সাগর-রুনি হত্যা : অন্ধকারেই মামলার তদন্ত


প্রকাশিত: ০৩:২৮ এএম, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার তিন বছর হচ্ছে আজ। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতরা যেমন ধরাছোয়ার বাইরে রয়ে গেছে তেমনি হত্যাকেণ্ডের মোটিভও উদ্ঘাটন করতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। গত তিন বছরে মামলার তদন্তেও আসেনি অগ্রগতি। তদন্তের ভার কয়েক দফায় হাত বদল অনেককে ধরপাকড়, জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও কোনো আশার বাণী শোনাতে পারেননি মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

প্রথমে থানা পুলিশ, এরপর ডিবি পুলিশের হাত ঘুরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে এখন মামলার তদন্ত করছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। তদন্ত সূত্র জানায়, উচ্চ আদালতের নির্দেশে প্রতি মাসেই একবার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কর্মকর্তা। এ পর্যন্ত আদালতে ৩২টি অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে।

সর্বশেষ প্রতিবেদন দেয়া হয় গত ২ ফেব্রুয়ারি। আগামী ১ এপ্রিল পরবর্তী অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তাতে রহস্য উদ্ঘাটনে সর্বোচ্চ চেষ্টার কথা বারংবার উল্লেখিত হছে। তবে বিচারের আশা ছেড়ে দেননি পরিবারের সদস্যরা। ন্যায় বিচারের জন্য দিবারাত্রিতে আশার স্বপ্ন দেখেন এখনো। তাদের বিশ্বাস, সত্য কখনো ঢাকা থাকে না। একদিন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হবেই হবে। খুনিরা ধরা পড়বে।

২০১২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। দুর্বৃত্তরা রাতের কোনো এক সময়ে এই দম্পতিকে ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ওই দিনই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতারের ঘোষণা দেন। এর দু’দিনের মাথায় ১৩ই ফেব্রুয়ারি পুলিশ সদর দফতরে সাংবাদিক সম্মেলনে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার।

কিন্তু একে একে হত্যাকাণ্ডের তিন বছর পূর্ণ হলেও সেই ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’র কথা জানতে পারেনি কেউ। খুনের মোটিভ জানা যায়নি। ধরা পড়া তো দূরের কথা, খুনিদের চিহ্নিতও করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যানুযায়ী, মামলাটির তদন্ত শুরু করে প্রথমে শেরেবাংলানগর থানা পুলিশ। এরপর ডিবি কাছে। ডিবি পুলিশের তদন্তে ব্যর্থতা প্রতীয়মান হলে উচ্চ আদালতের নির্দেশে র‍্যাব তদন্তের ভার গ্রহণ করে। র‍্যাব ইনভেস্টিগেশন সেলের এএসপি ওয়ারেছ বতর্মানে মামলাটির তদন্ত করছেন।

র‍্যাব সূত্র জানায়, ২০১২ সালের ২৬শে এপ্রিল হত্যাকাণ্ডের ৭৫ দিন পর কবর থেকে মরদেহ তুলে ভিসেরা পরীক্ষা করা হয়। তবে ভিসেরা রিপোর্টেও সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যার আগে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেননি র‍্যাব তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র আরও জানায়, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি ও হাত-পা বাঁধার রশিসহ বিভিন্ন আলামত পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফরেনসিক গবেষণাগারে। এসব আলামত থেকে পৃথক দুটি পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়ার কথাও ঘোষণা দেয় র‍্যাব। পরবর্তীতে এসব নমুনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য সন্দেহভাজন আরও ২১ জনের ডিএনএ নমুনাও পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু কারও সঙ্গে সেই ডিএনএ নমুনা মেলেনি।

র‍্যাবের লিগ্যাল এন্ড মিডিয়া উয়িং-এর পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সাংবাদিক দম্পতির হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত ভার গ্রহণের পর থেকেই র্যাব সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে। ডিএনএ প্রতিবেদন, বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা বিষয় নিয়ে র‍্যাব কাজ করে যাচ্ছে।

সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই গ্রিলকাটা চোরসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে তদন্ত করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। ঘটনার পর ডিবি পুলিশ বাসার দুই দারোয়ান রুদ্র পলাশ ও এনামুলকে আটক করে। পরে র‍্যাব কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি।

সূত্র জানায়, মামলার একপর্যায়ে তদন্ত কর্মকর্তা সাগর-রুনি হত্যা মামলায় মহাখালীর ডা. নিতাই হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেফতার দেখানো হয়। আসামিরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, সাঈদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ। তাদেরও কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেও কোনো তথ্য পায়নি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তাদের কেউ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেননি। এ ঘটনায় বর্তমানে দুই দারোয়ানসহ সাতজন কারাবন্দি রয়েছেন।

সাংবাদিক দম্পতি হত্যা মামলার বাদী ও নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন হবে না তা নিয়েও আশাহত তিনি। তিনি বলেন, অপেক্ষায় আছি, একদিন এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য ঠিকই উন্মোচন হবে।

নওশের বলেন, সাগর-রুনি দম্পতির একমাত্র সন্তান মেঘ যতই বড় হচ্ছে ততই বাবা-মাকে হারানোর কষ্ট অনুভব করতে পারছে। মেঘ মাঝে-মধ্যেই মা-বাবার কথা মনে করে কান্না করে। রুনির মা নুরুন্নাহার বেগম তার জীবদ্দশায় মেয়ে-জামাই হত্যার বিচার দেখে যেতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

জেইউ/বিএ/আরআইপি