রাজধানীর ২৫ স্থানে ছিনতাইকারীরা বেপরোয়া


প্রকাশিত: ০৭:৩৪ এএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৬
প্রতীকী ছবি

রাজধানীর ২০টি থানা এলাকার কমপক্ষে ২৫ স্থানে সক্রিয় রয়েছে ১৫টি ছিনতাইকারী চক্র। চক্রগুলো সম্প্রতি ছিনতাই কাজে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারও শুরু করেছে। তিন ধরণের ছিনতাইয়ে জড়িত চক্রটি। টার্গেট করে ব্যাগ ও মোটরসাইকেল ছিনতাই এবং ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারী ব্যক্তির পিছু নিয়ে নগদ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। সম্প্রতি খোদ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধেও উঠেছে ছিনতাইয়ের অভিযোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই থানাসংলগ্ন এলাকার নির্জন ও অন্ধকার স্থানগুলো ছিনতাই পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মোটরসাইকেলযোগে সুযোগমতো রিক্সাযাত্রীদের ব্যাগ টান দেয়া এবং গুলি চালিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ছিনতাই স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ দিনে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৮৭টি জিডি হয়েছে রাজধানীর ৪৯টি থানায়,যার বেশিরভাগই থানার আশেপাশের রাস্তায় মোবাইল ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের অভিযোগ।ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছিনতাইকারীদের ধরতে পারছে না পুলিশ। থানায় অভিযোগ করেও খোয়া যাওয়া জিনিস ফেরত পাওয়া যায় না।

গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাড্ডা, বনানী, খিলক্ষেত, ভাষানটেক, মিরপুর, পল্লবী, কাফরুল, দারুস সালাম, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ি, কদমতলী, গুলিস্তান, রামপুরা, হাজারিবাগসহ ২০টি থানা এলাকায় ২৫টি পয়েন্টে ছিনতাই হচ্ছে। মোটরসাইকেলে, মাইক্রোবাসে ও অতর্কিতভাবে হামলা চালিয়ে নগদ টাকা ছিনতাই করছে ১৫টি চক্র।

ভূক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর আইডিবি ভবনের সামনের রাস্তায় প্রতিনিয়ত মোটরসাইকেলে করে ব্যাগ টান দেয়ার ঘটনা ঘটে। রোকেয়া সরণি, কাফরুল থানা থেকে সেনানিবাসের দিকের রাস্তা, মিরপুর থানার উল্টোদিকের রাস্তা, মিরপুর স্টেডিয়ামের পাশের রাস্তা, মোহম্মদপুর থানার পেছনের রাস্তা, পল্টন থানার উল্টোদিকের রাস্তা, ফার্মগেট, তেজগাঁও থানার উল্টোপাশের রাস্তা, কাওরানবাজার থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতে দ্বিতীয় ওভারব্রিজ থেকে তৃতীয় ওভারব্রিজ, আগারগাঁও আবহাওয়া অফিস থেকে তালতলার রাস্তায় নিয়মিত ছিনতাই  হচ্ছে।

থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ এপ্রিল ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কের ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে নিখোঁজ হন দৃক পিকচার লাইব্রেরির প্রশাসনিক ও হিসাব কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম। পরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুঁড়ি এলাকা থেকে ইরফানুলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কলাবাগান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফ উদ্দিন জানান, আমাদের ধারণা  ব্যাংকের সামনে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের কোনো দল ইরফানকে জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।

চলতি বছরের ৪ মে যাত্রাবাড়ীর মিরহাজীরবাগ এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলযোগে ৪ থেকে ৫জন ছিনতাইকারী জামাল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জামালের (৪৫) পায়ে গুলি করে চার লাখ ২০ হাজার টাকা ছিনতাই করে। তিনি স্থানীয় ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাচ্ছিলেন। অপরদিকে গত ৯ মে দুপুরে যাত্রাবাড়ীর শহীদ ওমর ফারুক সড়কে আবুল হোসেনের (৩৫) ডান পায়ে গুলি করে ১০ লাখ ৬০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারিরা। তিনি স্থানীয় একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী।

