গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১১ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

গণমাধ্যমের প্রচার, প্রকাশনায় বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকারের চাওয়া পূরণ হবে না বরং প্রচার-প্রকাশ করতে দিলে স্টাবলিশার বা সরকার যা চায় তা পূরণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ সহিংসতা দমনে রেসপনসিবল জার্নালিজম যেমন দরকার তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শব্দ চয়নে আরও বেশি সতর্কতা জরুরি। আবার রেসপনসিবল জার্নালিজমের কথা বলা হলেও গুড ডেমোক্রেসির কথা অনেকেই বলেন না। গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না।

শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত ‘উগ্রবাদ রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় দেশের বেসরকারি টেলিভিশনের দায়িত্বরত সিনিয়র সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা এই দাবি করেন। এ সেমিনারের আয়োজন করে সেন্টার ফর সোস্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিসার্ফ)।

বাংলাদেশ পুলিশের সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়নে আয়োজিত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম। সেমিনারের উপস্থাপনা করেন সিসার্ফের প্রধান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শবনম আজিম।

সেমিনারে একাত্তর টিভির কর্ণধার মোজাম্মেল বাবু বলেন, বাংলাদেশে ২০টির বেশি টেলিভিশনের দরকার নেই। কিন্তু সরকার লাইসেন্স দিয়েছে ৪০টি। এতে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এভাবে আমাদের শক্তি কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। মূলধারার মিডিয়ায় ছাঁটাই চলছে। আবার সরকারের কাজ মিডিয়ার টুটি চেপে ধরা নয়, কিন্তু সত্য প্রচারেও টুটি চেপে ধরা হয়। একটি নিউজ অন এয়ার করা হলে স্টাবলিশার (সরকার) থেকে বলা হচ্ছে থামান। লাইনে লাইনে সংশোধন করতে হচ্ছে। স্টাবলিশারের আমাদের ওপর আস্থা নেই। কিন্তু গণমাধ্যম কিছু না দেখালে আরও গুজব ছড়াবে।

এ ব্যাপারে তিনি হেফাজতের মতিঝিলে তাণ্ডব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আমাদের প্রথমে লাইভ বন্ধ করতে বলা হলো, আমরা মিনিটে মিনিটে দেখালাম। পরে যারা বন্ধ করতে বলেছিল তারাই আবার ফুটেজ চেয়েছিল। গুজব বন্ধ করতে হলেও সত্যটাই প্রকাশ করতে হয়।

তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় কেউ কি বলতে পারবো কোথায়ও ত্রুটি বিচ্যুতি হয়নি। একটা ঘটনা ঘটলেই হলো। আমাদের নিউজ বন্ধ করতে বলা হচ্ছে। কেন্দ্রে বিএনপি বা সরকারি দলের প্রতিপক্ষের এজেন্ট নেই এটা লাইভ দেখাতে নিষেধ করা হলো, দেখানো যাবে না। কিন্তু আমরা যদি ওই এজেন্টকে খুঁজে বের করে দেখাই যে সে বাসা থেকে বের হয়নি, কেন্দ্রে আসবে কিভাবে? এতে কি স্টাবলিশার (সরকার) লাভবান হতো না? আজ আইপিটিভি নিয়ন্ত্রণে নেই। অথচ আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে। এসব মিডিয়ায় গুজব বাড়বে। শরীয়ত বয়াতিকে গ্রেফতারের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ উস্কে দেয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

জিটিভি ও সারাবাংলা ডটনেটের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা বলেন, কোথাও জঙ্গি আটক বা গ্রেফতার হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে জিহাদী বইসহ যোদ্ধা আটক হয়েছে। কিন্তু এই ধরনের শব্দচয়নে জঙ্গিবাদকে এক ধরনের উদ্বুদ্ধ করা হয়। কারণ জিহাদী ও যোদ্ধা শব্দগুলো পজিটিভ শব্দ।

তিনি বলেন, সবাই রেসপনসিবল জার্নালিজম করতে বলেন কিন্তু গুড ডেমোক্রেসির কথা বলে না। গুড ডেমোক্রেসি না হলে গুড জার্নালিজম হবে না।

সিনিয়র সাংবাদিক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়াগুলো এখন আর ধর্ষিতার ছবি প্রচার করে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিচয় ছাপা হয় না। এক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

