EN
  1. Home/
  2. মতামত

এমন গোল্ডেন মনির আর কতজন আছে?

বিভুরঞ্জন সরকার | প্রকাশিত: ০৯:২৯ এএম, ২৪ নভেম্বর ২০২০

মনির হোসেন ওরফে গোল্ডেন মনির নানে একজন হাজার কোটি টাকার মালিককে কয়েক ঘণ্টার অভিযান শেষে ২১ নভেম্বর গ্রেফতারে সক্ষম হয়েছে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে তিনটি মামলা হয়েছে, তাকে নেয়া হয়েছে ১৮ দিনের রিমান্ডে। এই অভিযানের আগে এই ধনবানের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা ছিল না দেশের মানুষের, এমনকি গণমাধ্যমেও তাকে নিয়ে কোনো খবর আগে পড়েছি বলে মনে পড়ছে না। গাউছিয়া মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের বিক্রয়কর্মী থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক হতে তার কত সময় লেগেছে? একদিনে বা এক বছরে এটা হয়নি। কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ বছর তো লেগেছে। গ্রেফতারের পর তার সম্পর্কে নানা খবর জানা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেই তার সম্পর্কে তথ্য দেয়া হচ্ছে।

মনির হোসেন গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কায় যখন দেশত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই তিনি ধরা পড়েন। তার আর পালানো সম্ভব হয়নি। তার বাড়ি থেকে নগদ এক কোটি টাকার বেশি অর্থ, ৬০০ ভরি স্বর্ণ, তিনটি গাড়িসহ আরও কিছু মালামাল জব্দ করা হয়েছে। বেআইনি অস্ত্র এবং বিদেশি মদও উদ্ধার হয়েছে যথারীতি। অবৈধ বিত্ত এবং ক্ষমতাবানদের বাড়িতে অস্ত্র এবং মদ পাওয়া এখন স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছে। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এটা দেখা যাচ্ছে।

বলা হচ্ছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকতেই মনিরের উত্থানপর্ব শুরু। ওই সময় প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। ওই সময়েই তিনি জালিয়াতি করে রাজউকের অসংখ্য প্লট হাতিয়ে নিয়েছেন। রাজউকের ভেতরেও তার প্রভাব না থাকলে এমনটা হওয়ার কথা নয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া যে কারও পক্ষেই আঙুল ফুলে বটগাছ হওয়া সম্ভব নয়- এটা নানা ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। মনির হোসেন নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান মানুষ। বিএনপির আমলে তার উত্থান শুরু হলেও তিনি পরবর্তী সময়েও তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি তার রাজনৈতিক আনুগত্য বদল করেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি আওয়ামী লীগের মধ্যেই নতুন পৃষ্ঠপোষক খুঁজে নিয়েছেন। তিনি নিজেকে একজন প্রতিমন্ত্রীর লোক বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। ওই প্রতিমন্ত্রীকে তিনি দেড় কোটি টাকা দামের একটি গাড়ি উপহার দিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও তথ্য আছে। আবার আওয়ামী দলীয় একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গেও তার ভালো সখ্য। ওই সংসদ সদস্যের গাড়ি মনির ব্যবহার করেন। গোল্ডেন মনিরকে যে প্রতিমন্ত্রী সহায়তা দিয়ে থাকেন তিনি কি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন? অথবা এক বা একাধিক সংসদ সদস্য যদি মনিরকে প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, তাহলে তাদেরও কি আইনের মুখোমুখি আনা উচিত নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভাগ্যের চাকা ঘোরানো দু-একজনের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে দেখা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে, তাদের বিভিন্ন অপকীর্তির কথা। কীভাবে কারা কেউ শত শত কোটি টাকা কিংবা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক হচ্ছেন তা জানা যাচ্ছে। বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচারের ঘটনাও দু-একটি ঘটনাও প্রকাশ হচ্ছে। তবে যা জানা যাচ্ছে, তারচেয়ে অজানাই যে বেশি থাকছে, তা-ও বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না।

একটা কথা অনেকেই বলে থাকেন যে, একেকটি ঘটনায় এক এক জন ধরা পড়ে, কিন্তু অধরা থেকে যায় অনেকেই। এরমধ্যে যেমন সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আছেন, তেমনি আছেন সরকারি কর্মকর্তা এবং আরও দু-একটি পেশার লোকজন। ক্যাসিনোকাণ্ডের পর যুবলীগের কয়েকজন ধরা পড়লেন। সম্রাট, জি কে শামীমসহ গ্রেফতারকৃতদের সম্পদের বিবরণ জেনে সাধারণ মানুষ বিস্মিত হলো। কিন্তু তাদের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা সহযোগিতা করেছে, রাজনৈতিকভাবে এবং প্রশাসনিক ক্ষেত্রে, যারা তাদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন, কাউকে কিন্তু ধরা হয়নি। তারা আদৌ জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবেন কিনা তা কেউ বলতে পারে না।

