ভিডিও EN
  1. Home/
  2. ক্যাম্পাস

কমিটি নেই ৬ বছর, অস্তিত্ব সংকটে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ

মো. নাহিদ হাসান | প্রকাশিত: ০৯:০৬ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২২

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। সেই ছাত্রলীগের এক সময়ের ক্যান্টনমেন্ট বলা হতো ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে। ছাত্রলীগের এ ইউনিটের রয়েছে নানান গৌরবগাথা ইতিহাস। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয় ঢাকা কলেজ থেকে।

১৯৬৭-৬৮ সালে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগ, ঢাকা কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন রেজাউল হক চৌধুরী মুশতাক। তিনিই ১৯৬৮ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কলেজ শাখা, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের প্যাডে ‘আজব দেশ’ শিরোনামে নিজের সারথী (ছদ্মনাম) নামে প্রথম ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

ঢাকা কলেজে ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে অনেকেই জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রেখেছেন। রাজপথে বরাবরই সরব ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ। তবে এ ইউনিটের কমিটি গঠনে কেন যেন বরাবরই পিছু হটে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। গত দুই যুগে মাত্র চারটি কমিটি পেয়েছে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ। এর মধ্যে একটি আহ্বায়ক কমিটি। দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা যেমন রাজনীতিবিমুখ তেমনিভাবে দীর্ঘদিন রাজনীতিতে জড়িত থেকে হতাশায় ভুগছেন অনেকেই। পদপ্রত্যাশীরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আমরা চলে যাওয়ার পর ঢাকা কলেজে আর কেউ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে না, কেননা এতে ভবিষ্যৎ নেই বরং অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকা দায় হবে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের।

ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালের ২৯ নভেম্বর রাতে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের দু’গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩০ নভেম্বর স্থগিত করা হয় ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি। তখন ফুয়াদ হাসান পল্লব সভাপতি ও সাকিব হাসান সুইম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

এ ঘটনার দীর্ঘ তিন বছর পর ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিন মাসের জন্য নুর আলম ভূঁইয়া রাজুকে আহ্বায়ক করে একটি আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন। এরপর ২০১৭ সালের ২২ জানুয়ারি দু’গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাকা কলেজ শাখার আহ্বায়কসহ ১৯ নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। বর্তমানে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের আহ্বায়ক কমিটিতে ২৮ জন যুগ্ম আহ্বায়ক ও ৯০ জন সদস্য রয়েছে। তবে, এর মধ্যে অনেকেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগের রাজনীতি ছেড়েছেন। কেউবা মনোকষ্টে রাজনীতিবিমুখ হয়ে চাকরি নিয়ে বিয়ে করে সংসারী হয়েছেন। এর বাইরেও শতশত কর্মী রয়েছে যারা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে রাজপথে সরব থেকেছেন।

কলেজ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকা কর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিন কমিটি না হওয়ায় তারা মানসিক হতাশায় ভুগছেন। অনেকে রাজনীতিতে সময় দিয়ে এখন আর চাকরিতে ঢুকতে পারছেন না। দীর্ঘদিনের রাজনীতিতে প্রাপ্তির খাতায় যেন শুধুই শূন্য। তবে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি কেন হয় না? এ প্রশ্নের উত্তর কেউই জানেন না।

কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে কথা বলতে গেলে একাধিক নেতাকর্মী জাগো নিউজকে বলেন, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি কেন হয় না এটাই তারা বুঝতে পারেন না। অথচ দলের যেকোনো প্রয়োজনে এ ছাত্রলীগের এ ইউনিট রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, এসব নিয়ে কথা বলতে এখন আর ভালো লাগে না। এতদিন রাজনীতি করে কী পেলাম। বয়সও শেষের দিকে। ছাত্রলীগের রাজনীতিতো আর করতে পারবো না। ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আমরাও তো মানুষ। আমাদের সঙ্গে কেন এ অবিচার। ভেবেছিলাম বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি আমাদের ইউনিটের কমিটি দেবে। অন্তত আমরা একটা পরিচয় পাবো। এখন ভাগ্যে কি আছে জানি না।

