জীবন যুদ্ধে হার না মানার গল্প

আবু সালেহ সায়াদাত
আবু সালেহ সায়াদাত আবু সালেহ সায়াদাত , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৫২ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাজধানীর গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরে একটু পর পর সিগন্যালে এসে গাড়ি দাঁড়াচ্ছে। মুহূর্তেই দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির লাইন আর ঠিক সে সময়ই একজন লোক ছুটে যাচ্ছেন গাড়িগুলোর দিকে। এক পা হারানোর পর থেকেই এভাবে ক্র্যাচে ভর দিয়ে শন পাপড়ি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন শহিদুল ইসলাম (ছদ্ম নাম)। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে, থাকেন রামপুরায়। ট্রাক দুর্ঘটনায় বাম পা হারিয়েছেন ২০০৪ সালে। এরপর থেকে এভাবে শন পাপড়ি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।

নিজের জীবন যুদ্ধ সম্পর্কে তিনি বলেন, আগে আইসক্রিম কোম্পানিতে চাকরি করতাম। যা আয় হতো তা দিয়েই সংসার চলতো। কিন্তু ২০০৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারানোর পর থেকে অন্ধকার নেমে আসে। পা হারানোর পর চাকরিটা চলে গেলে পরে অনেক জায়গায় চাকরির চেষ্টা করি কিন্তু এক পা না থাকায় কেউ চাকরিতে নেয়নি। সংসারে অভাব অনটন আরও বাড়তে থাকে। দোকান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই কিন্তু পুঁজির অভাবে তা হয়নি।

jagonews24

এরপরই শুরু হয় জীবনের আরেক অধ্যায়। শন পাপড়ি বিক্রি করাকে পেশা হিসেবে বেছে নিই। নিজ গ্রামে একটি কুঁড়ে ঘর ছাড়া আর কোনো সম্পত্তি নেই। সেখাই থাকেন স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচও চলে এই শন পাপড়ি বিক্রির টাকায়।

প্রতিদিন সকালে গুলশান-২ নম্বর গোলচত্বরে এসে শন পাপড়ি বিক্রি করেন। সারা দিনে ৫০-৬০ প্যাকেট বা তারও বেশি বিক্রি হয়, দিনে আয় হয় ৪০০-৫০০ টাকা। এই আয় দিয়ে নিজের এবং পরিবারের খরচ চলে।

তিনি বলেন, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন আমার মতো আর কারো অবস্থা না হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় যেন কারো এমন অন্ধকারময় জীবন না হয়। সড়ক দুর্ঘটনা আমার সুন্দর জীবিনটা নষ্ট করে দিয়েছে। এভাবে ফেরি করে শন পাপড়ি বিক্রি করতে ভালো লাগে না। কিছু পুঁজি হলে একটা দোকান দিতে চাই।

jagonews24

গুলশান ২ নম্বরে সিগন্যালে দাঁড়ানো গাড়ি থেকে শন পাপড়ি কিনছিলেন আহমেদ তাহের নামের এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, পা হারালে অভাবী মানুষরা অনেকেই ভিক্ষায় নেমে যায় কিন্তু এই লোক এক পা হারিয়ে এভাবে শন পাপড়ি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। তার এই মনোবলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার কাছ থেকে শন পাপড়ি কিনলাম। ১০ টাকা শন পাপড়ির দাম ৫০ টাকা দিয়ে তাকে বাকিটা রেখে দিতে বললাম। সে উত্তর দেয়, স্যার এমন করুণা নয়, পা হারনোর পর জীবিকার যুদ্ধে নেমেছি, করুণা নয় অধিকার নিয়েই টিকে থাকতে চাই। তার এই উত্তর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৭ সালে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ৩৯৭ জন। আর আহত হয়েছেন ১৬ হাজার ১৯৩ জন।

সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে ৪ হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ হাজার ৫৫ জন নিহত ও ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল। বিগত বছরের তুলনায় ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ। নিহত ২২.২ শতাংশ এবং আহত ১.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এএস/এআরএস/আরআইপি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]