গুলিস্তানে মাদরাসাছাত্র হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১১ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ০৫:২৯ পিএম, ২২ নভেম্বর ২০১৭
গুলিস্তানে মাদরাসাছাত্র হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেফতার

রাজধানীর গুলিস্তানে মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ‘চাঞ্চল্যকর শিশু জিদান হত্যার’ মূল হত্যাকারী আবু বক্করকে সদর ঘাট এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। র‌্যাবের লিগ্যাল ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান এক বার্তায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি আরও জানান, বুধবার বিকেল ৪টায় কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বিস্তারিত জানানো হবে।

জিদান (১১) হত্যাকাণ্ডের পর ওই মাদরাসার অন্য শিক্ষার্থী ও পুলিশের কাছ থেকে বারবার ঘুরেফিরে আসে ১৬ বছর বয়সী আবু বক্করের নাম। সে মাদরাসাটির ‘জ্যেষ্ঠ’ শিক্ষার্থী।

হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের প্রথম সন্দেহ আবু বক্করেই। পুলিশ জানায় মুখ বেঁধে হত্যার পর জিদানের মরদেহ কোলে করে ম্যানহোলে ফেলে মাদরাসার গেটের পাশের বেড়া ছিঁড়ে পালিয়ে যায় আবু বক্কর।

মাদরাসার হেফজের কয়েকজন শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে জানায়, (অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না), আবু বক্কর এক বছর আগে হাফেজ হয়েছে। শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ পাড়া কোরআন পড়ে শোনানোর পর মাদরাসা ছাড়ার কথা ছিল তার। ১৬ বছর বয়সী আবু বক্কর মাদরাসার সবচেয়ে ‘সিনিয়র’ শিক্ষার্থী। সে কারণে অন্য শিক্ষার্থীদের নেতা ছিল সে। সবাইকে তার কথা শুনতে বাধ্য করতো সে।

এই শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে, কোরবানি ঈদের ছুটি শেষে মাদরাসায় ফেরার পর আবু বক্করের সঙ্গে নানা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বাগবিতণ্ডা হতো নিহত জিদানের। একবার এই ঝগড়া হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। পরে শিক্ষকরা তাদের বিষয়টি সুরাহা করেন। দু’জনকে একসঙ্গে মিলে থাকার নির্দেশ দেন।

তবে শুধু জিদানের সঙ্গেই নয়, গত সপ্তাহে আরও কয়েক শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল আবু বক্করের। ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের কাছে মাফও চান আবু বক্কর।

মাদরাসা থেকে চলে যাওয়ার কথা বলে কাউকে কিছু মনে না রাখার ‘অনুরোধ’ জানিয়ে সবার কাছে ক্ষমাও চেয়ে নেয় আবু বক্কর।

নিহত কিশোর জিদান মাদরাসায় যে ঘরে ঘুমাতো সেই একই ঘরে আরও ৪০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে ঘুমাতো আবু বক্করও।

এই শিক্ষার্থীদের মারফত জানা যায়, মাদরাসায় ১০টার মধ্যে ঘুমানোর কথা থাকলেও শিক্ষার্থীরা গল্পগুজব করে রাতে ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে ঘুমাতো। রোববার রাত ১১টার দিকে আবু বক্কর গল্পগুজবের জন্য সবাইকে বকা দেয়। কথা কম বলে দ্রুত ঘুমিয়ে যেতে বলে। পাশাপাশি মো. শফিকুল ইসলাম নামে এক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে একটি হাতঘড়ি চেয়ে নেয় সে।

রাত দেড়টার দিকে ঘর থেকে মেলামাইনের প্লেটের শব্দ পেয়েছে বলেও জানিয়েছে এই শিক্ষার্থীরাা।

সরেজমিন মাদরাসায় গিয়ে দেখা যায়, শোয়ার ঘর থেকে টয়লেট পর্যন্ত রক্তের দাগ। জিদানের বালিশ, মশারি ও কাথায় ছোপ ছোপ রক্ত জমে থাকার দাগ।

দেখে মনে হয়েছে, হত্যার পর প্রথমে টেনে-হিঁচড়ে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু টয়লেটে যেতে হলে অন্য শিক্ষার্থীদের ঘুমানোর রুম টপকে যেতে হয়। তাই পড়ে জিদানকে কোলে করে টয়লেটে নিয়ে ম্যানহলে ফেলে দেয়া হয়।

পরে মাদরাসার বারান্দায় নিজের ঘড়িটি রক্তমাখা অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে শফিউল। তার দাবি, ভয়ে সেটিকে পাশের গুলিস্তান পার্কে ফেলে দেয় সে।

আবু বক্করের বাড়ি বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থানার কালিকাফুর গ্রামে বলে জানিয়েছে তার চাচাতো ভাই মো. ঈসমাইল।

এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর মাদরাসার ৪ শিক্ষার্থীকে পল্টন থানায় নিয়ে গেছে পুলিশ। তারা হলো- হেফজের শিক্ষার্থী মো. রাফিউল, মো. হাবিবুল্লাহ, মো. রিয়াজ এবং হাফেজ পাশ ওমর ফারুক। এ ছাড়াও কয়েকজন শিক্ষককে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।

এ বিষয়ে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ. মাহমুদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, এ ঘটনার মূল হোতা আবু বক্কর নামেই আমরা জেনেছি। সে বর্তমানে পলাতক রয়েছে। তাকে খুঁজতে অভিযান চলছে।

হত্যাকাণ্ডের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ সংক্রান্ত কারণে এই হত্যাকাণ্ড। সম্প্রতি জিদান ও আবু বক্করের সঙ্গে একটি ঘটনা নিয়ে বক্করকে শাসন করেছিলেন শিক্ষকরা। এ থেকেই হয়তো সে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।

উল্লেখ্য, নিহত জিদান ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের হাফিজ উদ্দিনের ছেলে।

এআর/এসএইচএস/আইআই