পত্রিকার পাতায় পাতায় রক্তাক্ত ২১ আগস্ট

সিরাজুজ্জামান
সিরাজুজ্জামান সিরাজুজ্জামান , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৩৮ এএম, ২১ আগস্ট ২০২০

স্বাধীন বাংলার ইতিহাসে নৃশংস সন্ত্রাসী হামলাগুলোর মধ্যে অন্যতম ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার খবরগুলো পত্রিকায় যেভাবে প্রকাশ হয়েছিল তা দেখে রক্ত হিম হয়ে যায়। সেই সময়ের মূলধারার পত্রিকাসহ সবগুলোতেই হতাহতের রক্তাক্ত ছবি কলের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। প্রায় সবগুলো পত্রিকা ব্যানার শিরোনাম করেছিল। কোনো কোনো পত্রিকায় আবার লাল রঙের শিরোনাম ছিল। আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী, পথচারী, আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য ছাড়াও দায়িত্বরত পাঁচ সাংবাদিকও আহত হন সেই হামলায়।

তবে মৃত্যুর সংখ্যা একেক পত্রিকায় একেক ছাপা হয়। হাসপাতালে একের পর এক আহত ব্যক্তি মারা যাওয়ায় এমনটি হয়েছে।

২০০৪ সালের ওই হামলার পরদিন দৈনিক প্রথম আলো লাল অক্ষরে ব্যানার শিরোনাম করে ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, গ্রেনেড হামলায় নিহত ১৬।’এছাড়া সাব হেডিং থাকে ‘বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে রক্তের স্রোত আমু, সুরঞ্জিত, সেলিমসহ আহত ৪০০’ ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার সব চেষ্টাই করেছিল হামলাকারীরা’ ‘আতঙ্কের নগরী ঢাকা’ ‘মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন আইভি রহমান’ ‘আহতদের আর্তনাদে ভারি হাসপাতালের বাতাস’

শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা, গ্রেনেড হামলায় নিহত ১৬’শিরোনামে লেখা হয়- ‘অল্পের জন্য বেঁচে গেলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে বক্তৃতা শেষে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাক থেকে নামার মুহূর্তে তাকে লক্ষ্য করে একের পর এক গ্রেনেড নিক্ষিপ্ত হতে থাকলে উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানববর্ম হয়ে তাকে রক্ষা করেন। দলের নেতাকর্মী ও দেহরক্ষীরা শেখ হাসিনাকে সেখান থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যান। আর উপর্যুপরি বিস্ফোরণে মঞ্চ ও সমাবেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কমপক্ষে ১৬ জন নিহত এবং চার শতাধিক আহত হয়েছেন। এদের অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতদের মধ্যে দুজন নারী ও ১৪ জন পুরুষ রয়েছেন! মারা গেছেন মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী সুফিয়া বেগম, ১৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হাসিনা মমতাজ রীনা, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মাহবুব, দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।’

Paper-2

‘দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই আহত হয়েছেন। দলের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কাজী জাফরউল্লাহ, মোহাম্মদ নাসিম, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাহারা খাতুন, শেখ হাসিনার গানম্যান সেলিম, নজরুল ইসলাম বাবুও গুরুতর আহত হয়েছেন।’

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল ৫টা ২২ মিনিট থেকে এক-দেড় মিনিটের ব্যবধানে ১৩টি বিস্ফোরণ ঘটে। সভার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত ট্রাকের ওপর, এর পাশে, সমাবেশস্থলে এসব বিস্ফোরণ ঘটে। পরে সাংবাদিকরা সেখানে অবিস্ফোরিত অবস্থায় দুটি গ্রেনেড দেখতে পান। রাতে ঘটনাস্থলের অদূরে রেলওয়ে মার্কেটের পূর্ব পাশে আরও একটি গ্রেনেড উদ্ধার হয়। বিস্ফোরণের পর পরই ধোঁয়ার কুণ্ডলী, মানুষের চিৎকার, ছুটোছুটিতে একটি প্রাণবন্ত সমাবেশের চেহারা পাল্টে যায়।...’ পত্রিকাটি এ নিয়ে অপর পাতায় আরও বিস্তারিত লিখে।