করোনাকালে স্বাস্থ্যখাতের অনিয়ম-দুর্নীতির কিছু ঘটনার কথা যেমন প্রকাশ হয়েছে, তেমনি কিছু ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকটি গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটছে। এরমধ্যে মোহাম্মদ সাহেদ এবং ডা. সাবরিনা ও আরিফ দম্পতির কথা বহুল আলোচিত। স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক বাদলের সম্পত্তির হিসাবও সবাইকে বিস্মিত করেছে। কিন্তু এদের পেছনের শক্তি থেকে গেল ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাহেদের মতো একজন বাটপার কীভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছতে পারলো, কারা তাকে টকশো তারকা বানিয়ে রাজনীতির আলোতে নিয়ে এলো, তাদের ব্যাপারে কেউ মুখ খুলছেন না।

সরকারের পক্ষ থেকে যারা কথা বলেন, তারা বলে থাকেন যে, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে অপরাধীকে রেহাই দেয়া হবে না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। এটা ঠিক যে, বর্তমান সরকারের আমলে দু-একটি ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের পর রাজনৈতিক পরিচয়ে রেহাই মিলছে না। তবে অন্যায়-অপরাধ যে মাত্রায় সংঘটিত হচ্ছে, ব্যবস্থা গ্রহণের মাত্রা সে তুলনায় সামান্য। ফলে সরকারদলীয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধ যে ব্যবস্থা নিচ্ছে তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে না। মানুষ মনে করছে, ক্ষেত্রবিশেষে সরকার শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করছে। এতে সমস্যার সমাধান হবে না। আর বেছে বেছে ব্যবস্থা নেয়া হলে অপরাধীরা নিজেদের নিরাপদই মনে করবে।

দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারাও জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো উচ্চাবাচ্য শোনা যায় না। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি বক্তব্য থেকে জানা গেছে, বিদেশে অর্থপাচারে সরকারি কর্মকর্তারাই এগিয়ে। দেখা যাক, এরপর কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে কিনা! দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের কাজকর্ম নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন আছে। দুর্নীতি কমাতে এই সংস্থার ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্টি আছে সব মহলেই। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে দুদকের সক্ষমতা সন্দেহাতীত নয়। দুদক কাদের ধরে, কাদের ছাড়ে, তা স্পষ্ট নয়। তাদের কাজের গতিও ঢিলেঢালা। দুদক যে কাগুজে বাঘ নয়, সেটা তারা এখনো ভুল প্রমাণ করতে পারেনি।

দুর্নীতি বা অবৈধভাবে সম্পদের মালিক হয়ে হাতেগোনা দু-চারজন ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দীর্ঘসূত্রিতা কার্যত বিচারহীনতারই নামান্তর। দ্রুতবিচারের আওতায় এনে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা জনকল্যাণে ব্যয় করার একটি উদাহরণও যদি থাকতো তাহলে হয়তো সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা আস্থা হয়তো ফিরতো। উল্টো মানুষ দেখছে, গ্রেফতারকৃতদের কেউ কেউ নানা অজুহাতে জেলখানায় না থেকে ভিআইপি সমাদরে হাসপাতালে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে মানুষ খুশি হবে না। যে রোগের জন্য যে ওষুধ প্রয়োজন তা না দিয়ে নামমাত্র মলম দিয়ে উপকার পাওয়া যাবে না।

রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বড় বড় দুর্নীতি বা অনিয়মের ধারা একদিনে গড়ে ওঠেনি, এটা দীর্ঘদিনের প্রক্রিয়া এটি। তাই হঠাৎ করে এটা দূর করাও যাবে না। তবে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে সুফল পাওয়া যাবে। আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের কারণে মানুষের মনে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে এমপিপুত্র নৌবাহিনীর একজন কর্মকর্তার গায়ে হাত না তুললে কী হতো বলা মুশকিল।

অসচ্ছল ও অসুস্থ লোক যে দলেরই হোক তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। তাই ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন না’। দলের সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্য যদি হৃদয়ে ধারণ করার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেখাতে পারেন, তাহলে তাহলে সেটা সরকার এবং দলের জন্য ভালো হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মানুষ সবই দেখছে। তারা সব বোঝে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একক চেষ্টায় দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। তার প্রতি মানুষের আস্থা-বিশ্বাস এখনো অটুট আছে। তিনি বিপদে-আপদে বুক আগলে নৌকাকে তীরে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে তার সুনাম ভেঙে চিরদিন খাওয়া যাবে না। নানা বাধা-প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে, উপেক্ষা করে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ শেষের পথে। মেট্রোরেলও ক্রমশই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সারাদেশে ব্যাপক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে বলেই এখনো দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। আরও অনেক কাজ আমরা শুরু করেছি। সেগুলোও সম্পন্ন করবো, ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্নপূরণে তার দলের নেতাকর্মীদের কেউ বাগড়া না দিলেই ভালো।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এইচআর/বিএ/পিআর