EN
  1. Home/
  2. আইন-আদালত

‘ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো কি না জানি না’

মিজানুর রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম | প্রকাশিত: ০৩:৫৬ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২১

বিকেল গড়িয়ে পশ্চিমের আকাশে সূর্য যখন অস্তের পথে, ৬২ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল হালিম তখন নামেন চট্টগ্রাম আদালত ভবন থেকে। দুপুরের খাওয়া তখনও হয়নি। দিনের শেষে তাই আদালত ভবনের সামনের দোকানে হালকা নাস্তা করেন। চোখের কোণে চিক চিক করছে পানি। কারণ প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয়নি তার বড় ছেলে শাহাদাত হোসেন মৃধা হত্যার বিচার। এ সময় নানান প্রয়োজনে অর্ধশতাধিকবার এসেছেন আদালতে। তবে কয়েক দফা অভিযোগপত্র, সম্পূরক অভিযোগপত্র শেষে এখনও আসামির বয়স নির্ধারণ নিয়েই দফায় দফায় হচ্ছে শুনানি।

আদালত প্রাঙ্গণে আব্দুল হালিম বলেন, তার ছেলের হত্যাকারীরা বেশ প্রভাবশালী। এরই মধ্যে প্রধান আসামি ফরহাদুর রহমান জবানবন্দি দিয়ে ‘ফাঁসিয়ে দিয়েছেন’ তার মেজ ছেলে অহিদুল ইসলাম অপুকে। তাই বড় ছেলেকে হারানোর পর তার আরেক ছেলেও হয়েছেন ফেরারি আসামি। উপার্জনক্ষম তার আর কেউ নেই। সংসার চালাবেন নাকি মামলা চালাবেন, সেই চিন্তায় এখন দিন যায় তার।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল কথা-কাটাকাটির জেরে চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার হিলভিউ এলাকায় ফরহাদুর রহমানের ছুরিকাঘাতে খুন হন শাহাদাত হোসেন জয়। সেদিন শাহাদাতের বাবা আবদুল হালিম বাদী হয়ে ফরহাদকে একমাত্র আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্তভার পান বায়েজিদ বোস্তামী থানার তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (এসআই) গোলাম নাসিম। পরদিনই আসামি ফরহাদকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতারের পর আসামি ফরহাদ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেন, নিহত শাহাদাত এবং তার ছোটো ভাই অপু দুজনই তার বন্ধু। ঘটনার দিন তার সঙ্গে শাহাদাতের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি শাহাদাতকে হত্যার জন্য তার ভাই অপুর কাছ থেকে একটি ছুরি আনেন এবং সেই ছুরি দিয়েই শাহাদাতকে হত্যা করেন। ঘটনার পর তিনি ফুপুর বাসায় আশ্রয় নেন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি বাসার পাশের নালায় ফেলে দেন।

এদিকে মামলা তদন্তে দায়িত্ব পাওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর শাহাদাত হত্যায় তার ছোটো ভাই অপুকে একমাত্র আসামি করে অভিযোগপত্র এবং মামলার এজাহারের একমাত্র আসামি ফরহাদের বয়স ১৭ বছর অর্থাৎ কিশোর অপরাধী দেখিয়ে দোষীপত্র আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাসিম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আসামি ফরহাদের নামে জন্মনিবন্ধন ও একটি স্কুলের প্রবেশপত্র দেখিয়ে বয়স ১৭ বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও ফরহাদ নিজেই আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ১৯ বছর বলে স্বীকার করেছিলেন এবং গ্রেফতারের পর ফরোয়ার্ডিংয়ে এসআই নাসিমও ফরহাদের বয়স ১৯ বলে উল্লেখ করেছিলেন। আবার নিহত শাহাদাত ও অপু আপন ভাই হলেও এসআই নাসিম তার প্রতিবেদনে তারা সৎ ভাই বলে উল্লেখ করেছেন।

এসআই নাসিমের এমন প্রতিবেদনে মামলার বাদী ক্ষুব্ধ হয়ে ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর আদালতে নারাজি দেন। চারদিন পর অর্থাৎ ২৮ নভেম্বর আদালত বাদীর নারাজি গ্রহণ করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) আদেশ দেন আদালত। এরপর মামলাটির দ্বিতীয় দফা তদন্ত শুরু হয়।

