‘পুলিশ আমাগো কিছুই করতে পারব না’

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:২৭ এএম, ২৬ নভেম্বর ২০১৭
ফাইল ছবি

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (বিপিএসসি) অধীনে চার সহস্রাধিক নার্স নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি নার্স নেতারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের দুই নার্স সাইফুল ইসলাম ও আরিফুল ইসলাম প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত রয়েছে এমন কয়েকজন নেতার নাম প্রকাশ করেন। তাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে শাহবাগ থানায় সুনির্দিষ্টভাবে নয়জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।

অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও প্রতিরোধ টিম, গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের (উত্তর) সাব ইন্সপেক্টর মো. তাজুল ইসলাম বাদি হয়ে শাহবাগ থানায় গত ১৬ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) এ মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারকৃত দুজন ছাড়া যাদের আসামি করা হয় তারা হলেন- কামাল পাটোয়ারী, মো. ইকবাল হোসেন সবুজ, আনিস, জুয়েল, রফিকুল, ফারুক ও নার্গিস মুন্নী। তারা সবাই নার্স নেতা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৬ নভেম্বর মামলা দায়ের হলেও রহস্যজনক কারণে এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের কোনো তৎপরতা নেই। আসামিদের অধিকাংশই হাসপাতালেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শুধু তাই নয়, তাদের কেউ কেউ সাবেক ও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী, বিএমএ ও স্বাচিপের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে হট কানেকশনের কথা গর্ব করে সহকর্মীদের কাছে বলছেন, ‘পত্রপত্রিকায় লিখে লাভ নাই, পুলিশ আমাগো কিছুই করতে পারব না।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের আমলে রাজধানীসহ সারাদেশে নার্সদের বদলি, পদায়ন, পদোন্নতিসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে সকলেই স্বাধীনতা ও স্বপক্ষের তথা আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক দাবি করলেও বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে তাদের বিএনপির ব্যানারে মিছিল মিটিং ও নার্সেস নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নার্স নেতা জানান, বিগত সরকারের আমলে নুন আনতে পান্তা ফুরাত টাইপের নার্স নেতারা এখন নামে-বেনামে বিপুল অর্থবিত্ত, ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিক বনে গেছেন। আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা না শোনা গেলেও এবার তাদের বিরুদ্ধে প্রশ্নপত্র ফাঁস করার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা আয়ের অভিযোগ উঠেছে। কান টানলে মাথা আসে- এ প্রবাদের মতো তাদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে। তাছাড়া অতীত ও বর্তমান সম্পদের হিসাব নিলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে ওই নার্স নেতা মন্তব্য করেন।

তবে মামলার এজাহারভুক্ত একাধিক আসামি নার্স নেতা জাগো নিউজের এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, তারা সম্পূর্ণ নির্দোষ। নেতাগিরি করেন বলে শত্রুতাবশত তাদের নাম জড়িয়ে মামলা করা হয়েছে। তবে নেতাগিরি করার ফলে তাদের কিছু কিছু বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সুপারিশ করতে হয় বলে স্বীকার করলেও বিনিময়ে অর্থ উপার্জনের কথা অস্বীকার করেন।

এদিকে গ্রেফতারকৃত সাইফুল ও আরিফুল বর্তমানে রিমান্ডে গোয়েন্দা কার্যালয়ে রয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে গোয়েন্দা পুলিশ রিমান্ডে প্রাপ্ত তথ্য প্রকাশ করছে না। তবে আসামিরা ঘুরে বেড়ানোর পরও তাদের গ্রেফতার না করার ব্যাপারে জানতে চাইলে মামলা তদন্ত কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। যেকোনো মুহূর্তে এজাহারভুক্ত আসামিদের কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হতে পারে।

উল্লেখ্য, গত ৬ অক্টোবর রাজধানীর ১০টি কেন্দ্রে মোট চার হাজার ছয়শ সিনিয়র স্টাফ নার্স (ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি তিন হাজার ছয়শ ও মিডওয়াইফ এক হাজার) নিয়োগ পরীক্ষার বিপরীতে ১৬ হাজার নয়শ’জন অংশগ্রহণ করেন। শিউলি, হাসনাহেনা, রজনীগন্ধা, কামিনী নামে চার সেটের প্রশ্নপত্র ছাপে পিএসসি। কিন্তু সব সেটের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন পরীক্ষার আগে পাওয়া যায়। একাধিক পরীক্ষার্থী অভিযোগ করেন, পরীক্ষা শুরুর আগে ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাওয়া যায়। পরীক্ষার হলে গিয়ে তারা দেখেন, ফাঁস হওয়া প্রশ্নেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এমইউ/বিএ/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :