দেশে তুষ-খড়-কচুরিপানায় হবে জৈব জ্বালানি

মাসুদ রানা
মাসুদ রানা মাসুদ রানা , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৫৩ পিএম, ২০ ডিসেম্বর ২০১৭

ঝোলাগুড়, পুরনো কাগজ, তুষ, ধানের খড়, গাছের বাকল, কচুরিপানা, জলজ ও বনজ নরম উদ্ভিদ দিয়ে দেশে তৈরি হবে জৈব জ্বালানি (বায়ো-ইথানল)। এজন্য ‘বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপন এবং পরিচালনা নীতিমালা-২০১৭’ চূড়ান্ত করেছে সরকার।

গত ১২ ডিসেম্বর নীতিমালাটি জারি করে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

জৈব কাঁচামাল ব্যবহার করে ফার্মেন্টেশন (অণুজীবের উপস্থিতিতে বায়োমাস বা জৈববস্তুপুঞ্জ থেকে বায়ো-ইথানল উৎপাদন) প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত রাসায়নিক দ্রব্য, যা জ্বালানি ও জ্বালানি সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বায়ো-ইথানল পরিবেশবান্ধব এবং আর্থিক দিক থেকে সাশ্রয়ী।

বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনের শর্তাবলি, আবেদন প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত অনুমোদন পদ্ধতি, গুণগতমান নিশ্চিতে করণীয়, নিয়ম ভঙ্গে শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়।

নীতিমালার বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আপনি এ বিষয়ে বিপিসির (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সঙ্গে কথা বলুন।’

বিপিসির চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, ‘আমি এখনও নীতিমালাটি দেখিনি। দেখার পর এটা নিয়ে কথা বলতে পারব।’

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ফলে সৃষ্ট দূষণ কমাতে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ করেছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কারণে দেশে বিকাশমান শিল্পখাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জ্বালানি সহায়ক পণ্য হিসেবে ইথানল উৎপাদন ও বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ জাতীয় প্ল্যান্টের কাঁচামাল হিসেবে বায়োমাস (জৈববস্তুপুঞ্জ) ব্যবহার করা হয়। বায়ো-ইথানল পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে বিশ্বব্যাপী বিবেচিত হচ্ছে।

সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রচলিত জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে পেট্রল ও অকটেনের সঙ্গে পাঁচ শতাংশ বা সরকার নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য মাত্রার বায়ো-ইথানল মিশ্রণ করে যানবাহনে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি তেল ও পেট্রলিয়ামজাত পণ্য আমদানি, মজুদ, সংরক্ষণসহ যে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই বায়ো-ইথানল উৎপাদন, প্ল্যান্ট স্থাপন ও ব্যবহারের বিষয়ে এ নীতিমালা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বায়ো-ইথানল উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত কাঁচামাল (বায়োমাস) হবে আমদানি করা ভুট্টার দানা, ঝোলাগুড়, পুরনো নরম কাগজ (যেমন- পুরনো নিউজপেপার), তুষ, ভুট্টার গাছ, আখের ছোবড়া, সুতা তৈরির কারখানার বাতিল সুতা ও তুলা, ধানের খড়, গাছের বাকল, মিউনিসিপ্যাল বর্জ্য (বিভিন্ন সবজির পরিত্যক্ত অংশ), চালের খুদ, কচুরিপানা, বিট, জলজ ও বনজ নরম উদ্ভিদ, সুইস গ্রাস। এসব দ্রব্যাদি ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।

সরকার বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট অনুমোদন ও এ সংক্রান্ত সেবা দিতে ফি নির্ধারণ করতে পারবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে আবশ্যই সরকারের অনুমোদন নিতে হবে। নীতিমালার কোনো শর্ত বা সরকারের আইন ও বিধি ভঙ্গের জন্য সরকার বায়ো-ইথানল প্ল্যান্টের অনুমোদন বাতিল করতে পারবে।

বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রাথমিক অনুমোদনের শর্তাবলিতে বলা হয়েছে, বেসরকারিভাবে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হবে। বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে ভুট্টার দানা ছাড়া অন্যান্য কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করতে হবে। বিধি অনুযায়ী, ভুট্টার দানা বিদেশ থেকে আমদানি করা যাবে। স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যা হলে তা বিদেশ থেকে বিধি মেনে আমদানি করা যাবে।

নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঁচামাল থেকে বায়ো-ইথানল উৎপাদন করে বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বা মনোনীত প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করতে হবে। বিপিসি বায়ো-ইথানল বা পণ্য গ্রহণ করতে না পারলে তা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজ উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় রফতানি করতে হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট আবাসিক, জনবহুল এলাকা বা সরকার নিয়ন্ত্রিত বনভূমিতে স্থাপন করা যাবে না। বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট স্থাপনে আন্তর্জাতিক কোড অব প্র্যাকটিস, স্ট্যান্ডার্ড এবং দেশে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। স্থাপিত বা স্থাপিতব্য প্ল্যান্টে স্বীকৃত মানসম্মত কাঁচামাল ব্যবহার করতে হবে।

প্ল্যান্ট স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বিপিসি, পরিবেশ অধিদফতর, বিস্ফোরক পরিদফতর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনসহ (বিএসটিআই) সরকারের বিধিবদ্ধ সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়ার পর উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকার অনুমোদন দেবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রাথমিক অনুমতিপত্র প্রাপ্তির ১৮ মাসের মধ্যে আবেদনকারী বা প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতর থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা অনুমতি বা ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র বা লাইসেন্স সংগ্রহ করে প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ শেষ করতে হবে। প্ল্যান্ট স্থাপনের পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আবেদন করতে হবে।

বায়ো-ইথানল প্ল্যান্টে তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন করতে হবে উল্লেখ করে নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রাথমিক আবেদনের ক্ষেত্রে আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংবলিত স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাব, প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য প্রস্তাবিত জমির সঠিক পরিমাণ, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত স্বত্বলিপি বা দলিল বা দীর্ঘ-মেয়াদি চুক্তি বা নিবন্ধিত বায়নাপত্র ইত্যাদি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দাখিল করতে হবে।

কাগজপত্রাদিসহ আবেদন প্রাপ্তির পর বিপিসি আবেদনের বিষয়ে সরেজমিন যাচাই করে একটি প্রতিবেদন দুই মাসের মধ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে দাখিল করবে। এ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রাথমিক অনুমতি দেবে। তবে উৎপাদনে যাওয়ার আগে চূড়ান্ত অনুমোদন নিতে হবে।

বায়ো-ইথানল যাতে পানযোগ্য পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা না যায় সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত হারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্যাদি মিশ্রণ করে পানের অযোগ্য করতে হবে। পণ্য মজুদ ও পরিবহনের সময় আধারের গায়ে বিষ/টক্সিক চিহ্ন বা লেখা দৃশ্যমান থাকতে হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

উৎপাদিত বায়ো-ইথানল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মান নিয়ন্ত্রণ সনদপত্র দিলেই তা বিপিসিতে পাঠানো যাবে।

উৎপাদানকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বায়ো-ইথানল বিপিসির নির্ধারিত স্থান বা ডিপোতে সরবরাহ করবে। বিপিসির প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত হারে বায়ো-ইথানল পেট্রল ও অকটেনের সঙ্গে মেশাবে।

সরকারি বিধি-বিধান অনুযায়ী প্ল্যান্ট পরিচালনা এবং পণ্যের গুণগত মানের ক্ষেত্রে অসদুপায় অবলম্বন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে প্রথম দফায় সতর্কীকরণসহ ১০ লাখ টাকা জরিমানা, দ্বিতীয় দফায় ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। তৃতীয় দফায় মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা নীতিমালায় বলা হয়েছে।

উৎপাদিত পণ্য সরকারি নিদের্শনা বা অনুমতির বাইরে বিক্রি করলে, প্ল্যান্ট পরিচালনায় আন্তর্জাতিক কোড ও স্ট্যান্ডার্ড এবং দেশে প্রচলিত বিধি-বিধান অনুসরণ না করলে উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান নিশ্চিতে ব্যর্থ হলে বায়ো-ইথানল প্ল্যান্টের অনুমতি বাতিল করতে পরবে সরকার।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বায়ো-ইথানল একটি পরিবেশ সম্মত জ্বালানি হিসেবে সরকারের এ সম্পর্কিত বিধানের আওতায় এ কার্যক্রমে প্রণোদনা দিতে পারবে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিপিসি, বিস্ফোরক পরিদফতর, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পরিবেশ অধিদফতর একত্রে বা আলাদাভাবে যে কোনো সময় বায়ো-ইথানল প্ল্যান্ট পরিদর্শন করতে পারবে। পরিদর্শনকালে প্ল্যান্ট স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানকে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তা বা দলের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করতে হবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আরএমএম/জেডএ/এমএস