সিআইডি চট্টগ্রামের বিশেষ পুলিশ সুপার ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি এসআই হুমায়ুন কবির মৃধাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেন। কিছুদিন তিনি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে অবসরে গেলে মামলার তদন্তভার পান এসআই মনিরুজ্জামান। এরপর মনিরুজ্জামানও বদলি হয়ে গেলে মামলাটির তদন্তভার পান এসআই মহিউদ্দিন রতন। কিন্তু এসআই মহিউদ্দিন রতন ও বায়েজিদ বোস্তামী থানা থেকে প্রতিবেদন দাখিলকারী এসআই নাসিম ব্যাচমেট হওয়ায় বাদীর আপত্তিতে আবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়।

সবশেষ ২০২০ সালের ২৮ জুলাই মামলাটির তদন্তভার পান সিআইডির এসআই নজরুল। তদন্তের শুরুতে তিনি আসামি ফরহাদকে রিমান্ডে আনেন। আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বয়স নির্ধারণের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রেরণ করেন।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলোজি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. নুরানি সোলতানা আসামি ফরহাদকে যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে বয়স ২০ বছরের ওপর বলে মন্তব্য করেন। এরপর ২০২০ সালে ২৫ ডিসেম্বর এসআই নজরুল আসামি ফরহাদের বিরুদ্ধে দোষীপত্রের পরিবর্তে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেন। এছাড়া থানার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাসিমের প্রতিবেদনে শাহাদাত এবং অপুকে সৎ ভাই বলে উল্লেখ করা হলেও সিআইডির প্রতিবেদনে তারা আপন ভাই বলে উল্লেখ করা হয়।

jagonews24

শাহাদাত হোসেন, ২০১৯ সালের ১৮ এপ্রিল হত্যা করা হয় তাকে

এবার সিআইডির দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্রে আসামি ফরহাদের উল্লেখ করা বয়স ১৯ বছরের চেয়ে প্রকৃত বয়স কম দাবি করে তার আইনজীবী আদালতে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট আদালতে আবার শুনানি হয়।

শুনানি শেষে আসামি ফরহাদের বয়স অধিকতর তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে আদেশ দেওয়া হয়। আদালতের আদেশের পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনায় ফরহাদের বয়সের বিষয়ে আবার তদন্তভার পান এসআই নজরুল। এবার তদন্তের শুরুতে তিনি পাঁচলাইশ থানা শিক্ষা অফিসারের কাছ থেকে একটি তথ্য চেয়ে আবেদন করেন।

সিআইডির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মু. আবদুল হামিদ চিঠি দিয়ে জানান, থানার এসআই নাসিম আসামি ফরহাদের বয়স ১৭ প্রমাণ করতে নতুন কুঁড়ি বিদ্যা নিকেতন নামে যে স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার প্রবেশপত্র দাখিল করেছিলেন, সেটির সত্যতা নেই। কারণ ফরহাদ নামে ওই স্কুল থেকে কোনো শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তার নামে কোনো ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। আবার ২০১৩ সালেই থানা শিক্ষা কর্মকর্তার জায়গায় স্বাক্ষর করা মু. আবদুল হামিদ নামে। কিন্তু তিনি যোগদান করেছেন ২০১৫ সালে। এতে বোঝা যায় প্রবেশপত্রটির কোনো সত্যতা নেই। অসৎ উদ্দেশ্যে প্রবেশপত্রটি তৈরি করা হয়েছে।

উপরন্তু সিআইডি কর্মকর্তা জানতে পারেন, আসামি ফরহাদ পড়ালেখা করেছেন ইউসেফ জেনারেল স্কুলে। সেখানে থাকা রেজিস্ট্রার অনুযায়ী ফরহাদের বয়স ২০ এর ওপরে বলে জানা যায়৷ সার্বিক তদন্ত শেষে গত ৫ সেপ্টেম্বর এসআই নজরুল আসামির বয়স ১৯ বলে আবারও প্রতিবেদন দাখিল করেন। গত ১১ অক্টোবর বয়স নির্ধারণ নিয়ে থানা শিক্ষা কর্মকর্তার উপস্থিতিতে চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুনালে শুনানি ছিল। শুনানি শেষে ট্রাইবুনালের বিচারক জমিউল হায়দার আদেশ অপেক্ষমান রাখেন।