মাছরাঙ্গা টিভির হেড অব নিউজ রেজওয়ানুল হক রাজা বলেন, হলি আর্টিসানের সময় নিবরাজদের ৫ জনের হাসির ছবি অনেক মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে। সেটা ছাপা ঠিক হয়নি। একজন ওয়াজে দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর সুনাম ও নারী নেতৃত্ব বিরোধী কথা বলে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেলেন। কিন্তু শরীয়ত বয়াতিকে গ্রেফতার করা হলেও ওই বক্তার কিছুই হলো না। এটা নিয়ে আপনাদের কাজ করতে হবে।

এটিএন বাংলার হেড অব নিউজ জ. ই মামুন বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে বড় ভুমিকা পালন করতে পারে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। পুলিশকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ২০১৫ সালের প্যারিস হামলার পর এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে পুলিশ কাউকে এমন কী এমপি-মন্ত্রী-রাষ্ট্রপতিকেও ঢুকতে দেয়া হয়নি। আমাদেরও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। যদিও হলি আর্টিসান হামলার পর এসব ক্ষেত্রে বেশি কিছু পরিবর্তন এসেছে।

এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম বলেন, মিডিয়া নিজেদের পক্ষ থেকে বেশি কিছু করার থাকে না। কারণ আমরা নানা সংকটে থাকি। সিটিটিসি যদি মিডিয়ার জন্য গাইডলাইন তৈরি করে তাহলে ভালো হতো। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে একটি সহিংস ঘটনার কথা মনে আছে যেটা মূল ধারার মিডিয়ায় না আসলেও সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

ডিবিসি নিউজের সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গিবাদ প্রচারে জঙ্গিদের গবেষণা রাষ্ট্রীয় গবেষণার চেয়ে অগ্রসরমান। বিভিন্ন মাদরাসা, মসজিদ, স্কুলের এখনও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও জঙ্গি রিক্রুট হচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন ধর্মপ্রচার বন্ধ না হয়। গণমাধ্যমের চেয়েও বড় প্রতিদ্বন্দ্বী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের স্থায়ী বোঝাপড়া থাকলে ভালো ভূমিকার পালন করতে পারে গণমাধ্যম।

একুশে টিভির মোস্তফা মহসিন আব্বাস বলেন, আমরা টেররিজমে জড়িতদের যেন হিরো পর্যায়ে নিয়ে না যাই।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ও ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেছেন, গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য অনেক ঝুঁকির দিকে আছে। কিন্তু বাংলাদেশ অবস্থা উন্নতির দিকে। ২০১৭ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্সে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ঝুঁকির তালিকায় ১৯ নম্বরে ছিল, ২০১৮ সালে কমে ২৫ নম্বরে আসে এবং ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ৩১ ধাপে উন্নীত হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান এই ঝুঁকির তালিকায় ১০ এর ভেতরে রয়েছে। পশ্চিমা অনেক দেশের চেয়ে আমাদের ঝুঁকি কম।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সহিংস উগ্রবাদ দমনে সুর্নির্দিষ্ট জাতীয় কোন স্ট্রাটেজি নাই। এটা করতে সময় লাগে। তবে আমরা কাউন্টার ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম (সিভিই) করতে যাচ্ছি। দুইভাবে আমরা কাজটা করছি, প্রথমত জেনারেল অ্যাপ্রোচ এবং দ্বিতীয়ত ভালনারেবল অ্যাপ্রোচ। সেজন্য আমরা বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে কথা বলছি। ১৫-৩০ বছরের ছেলেরা সবচেয়ে বেশি উগ্রবাদে জড়াচ্ছে। এসব ভালনারেবল গ্রুপকে মোটিভেট করতে তরুণ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করছি। একই সঙ্গে আলেম-ওলামাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত আলোচনা করছি।

এক প্রশ্নের উত্তরে মনিরুল ইসলাম বলেন, সরকারের উদ্যোগে আমরা দেশিয় অবস্থার প্রেক্ষাপটে উগ্রবাদ প্রতিরোধে কাজ করছি। কিন্তু ‘সম্প্রীতি বাংলাদেশ’ সংস্থার মতো বিদেশী বিজ্ঞাপনের আদলে প্রচারণা চালিয়ে তারা যে ভুল করছে আমরা সেটা করছি না। একাডেমিক রিসার্স হচ্ছে। যে কাজ করি ট্রাস্ট এবং কনফিডেন্সের সঙ্গে।

জেইউ/জেএইচ/এমকেএইচ