দৈনিক ইনকিলাব লাল অক্ষরে ব্যানার শিরোনাম করে, ‘আ'লীগ সমাবেশে গ্রেনেড হামলা’’ সাব হেড দেয়া হয়, ‘নিহত ১৮ আহত কয়েক শ।’ এছাড়াও পত্রিকাটির প্রথম পাতায় আরও স্থান পায়, ‘বোমা হামলার প্রতিবাদে ২৪ ও ২৫ আগস্ট সারা দেশে হরতাল’ ‘সারাদেশে বিক্ষোভ উত্তেজনা ভাঙচুর’‘খুনির তালিকায় প্রধানমন্ত্রী এক নম্বরে : শেখ হাসিনা’শিরোনামসহ এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রথম পাতায় স্থান পায়।

ইনকিলাবের প্রধান শিরোনামের নিউজে লেখা হয়, ‘গতকাল (শনিবার) ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে বোমা ও গ্রেনেডের ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১৮ জন নিহত হয়েছে। দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ আহত হয়েছেন কয়েক’শ। গুরুতর আহত মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী আইভি রহমানের দু’টি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। তাকে রাতে সিএমএইচ এ স্থানান্তর করা হয়েছে।’

‘বিক্ষোভ পূর্ব সমাবেশে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিকট শব্দে একের পর এক গ্রেনেড ও বোমবার বিস্ফোরণ ঘটে। শেখ হাসিনা ট্রাকে স্থাপিত মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরণগুলো ঘটে ট্রাকের চারপাশে। শেখ হাসিনা অক্ষত থাকলেও এই নারকীয় ঘটনায় একে একে লুটিয়ে পড়েন মঞ্চের পাশে অবস্থানকারী পুরুষ ও মহিলা নেতাকর্মীরা।

Paper-2

নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দেহরক্ষী মাহবুবও রয়েছেন। কম-বেশী আহত আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন-জিল্লুর রহমান, আমির হোসেন আমু, আব্দুর রাজ্জাক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মোহাম্মদ হানিফ, অধ্যাপক আবু সাঈদ, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আখতারুজ্জামান, শেখ ফজলুল করীম সেলিম প্রমুখ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনশ আহত নেতাকর্মীকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।…’

ভোরের কাগজ শিরোনাম করে- ‘হাসিনার জনসভায় বোমা, নিহত ১৮, নারকীয় হত্যাযজ্ঞে স্তম্ভিত দেশবাসী।’ এছাড়াও ‘শুধু রক্ত কান্না আর আহাজারি’‘নগরজুড়ে আতঙ্ক, যানবাহনে আগুন’ সহ আরও অনেকগুলো শিরোনাম দেখা যায়। এছাড়াও বিশিষ্ট সাংবাদিক আবেদ খান ভোরের কাগজে মন্তব্য প্রতিবেদন লিখেন- ‘এ তো সুস্থ আর সভ্য মানুষের দেশ নেই।’

ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার কালো অক্ষরে শিরোনাম করে ‘এসেসিনেশন এটেম্পট অন হাসিনা’। সব হেডে লেখা হয়. গ্রেনেড অন এএল র‌্যালি, সিক্সটিন কিলড, টপ এএল লিডারস এমং টু হান্ড্রেড হার্ট।’ এছাড়াও ‘লিস্ট অফ দা ভিকটিম’ ‘প্রেসিডেন্ট পিএম স্পিকারস সকড’ শিরোনাম ছাড়াও আরও অনেকগুলো শিরোনাম দিয়ে অন্যান্য পত্রিকার মতই খবর ছাপা হয় ইংরেজি দৈনিকটিতে। সেখানে দায়িত্বরত পাঁচজন সাংবাদিকও আহত হয়েছিল বলে ডেইলি স্টারে লেখা হয়।

এইচএস/এএইচ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]