এ বিষয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামীম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই নাসিম ভাই হত্যায় ভাইকে জড়িয়ে এবং মূল আসামিকে কিশোর অপরাধী সাজিয়ে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন। সিআইডি কর্মকর্তা এসব ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে সম্পূরক অভিযোগপত্র দিয়েছেন। তবে বয়স নিয়ে আসামিপক্ষ একাধিকবার বিভিন্ন আবেদন করায় বিচার শুরু হতে বিলম্ব হচ্ছে।’

jagonews24

ছেলে হত্যার বিচারের আশায় দিন যাচ্ছে আব্দুল হালিমের

জানতে চাইলে সিআইডির এসআই নজরুল বলেন, ‘আমি সার্বিক তদন্ত শেষে দুই আসামির বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করেছি। এক আসামি ফরহাদের বয়স নিয়ে আদালত অধিকতর তদন্তের আদেশ দিয়েছিলেন। সেই আদেশের পর আমি আসামি ফরহাদের বয়স তদন্তে যা পেয়েছি, তাই উল্লেখ করেছি।’

এ নিয়ে পাঁচলাইশ থানা শিক্ষা কর্মকর্তা মু. আবদুল হামিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফরহাদের নামে নতুন কুঁড়ি বিদ্যা নিকেতন থেকে পঞ্চম শ্রেণির যে প্রবেশপত্র সৃজন করা হয়েছে, সেটির সত্যতা নেই। কারণ আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, তিনি ওই স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষাও দেননি, তার নামে কোনো ফলাফলও প্রকাশিত হয়নি। তাছাড়া আমি পাঁচলাইশ থানা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছি ২০১৫ সালে। এর আগে ২০১৩ সালে আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে ভুয়া প্রবেশপত্র তৈরি করা হয়েছে।’

মামলার বাদী আবদুল হালিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘বায়েজিদ বোস্তামী থানার এসআই নাসিম আমার মেজো ছেলে অপুর নামে অভিযোগপত্র দিয়েছেন। মূল আসামি ফরহাদকে সাজা থেকে বাঁচাতে ভুয়া প্রবেশপত্র ও জন্মনিবন্ধন তৈরি করে তাকে বানিয়েছেন কিশোর অপরাধী। যদিও সিআইডি সঠিক তদন্ত করে আমার মারা যাওয়া ছেলে এবং আসামি হওয়া ছেলেকে আপন ভাই উল্লেখ করেছে। এছাড়া দু-দফা তদন্ত শেষে আসামি ফরহাদের প্রকৃত বয়স উল্লেখ করে অভিযোগপত্র দিয়েছেন সিআইডির কর্মকর্তা। এসবের পর এখন আসামিপক্ষের আইনজীবী ফরহাদকে বারবার কিশোর দাবি করে আদালতে আবেদন করছেন। এসব আবেদনের শুনানি করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার ছেলে হত্যায় এখনও বিচারই শুরু হয়নি। এই বৃদ্ধ বয়সে এখন আমি কি মামলা চালাবো নাকি সংসার চালাবো? আসামিপক্ষের লোকজন চায় আমি যেন এভাবে ঘুরতে ঘুরতে মামলা চালানো বন্ধ করে দেই।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি জীবন সায়াহ্নে চলে এসেছি। জানি না ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো কি না। এখনও শুরুই দেখতে পারলাম না।’

অভিযোগের বিষয়ে মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা এসআই গোলাম নাসিম বলেন, ‘গ্রেফতার আসামির স্বীকারোক্তি ও তদন্তসাপেক্ষে নিহতের ভাইকে আসামি করা হয়েছে এবং আসামি ফরহাদের বিভিন্ন সনদ পর্যালোচনা করে বয়স ১৭ উল্লেখ করে কিশোর অপরাধী হিসেবে দোষীপত্র দাখিল করা হয়েছে।’

মিজানুর রহমান/এমএইচআর/এইচএ/জেআইএম