্ষণীয়। সালাম সালেহ উদদীনের ‘অমৃত কথা’ সেক্ষেত্রে নতুন প্রচেষ্টা নয়। বরং বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় তাঁর এ ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের অনিবার্যতা স্বীকৃত। সালাম সালেহ উদদীন স্বল্প পরিসরে কখনো হালকাভাবে আবার কখনো নিজের অভিজ্ঞতা ও কল্পনার জারকরসে জারিত করে সুভাষিত বাক্য চয়ন করেছেন। জীবনের সামগ্রিক দিক সম্পর্কে জ্ঞান ও পরামর্শ তাঁর ‘অমৃত কথা’র পরতে পরতে উচ্চকিত। তিনি অনেক গূঢ় তত্ত্ব মাত্র একটি বাক্যে তুলে ধরেছেন। সহজ সরল ভাষাভঙ্গিতে তাঁর উপস্থাপনা পাঠকের জন্য বাড়তি পাওনা।

পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য অর্থের অনিবার্যতাকে তিনি ভালই উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মতে, ‘বিত্তহীন মানুষের দুঃখ ও দুর্ভোগের শেষ নেই।’(পৃ ৪১) আবার অর্থের সঙ্গে প্রেম ভালোবাসাকে বিজড়িত করেছেন। ‘দুটি বিষয়ের চর্চা প্রতি মুহূর্তে করতে হয়- অর্থ ও ভালোবাসার।’(পৃ ৪২) অন্যদিকে বর্তমানে প্রেম ও ভালোবাসা অর্থ আর স্বার্থ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলেও তিনি মনে করেন। ‘ইদানিং প্রেম ভালোবাসাকে মাপা হয় অর্থ ও স্বার্থের নিক্তিতে।’(পৃ ৪৩) তিনি নীতির কথা অনেক জায়গাতে বলেছেন, আবার তাঁর মনে হয়েছে ‘যার মাথায় সব সময় নীতিকথা ঘুরপাক করে তিনি সমাজ বাস্তবতা কম বোঝেন।’(পৃ ৩১) তবে ব্যক্তি জীবনে ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন ‘অমৃত কথা’র লেখক। লিখেছেন একাধিক অভিনব বাণী। যেমন, ‘যাদের জিদ বেশি তারা জীবনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত।’(পৃ ৩১)

নারী নিয়ে একাধিক প্রবচন রয়েছে সালাম সালেহ উদদীনের। তাঁর অনেক উপন্যাস, ছোটগল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন নারী। কেবল নারী নয় তার সাথে পুরুষের সম্পর্ক ও জটিলতা অনেক কাহিনির মৌল স্তম্ভ। ‘অমৃত কথা’য় নারীর সঙ্গে পুরুষ ও অর্থ প্রসঙ্গ জড়িত হয়েছে অনেক বক্তব্যে। তাঁর আত্মগত উক্তি- ‘নারীর শরীর না পেলে জীবন অর্থহীন।’(পৃ ৯) নারী সম্পর্কে একই ধরনের ভাবনা কিন্তু বিচিত্রকথায় ব্যক্ত হয়েছে অনেক নিটোলবাণী। যেমন শেষ দিকে তিনি লিখেছেন, ‘নারীর যৌন-হুমকির কাছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিও অসহায়।’(পৃ ৬৩) তার আগে বলা হয়েছে, ‘নারীকে জয় করা মানে স্থায়ী শত্রু তৈরি করা।’(পৃ ৫০) বিপরীত বক্তব্য লক্ষণীয়- ‘নারী সৌন্দর্য মেলে ধরলেই রক্ষণশীল সমাজে তার চলাফেরার ঝুঁকি অথবা জীবনঝুঁকি বেড়ে যায়।’(পৃ ৪৮) এই সামাজিক সত্যকে স্বীকার করে নিলেও সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কাছে বিতর্কিত মনে হতে পারে তাঁর কোনো কোনো মন্তব্য। লেখক নিজেই বারবার পুরুষের কামার্ত স্বভাবের বিষয়ে বলেছেন একাধিক বাণীতে। তাই ‘কালো মেয়েরা নিরাপত্তাহীনতায় কম ভোগে।’(পৃ ৪৬) এই নারী মনস্তত্ত্ব যথার্থ কিনা ভেবে দেখা দরকার। আরো একটি স্মরণ করা যেতে পারে- ‘অর্থ ও নারী বিষয়ে পুরুষের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।’(পৃ ৩১) প্রেমের বিষয়ে শারীরিক সম্পর্ককে সালাম সালেহ উদদীন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তিনি লিখেছেন- ‘এক মিনিটের শরীরী সম্পর্ক হাজার বছরের স্পর্শহীন ভালোবাসার চেয়ে উত্তম।’(পৃ ৪৭) এক্ষেত্রে পুরুষকে নেতিবাচক করে চিহ্নিত করেছেন বারবারই। ‘নারীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষ সাধারণত শরীরের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না।’(পৃ ৪৬) তিনি আরো বলেছেন- ‘বেশিরভাগ পুরুষই ধরো মারো, খাও, ভোগ করো, শাসন ও শোষণ করো- এই নীতিতে বিশ্বাসী।’(পৃ ১১) এখানে ‘বেশিরভাগ’ শব্দ থাকলেও তিনি যেন পুরুষ বিদ্বেষী লেখক।

