মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেও চাকরিতে রাখার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতির

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২৭ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭

সরকারি দায়িত্ব পালনকালে প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মচারী শারীরিক, আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনি যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাবেন। ফৌজদারি মামলা হলে, সেই মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেয়ার আগে সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো কর্মচারীকে গ্রেফতার করা যাবে না। এমনকি কোনো কর্মচারী আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেও চাকরিতে বহাল রাখার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন রাষ্ট্রপতি।

উল্লিখিত বিধান রেখে ‘সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৭’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিদ্যমান ৪৬টি আইন, রুলস, বিধিমালা ও নির্বাহী আদেশের প্রয়োজনীয় ধারা অন্তর্ভুক্ত করে প্রস্তাবিত আইনটি চূড়ান্তকরণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ নভেম্বর) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে চূড়ান্ত খসড়াটি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

আইনটির খসড়ার দ্বাদশ অধ্যায়ে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত কর্মচারীর ক্ষেত্রে ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ‘কোনো সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনের সহিত সম্পর্কিত অভিযোগে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক অভিযোগপত্র গৃহীত হওয়ার আগে তাকে গ্রেফতার করতে হলে, সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ (২০০৪ সালের ৫ নম্বর আইন) এর অধীনে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে অনুরূপ অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হবে না।’

‘কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো অভিযোগে বিচারাধীন থাকলে, বিচারাধীন কোনো এক বা একাধিক অভিযোগের বিষয়ে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা রুজু বা নিষ্পত্তির ব্যাপারে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকিবে না।’

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, ‘যদি বিচারকারী আদালতের গোচরীভূত হয় যে, তার আদালতে বিচারাধীন কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন সরকারি কর্মচারী, তাহলে আদালত অনতিবিলম্বে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবে।’

ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত কর্মচারীর ক্ষেত্রে এ আইনের খসড়ায় বলা হয়, ‘কোনো সরকারি কর্মচারি ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তৃক ১ বছরের অধিক মেয়াদের কোনো কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে রায় বা আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হবে।’

‘এছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী ফৌজদারি মামলায় আদালত কর্তক অনূর্ধ্ব ১ বছর মেয়াদের কোনো কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ দণ্ডিত কর্মকর্তাকে ধারা ৩৭ এ বর্ণিত দণ্ডসমূহের মধ্যে যেকোনো এক বা একাধিক দণ্ড আরোপ করতে পারবে। তবে শাস্তি যাই হোক না কেন রাষ্টপতি যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হন যে, আদালত কর্তক কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ও চাকরি হতে বরখাস্ত বা অসারণকৃত কোনো ব্যক্তিকে অনুরূপ বরখাস্ত বা অপসারণ হতে অব্যাহতি প্রদানের বিশেষ কারণ বা পরিস্থিতি রয়েছে তাহলে তিনি ওই ব্যক্তিকে অব্যাহতি প্রদান করতে পারবেন। এরূপ আদেশ প্রদান করা হলে ওই কর্মচারী চাকরিতে পুনর্বহাল হবেন।’

‘রাষ্ট্রপতি এরূপ অব্যাহতির আদেশ প্রদান করলে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ ওই কর্মচারীকে বরখাস্ত বা অপসারণ ব্যতীত, ধারা ৩৭ এ বর্ণিত অন্যান্য দণ্ডের মধ্যে যেকোনো এক বা একাধিক দণ্ড আরোপ করতে পারবে।’

এ আইনের ৩৭ ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ‘সরকারের কোনো কর্মচারী সরকারি কর্মচারীর অনুসরণীয় নীতি, আচরণ ও শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত আপাতত বলবৎ আইনের বিধান অনুসরণক্রমে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যধারা রুজু ও পরিচালনা করতে পারবে। এক্ষেত্রে রুজুকৃত বিভাগীয় কার্যধারা এবং উহা হতে উদ্ভূত আপিল, পুনর্বিবেচনা ও পুনঃরীক্ষণের পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে।’