ঢাকা কলেজে দশ বছর ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে মনকষ্টে রাজনীতি ছেড়েছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। এসব নেতারা ক্ষোভপ্রকাশ করে বলছেন— ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে দমিয়ে রাখার জন্যই কমিটি দেওয়া হয় না। সবাই চায় ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে। কিন্তু এ ইউনিটের প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া হয় না। ২০০৮ সাল থেকে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন রাসেল মাহমুদ। সর্বশেষ আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি যুগ্ম আহ্বায়ক পদও পেয়েছিলেন। তবে কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের কোনো প্রক্রিয়া না দেখে অনেকটা বাধ্য হয়েই করোনা পরবর্তী সময়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। বিয়ে করে সংসারীও হয়েছেন।

রাসেল মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ছাত্রলীগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট ঢাকা কলেজ। দীর্ঘদিন এখানে কমিটি হয় না। এ দ্বায় অবশ্যই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে নিতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ একসময় পঙ্গু হয়ে যাবে। সাবেক হিসেবে আমরা চাই দ্রুতই ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়া হোক।

১৯৯৮ সাল থেকে ২০০২ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সম্মেলনের আগ পর্যন্ত ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফিরোজ আল আমিন। বর্তমানে তিনি আওয়ামী যুলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপশিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক সম্পাদক।

সাবেক এ ছাত্রনেতা বলেন, ঢাকা কলেজের দীর্ঘদিনের ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য আছে। বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ। এখান থেকে অনেক জাতীয় নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। আমাদের সময়েও কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মেলনের আগে কলেজে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি হয়ে যেতো। তবে পরপর তিনবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ দলীয় মিটিং-মিছিলে সরব ছিল। তবে কমিটি দিতে কেন এ বিলম্ব তা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরাই ভালো বলতে পারবেন।

তবে নিয়মিত ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি না হওয়ায় এখান থেকে নেতৃত্ব তৈরি না হওয়া এবং জাতীয় রাজনীতিতে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখতে পারছেন না বলেও মনে করেন সাবেক এ ছাত্রনেতা।

ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটির সভাপতি ফুয়াদ হাসান পল্লব বলেন, ভৌগলিক এবং জন্মগতভাবে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগ একটি শক্তিশালী ইউনিট। একটা ছাত্রের ছাত্রত্ব থাকে আট বছর সেখানে যদি একটা ছেলে দশ বছর রাজনীতি করেও কমিটি না পায় তখন সে চাকরির দিকেও যেতে পারে না বরং মানসিক হতাশায় ভোগে। এভাবে এ ইউনিটে নেতৃত্ব বিকশিত হচ্ছে না, অনেক যোগ্যতাসম্পন্ন ছেলে হারিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে সেই শ্রমের মূল্যায়ন না পেয়ে হতাশায় ভুগছে। এভাবে ঢাকা কলেজ থেকে নেতৃত্ব তৈরির জায়গাটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

তবে কমিটি কেন হয় না? এসব বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে একাধিকবার ফোন করলেও তারা রিসিভ করেননি।

কলেজটির দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজীর হোসেন নিশী বলেন, কমিটি দেওয়ার জন্য বেশ কিছু প্রক্রিয়া আছে। কমিটি চাইলেই দেওয়া যায় না। কিছু বিষয় মাথায় রেখে, মেইনটেন করে কমিটি দিতে হয়। আমরা কমিটি দেওয়ার জন্য আন্তরিক ছিলাম, এখনও আছি। ঢাকা কলেজের কমিটি হবে হবে এ মুহুর্তে আমাদের সম্মেলনের প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। তবে কেন এতদিন কমিটি দেওয়া হয়নি এ প্রশ্নের সদুত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ দিতে পারবেন।

ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের চার নেতার একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক জাগো নিউজকে বলেন, আগামী ৬ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন হবে। নতুন নেতৃত্ব এসে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করবে।

এমএএইচ/এমএস