তবে ‘অমৃত কথা’য় জীবন নিঙড়ানো বয়ান আছে একাধিক। যেমন, ‘ধনীরা তো বটেই, এখন গরিবরাও সৎ নয়।’(পৃ ৬১) অথবা ‘শ্রেষ্ঠ যৌন সুখ কোনো কোনো মানুষ কখনো একজীবনেও পায় না।’ তাঁর একটি অসামান্য বাক্য যেটি ‘অমৃত কথা’র অন্যতম একটি- ‘জীবনের ব্যর্থতা নিয়ে আক্ষেপ করতে নেই। তাতে আরেক ব্যর্থতার জন্ম নেয়।’(পৃ ৮) বাঙালি সম্পর্কে অনিবার্য উক্তি রয়েছে অনেক। ‘বাঙালির প্রধান আকাঙ্ক্ষা মানুষ হওয়া নয় বিখ্যাত হওয়া।’(পৃ ১৪) ‘কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সংস্কৃতি বাঙালিদের মধ্যে আজও গড়ে ওঠেনি।’(পৃ ৫১) অথবা ‘বাঙালি লড়াকু, বিস্মৃতিপরায়ণ, সংকীর্ণমনা এবং পরশ্রীকাতর।’(পৃ ৫১)

মূলত ‘অমৃত কথা’য় সালাম সালেহ উদদীনের আবেগ-অনুভূতি গভীর ভাবনায় আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁর মননই উপজীব্য হয়েছে বাণী কথনের নিবিড় সংরাগে। এ গ্রন্থের অনুভূতি স্নিগ্ধ- অনেক বাক্য আমাদের আলোড়িত করে। চিরন্তন বাণীতে বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চারণই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে দেখা গেল তিনি হৃদয়বৃত্তি ও মননশীলতার যৌথায়ন ঘটিয়েছেন। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে বৌদ্ধিক সারাৎসার সন্ধান করতে তাঁকে অনেক সতর্কতার সঙ্গে ‘অমৃত কথা’র বাক্যগুলো রচনা করতে হয়েছে। এজন্যই এসব বিশুদ্ধ চিন্তায় যুক্ত হয়েছে চিত্রময়তা ও প্রতীক। যেমন, ‘মুগ্ধতার কোনো সীমারেখা নেই।’(পৃ ২৯) অথবা ‘অনেক সময় নারীর কান্না বৃষ্টির কান্নাকেও হার মানায়।’(পৃ ৩৩) এভাবে মাধুর্যময় বাক্যের পরে বাক্য সৃষ্টিতে সালাম সালেহ উদদীনের দক্ষতার আত্মপ্রকাশ; তাঁর ‘অমৃত কথা’কে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সংযোজনে পরিণত করেছে। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ ও ছাপা সুন্দর ও পরিপাটি। বইটির বহুল প্রচার কাম্য। (অমৃত কথা, সালাম সালেহ উদদীন, ২০১৩, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, প্রচ্ছদ: সুখেন দাস, মূল্য : ১০০ টাকা।)

এইচআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]