বিভাগীয় কার্যধারায় দোষী সাব্যস্ত কোনো কর্মচারীকে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ এ সংক্রান্ত বিধির বিধান সাপেক্ষে এক বা একাধিক লঘু দণ্ড বা গুরু দণ্ড আরোপ করতে পারবে। এ বিধিতে লঘু দণ্ডের মধ্যে রয়েছে- তিরস্কার, নিদিষ্ট মেয়াদের জন্য পদোন্নতি বা বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ, এছাড়া বেতন স্কেলের নিম্নধাপে অবনমিতকরণ। গুরু দণ্ডের মধ্যে রয়েছে- নিম্ন পদ বা নিম্নতর বেতন স্কেলে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান, চাকরি হতে অপসারণ অথবা চাকরি হতে বরখাস্ত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক বলেন, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের কথা বলা হলেও এতদিন তা করা হয়নি। বর্তমান সরকার একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিদ্যমান আইন, বিধি ও নির্বাহী আদেশের প্রয়োজনীয় ধারা প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অবশেষে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় আলোচনা ও অনুমোদনের জন্য আইনটির খসড়া উপস্থাপন করা হচ্ছে।

জানা যায়, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা থাকলেও ৪৬ বছরেও কোনো সরকার তা পালন করেনি। এতদিন পর্যন্ত বিধি, নীতিমালা ও প্রয়োজনমতো নির্বাহী আদেশ জারির মাধ্যমে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করেছে সরকারগুলো। কোনো কোনো সরকার এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছর ধরে নানা প্রক্রিয়া শেষে ২০১৪ সালের ২১ মে প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। একই বছরের ৩ আগস্ট আইনটির খসড়ায় সম্মতি দেয় প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি। এরপর গত ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই সরকারি কর্মচারী আইনটির খসড়ায় নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা।

এরপর গত বছরের ২৪ নভেম্বর ওই আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় তোলা হলেও তাতে অনুমোদন না দিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উপস্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় উপস্থাপনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. মো. মোজাম্মেল হক খান স্বাক্ষরিত সারসংক্ষেপে বলা হয়, কমিটি ইতোমধ্যে দ্য সার্ভিস (রিঅরগানাইজেশন অ্যান্ড কনডিশন) অ্যাক্ট-১৯৭৫, দি পাবলিক সার্ভেন্টস (ডিসমিজল অন কনভিকশন) অরডিন্যান্স-১৯৮৫, গভর্নমেন্টস সার্ভেন্টস (স্পেশাল প্রভিশনস) অরডিন্যান্স-১৯৭৯, পাবলিক এমপ্লয়িজ ডিসিপ্লিন (পাংচ্যুয়েল অ্যাটনডেন্স) অরডিন্যান্স-১৯৮২, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা-১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা-১৯৮৫, বিএসআর-৭ ও ১৫, ইন্ডিয়ান পাবলিক সার্ভিস বিল-২০০৭, উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারী আত্তীকরণ আইন-২০১৫, আউটসোর্সিং নীতিমালা-২০০৮, সিভিল সার্ভিস আইনের খসড়া, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের খসড়া (মন্ত্রিসভায় নীতিগতভাবে অনুমোদিত), পাবলিক সার্ভেন্টস (রিটায়ারমেন্ট) অ্যাক্ট-১৯৭৪, সরকারি কর্মচারী আচরণ অনুশাসন-আদেশাবলি, সরকারি কর্মচারী (বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ) অনুশাসন/আদেশাবলি এবং সরকারি কর্মচারী নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চতকরণ অনুশাসন/আদেশাবলিসহ বিদ্যমান ৪৬টি আইন, বিধিমালা, অনুশাসন ও আদেশাবলি চিহ্নিত করে খসড়াটি তৈরি করা হয়েছে।

এমইউএইচ/জেডএ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :