অবৈধ সংযোগের হিসাব নেই, চার বছরে বিচ্ছিন্ন সাড়ে ৮ লাখ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:২১ পিএম, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮

সারাদেশে তিতাস গ্যাসের কী পরিমাণ অবৈধ সংযোগ রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে। তবে গত চার বছরে অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিচ্ছিন্ন করা এসব অবৈধ সংযোগের বিতরণ লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ১ হাজার ৫০৮ কিলোমিটার।

এদিকে প্রতিবছরই সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটি সিস্টেম লসের মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ গ্যাস ক্রয় করছে, তার থেকে কম বিক্রি করছে। তবে তিতাস গ্যাসের এ হিসাব কারসাজির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, তিতাস গ্যাস সিস্টেম লসের মধ্যে নেই। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছরই সিস্টেম গেইন করে। কিন্তু অসংখ্য অবৈধ সংযোগ দেওয়ার কারণে সেগুলো সমন্বয় করতে কারসাজির মাধ্যমে হিসাব বিবরণী তৈরি করে।

অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে তিতাস গ্যাসের অভিযান সংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ১৫১টি স্থানে ৬১৭টি অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ১ হাজার ৫০৮ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন এবং ৮ লাখ ৪৬ হাজার ১০৫টি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

এর মধ্যে ২০১৭ সালে ৪৯১টি স্থানে ২২৯টি অভিযান পরিচালিত হয়। ওই অভিযানে ৬১৯ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন এবং ৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪৯টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এর মধ্যে শুধু ডিসেম্বরেই ৬৮টি স্থানে ২২টি অভিযান চালিয়ে ৪১ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন এবং ২১ হাজার ২০০টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

২০১৬ সালে ৩৫৬টি স্থানে ১৮৯টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ওই অভিযানে ৫৭০ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন এবং ৪ লাখ ২৭ হাজার ১৫৬টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। আর ২০১৫ সালে ১১৪টি স্থানে ৮১টি অভিযান চালিয়ে ৮১ কিলোমিটার অবৈধ বিতরণ লাইন এবং ২৪ হাজার ৩০০টি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়।

অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের বিষয়ে তিতাস গ্যাসের দক্ষিণের ভিজিল্যান্সের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী জয়নাল আবেদিন জাগো নিউজকে বলেন, কী পরিমাণ অবৈধ সংযোগ আছে তার কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জোন থেকে অভিযান চালানো হয়। মাঝে মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) অনুমোদন নিয়ে প্রধান কার্যালয় থেকে আমাদের টিম অভিযানে যায়।

এদিকে তিতাস গ্যাসের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে প্রতিটি হিসাব বছরেই কোম্পানিটি সিস্টেম লসে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটি যে পরিমাণ গ্যাস ক্রয় করছে, তার থেকে কম বিক্রি করতে পারছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৪ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৮ এমএসসিএম গ্যাস ক্রয় করে। আর বিপরীতে বিক্রি করে ১৪ লাখ ২৩ হাজার ৬৪২ এমএসসিএম।

পরের বছর ২০১৩-১৪তে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৮৯৯ এমএমসিএম ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি হয় ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ২০৮ এমএমসিএম। একইভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৬ লাখ ৪ হাজার ৯৪৯ এমএমসিএম ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি ছিল ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৬৮৭ এমএমসিএম।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৭ লাখ ৪ হাজার ৪৬৫ এমএমসিএম ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রয় দেখানো হয় ১৬ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৩ এমএমসিএম। আর সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৭ লাখ ২৩ হাজার ৬৮৩ এমএমসিএম ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রি হয় দেখানো হয়েছে ১৭ লাখ ১ হাজার ৮৯৯ এমএমসিএম।

বছরের পর বছর প্রতিষ্ঠানটির গ্যাস ক্রয়ের বিপরীতে বিক্রির কম হওয়ার বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মো. শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, তিতাসের এ হিসাব সঠিক নয়। তিতাস সিস্টেম লসে নয়, বরং সিস্টেম গেইনে আছে। কিন্তু তারা অসংখ্য অবৈধ সংযোগ দিয়ে রেখেছে। সেই সব অবৈধ সংযোগের কারণে কোথাও সিস্টেম লস, কোথাও সিস্টেম গেইন দেখিয়ে হিসাব মেনুপুলেট করা হয়। হিসাব মেনুপুলেটের কারণেই তারা সিস্টেম লস দেখায়।

এমএএস/জেএইচ/আরএস/আরআইপি