এক হাজার কোটি টাকার মানিলন্ডারিং মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:২৪ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০১৭
এক হাজার কোটি টাকার মানিলন্ডারিং মামলা

চট্টগ্রাম বন্দরে চাঞ্চল্যকর ১২ কন্টেইনার মদ, সিগারেট ও টিভি আটকের ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। অস্তিত্বহীন দুটি প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল পরিমাণ আমদানি নিষিদ্ধ মদ সিগারেট আটকের ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধনী ২০১৫) অনুযায়ী শুল্ক গোয়েন্দা সোমবার রাজধানীর পল্টন মডেল থানায় এজাহার দায়ের করে।

শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সোমবার পল্টন মডেল থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ৫০। এজাহার দায়ের করেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বিজয় কুমার রায়।

এর আগে গত মার্চ মাসের ৫ ও ৬ তারিখে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি নিষিদ্ধ সিগারেট ও মদ এবং অবৈধভাবে আনা বিপুল পরিমাণ টেলিভিশনভর্তি ১২টি কনটেইনার জব্দ করেছিল শুল্ক গোয়েন্দা।

শুল্ক গোয়েন্দারা জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এসব কন্টেইনার ইনভেন্ট্রিকালে ১৬ হাজার ১৭০ বোতল মদ, তিন কোটি ৮৪ লাখ শলাকা সিগারেট, চার হাজার ৭৪টি এলইডি টেলিভিশন ও ২৮১টি আমদানি নিষিদ্ধ পুরাতন ফটোকপি মেশিন পাওয়া যায়। ১২টি কন্টেইনারের মাধ্যমে আনীত পণ্যের ঘোষিত মূল্য ছিল ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু আটককৃত পণ্যের প্রকৃত বাজারমূল্য প্রায় ১৩৪ কোটি টাকা।

পোল্ট্রি ফিডের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঘোষণা দিয়ে এই বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করা হয়। কিন্তু কনটেইনার খুলে কোনোটিতেই ঘোষিত পোল্ট্রি পণ্য পাওয়া যায়নি। হিনান আনহুই এগ্রো এলসি ও এগ্রো বিডি অ্যান্ড জেপি নামের দুটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনে আমদানিকারক খোরশেদ আলম।

ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ঘোষণায় চীন থেকে আনা চালান দুটি খালাসের দায়িত্বে ছিল সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান রাবেয়া অ্যান্ড সন্স। চালান দুটি চট্টগ্রাম বন্দরে আসার এক সপ্তাহ আগে থেকে শুল্ক গোয়েন্দার একটি দল নজরদারি শুরু করে। আমদানিকারকও এসব পণ্য জাহাজ থেকে বন্দরে নামানোর পর দ্রুত খালাস করে নেয়ার সব প্রক্রিয়া প্রায় গুছিয়ে আনেন।

তবে শুল্ক গোয়েন্দাদের কৌশলে তাদের চোরচালান পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় তা আবার ফেরত নেয়ার জন্য বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেন আমদানিকারক। সেই আবেদন নাকচ হওয়ার পরই আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মালিক আত্মগোপনে চলে যান। চালান আটকের পর থেকে অদ্যাবধি আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের মালিক পলাতক রয়েছেন।

মামলার আসামিরা হলেন রাজধানীর খিলক্ষেত থানার পাতিরা গ্রামের মো. নুরু মিয়া ছেলে আব্দুল মোতালেব, চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ মেসার্স রাবেয়া অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী জালাল উদ্দিন, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা থানার চরচান্দা গ্রামের মৃত আবুল খায়ের মোল্লার ছেলে মো. আরিফুজ্জামান, নেত্রকোণার পূর্বধলা থানার বিলকাউসী গ্রামের জুবেদ আলী ছেলে মোহাম্মদ রুকনুজ্জামান, বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চরসোনপচা গ্রামের শাহজামাল আকন্দের ছেলে মো. এনামুল হক, ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার গোসাইপুর গ্রামের জাফর আহাম্মদের ছেলে ফররুখ আহাম্মদ এবং নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার পারশালনগর গ্রামের আমির হোসেনের ছেলে মো. রওশন আলম।

শুল্ক গোয়েন্দা দফতর কর্তৃক অনুসন্ধানে দেখা যায়, উভয় প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে প্রদর্শন করে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খুললেও প্রকৃতপক্ষে মূলধনী যন্ত্রপাতির পরিবর্তে বিপুল পরিমাণ মদ, সিগারেট ও টেলিভিশনসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্য আমদানি করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, সিগারেটের আমদানি শুল্ক ৫০০ শতাংশ, মদের আমদানি শুল্ক প্রায় ৬০০ শতাংশ আর টিভির আমদানি শুল্ক ১৯০ শতাংশ। অথচ ঘোষিত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির শুল্ক মাত্র ১ শতাংশ। ম্যানুফ্যাকচারার হিসেবে ভুয়া কাগজ দিয়ে পণ্য খালাসে গ্রিন চ্যানেলের অবৈধ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা ছিল। বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিতেই এভাবে মিথ্যা ঘোষণায় এই চালান আনা হয়েছিল।

আসামি আব্দুল মোতালেব তার নিজের নাম ও ব্যবসা পরিচয় গোপন করে জনৈক খোরশেদ আলম, গ্রাম: পূর্বগ্রাম, বাসা: দক্ষিণ ব্যাপারীবাড়ী, ইউনিয়ন: কায়েতপাড়া, উপজেলা: রূপগঞ্জ, জেলা: নারায়ণগঞ্জের নাম ও ছবি ব্যবহার করে মূল্য সংযোজন কর নিবন্ধন গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি নিজের ছবি ও স্বাক্ষরের স্থলে খোরশেদ আলমের ছবি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করেছেন।

সংশ্লিষ্ট আইএফআইসি-র পল্টন শাখার ব্যাংকের কর্মরত কর্মকর্তাদের যোগসাজসে এই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও এলসি খোলা হয়েছে মর্মে অনুসন্ধানে পাওয়া যায়। অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের সাথে ভুয়া নামপরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ব্যবসা করেছে।

শুল্ক গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রকাশ, আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে চোরাচালানের মাধ্যমে আমদানিকৃত ১২টি পণ্য চালানের বিপরীতে শুল্ককরাদি ফাঁকি প্রদান করে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধ করেছেন।

জেইউ/বিএ