১০ মে দুপুরে নিউমার্কেট থানা এলাকার এ্যালিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকার সামনে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে আড়াই লাখ টাকা তুলে নীলক্ষেত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছিলেন দুই ব্যবসায়ী। গাউসিয়া মার্কেটের সামনে সাদা মাইক্রোবাসে ৭ থেকে ৮ যুবক ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাদের তুলে নেয়ার চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তি একপর্যায়ে একজনকে মারধর করে এবং টাকাসহ আরেকজনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। তাদের হাতে ওয়াকিটকি ও মাইক্রোবাসে ডিবি লেখা থাকায় লোকজন তো দূরের কথা টহল পুলিশও এগিয়ে আসেনি।

গত ৮ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টার দিকে বনশ্রীর সি ব্লকে অবস্থিত একটি ব্যাংক থেকে ফ্যাশন আইল্যান্ড নামে একটি গার্মেন্টের ২০ লাখ টাকা তুলে রিকশাযোগে অফিসে ফিরছিলেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা সাইফুল ও তার এক সহকর্মী। ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে যেতেই দুটি মোটরসাইকেলে ৪ জন সন্ত্রাসী সাইফুলের পায়ে গুলি করে তার হাতে থাকা ব্যাগটি নিয়ে পালিয়ে যায়।

গত ৩ অক্টোবর রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় এক তরুণীর ব্যাগ ছিনিয়ে পালানোর সময় ছিনতাইকারী চক্রের দুই সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেটকারও জব্দ করা হয়। গাড়ির ভেতর থেকে রিকশায় থাকা ওই তরুণীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিল তারা।

গত ১৮ নভেম্বর ভোরে রাজধানীর লালবাগের কেল্লা মোড় এলাকায় ডিমের চালান সরবরাহ করে ফিরছিলেন ডিম ব্যবসায়ী আবদুল বাছির। কারওয়ান বাজারের মোড়ে ৪৪ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেন ঢাকা মহানগর ট্রাফিক (উত্তর) পুলিশের কনস্টেবল লতিফুজ্জামান। ডিম বিক্রেতা তাকে জাপটে ধরে চিৎকার করেন। পরে লতিফকে আটক করে নিয়ে যায় শাহবাগ থানা পুলিশ। ওই কনস্টেবলকে সাসপেণ্ড করা হয়।

গত ১০ ডিসেম্বর বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে আমিনুল ইসলাম নামে একজনের গতিরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। তার চিৎকারে মতিঝিল থানার টহল পুলিশ তাৎক্ষনিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছিনতাইকারীকে হাতেনাতে আটক করে। এ সময় তার কাছ থেকে ১টি চাকু এবং ছিনতাই করা ১টি হাত ব্যাগ ও এক হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়।

একই দিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে র‌্যাব-২ ছিনতাই চক্র ও মলম পার্টির ১৩ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মোবাইলফোন, ট্যাব, ছিনতাইকৃত টাকা ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগজিন, ৬ রাউন্ড গুলি ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

জাকিরুল ইসলাম নামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলেন, ছিনতাইয়ের পর থানায় গিয়েও সহায়তা মেলে না। হারিয়ে গেছে, খোয়া গেছে সাধারণ জিডি করে চলে আসতে হয়। ওই জিডির আর কখনও আপডেট মেলে না। অফিসিয়াল কাগজ, টাকা বা ল্যাপটপ খোয়া গেলে জিডি করে ফেরত পাওয়ার খবর কখনও পাইনি।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, ডিএমপির গত মাসের অপরাধবিষয়ক মাসিক সভায় ছিনতাইকারীদের ধরতে জোর নির্দেশনা দিয়েছেন কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। র‌্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন, অনেক ছিনতাইকারী একাধিকবার ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে আবারও ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে।

জেইউ/ওআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :