‘অামার মাইয়্যারেও পোড়ালো, অামার বিরুদ্ধেও মামলা দিল’

ঢামেক প্রতিবেদক
ঢামেক প্রতিবেদক ঢামেক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:০০ পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

‘যে অামার বাচ্চা পুড়ায় দিছে হেই অাবার অামার বিরুদ্ধে মামলা দিছে। দেশে বিচার থাহিলে কি এমন হয়? যার পয়সা বেশি হের বিচার অাছে, যে গরিব হের বিচার নাই। অামি গরিব, তাই কাউরে কই নাই অামার বিচার করণের লাই। সোহেল অামারে ফোন দিয়া কই, অাপনেরা (সাংবাদিকরা) রেকর্ডিং কইরা, ভিডিও কইরা নিউজ করছেন, এ অপরাধে হেয় অামার বিরুদ্ধে মামলা দিছে। কিন্তু অামি তো কারো কাছে বিচার চাই নাই। অামার বিচার তো অাল্লার কাছে দিছি। গরিবদের বিচার এ দুনিয়াতে নাই।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া ১১ বছরের একমাত্র সন্তান মনি অাক্তারের পাশে বসে মলিন দৃষ্টি নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বাবা অাব্দুল অাজিজ।

পাশে বসে থাকা মনি অাক্তারের মা শিউলী অাক্তারও ঠিক যেন কথাগুলো বলছেন অার নিজের অসহায়ত্বের প্রতিধ্বনিতে বারবার বলতে চাচ্ছেন, গরিব হয়ে জন্ম নেয়া মানেই হলো- অন্যায়, অত্যাচার অার নির্যাতন যেন তাদের নিত্যসঙ্গী।

বাবা অাব্দুল অাজিজ শারীরিক অক্ষমতার কারণে অাধাবেলা ভাড়া রিকশা চালাতেন অার মা শিউলী অাক্তার অাগে মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করলেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে পেটের দায়ে ভিক্ষা করেই দিন চলতো তাদের। মনি অাক্তার তাদের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অভাবের তাড়নায় মাসে দুই হাজার টাকা পাওয়ার অাশায় তাকে কাজ করতে দেয় একটি উচ্চ শিক্ষিত পরিবারে।

কিন্তু গত ১৭ জানুয়ারি নরসিংদীতে মনির গায়ে গরম পানি ঢেলে দেয় সেই উচ্চ শিক্ষিত পরিবারের গৃহকর্ত্রী কলেজশিক্ষিকা মাহামুদা ইয়াসমিন নাজমা। নাজমার স্বামী হাসান সারোয়ার সোহেল জনতা ব্যাংকে চাকরি করেন। গরম পানিতে ঝলসে যায় মনির মুখের অর্ধেকাংশ, দুই হাত ও বুকের এক পাশ। এ ঘটনার তিনদিন পর তারা লোক মারফত মনিকে তার বাড়িতে পাঠায়। কিন্তু অসহায় মা-বাবা তখনও বাসায় ফেরেননি। বিকেলে তারা বাসায় ফিরে দেখেন তাদের অাদরের সন্তান মৃত্যু যন্ত্রণায় বিছানায় কাতরাচ্ছে।

মনি অাক্তার জাগো নিউজকে জানায়, প্রতিদিন সকালে তারা দুজন অফিসে যায়। সকাল ৫টাই ঘুম থেকে উঠে সে রান্না শুরু করে। ওইদিন সে সকাল ৬টায় রান্না শেষ করে পানি গরম করতে দিয়েছে চুলায়। কিন্তু গরম পানির পাতিলটা ওজন হওয়ায় গোসলখানায় নিতে পারবে না বলায় গৃহকর্ত্রী নাজমা রেগে এসে তাকে গালের ওপর কয়েকট থাপ্পর মেরে এক মগ গরম পানি মেরে দেয়। এতে তার মুখ, বুক ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়।

মনি অাক্তারের বরাত দিয়ে মা শিউলী অাক্তার জাগো নিউজকে জানান, সারাদিন ভিক্ষা করে দু’মুঠো চাল নিয়ে বাসায় ফিরে দেখেন তাদের মেয়ের হাত-মুখ পোড়া। যন্ত্রণায় মেয়ে অশ্রুজলে কাতরাচ্ছে। মেয়ের কাছ থেকে জানতে পারেন এ ঘটনা অারও তিনদিন অাগে হয়েছে। ওইদিন ঘটনার পর নাজমা দ্রুত ঘর থেকে পালিয়ে যায়। পরে মনির চিৎকারে গৃহকর্তা সোহেল ঘুম থেকে উঠে পোড়াস্থানে মলম লাগিয়ে মনিকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিলে ডাক্তার ভিকটিমের মা-বাবাকে অানতে বলেন। এ কারণে গৃহকর্তা লোক দিয়ে মনিকে বাসায় পাঠিয়ে তারা গা ঢাকা দেন।

মনির বাবা অাব্দুল অাজিজ জাগো নিউজকে জানান, এমন অবস্থায় তারা স্থানীয় মেম্বার ও চেয়ারম্যানের কাছে যান। কিন্তু সেখানে কোনো বিচার পাননি। পরে নিরুপায় হয়ে সাতদিন পর নরসিংদী থানায় নিয়ে যান মেয়েকে। এমন অবস্থা দেখে পুলিশ প্রথমে নরসিংদী জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করে মনিকে।

তিনি অারও জানান, মেয়ের ঘটনা সব জায়গায় ছড়িয়ে গেলে এটা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মনিকে নিয়ে নিউজ হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে গৃহকর্তা সোহেল মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময় হুমকি দিয়েছে মামলা তুলে নেয়ার জন্য। এমনকি তার বিরুদ্ধে থানায় মামলাও দিয়েছে বলেও হুমকি দিচ্ছে অভিযুক্ত সোহেল।

অাব্দুল অাজিজ নরসিংদীতে সড়কের পাশে একটি ঝুপড়ি ঘর বানিয়ে থাকলেও তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমপুরে। অভিযুক্ত সোহেলের স্বজনরা তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েও অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন অাব্দুল অাজিজ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, শুধু অাইন অার শাস্তি প্রদান করে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। কারণ মানবিক মূল্যবোধের অভাবে এ ধরনের ঘটনার শিকার হয় অধিকাংশ নির্যাতিতরা। তারা গরিব ও অসহায় হওয়ায় তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না উপযুক্ত বিচার চাওয়া। তাই এ ধরনের অপরাধ দমনে মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্য সামাজিককল্যাণে কাজ করা সংগঠনগুলোকে এগিয়ে অাসতে হবে।

ঢামেকের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বলেন, মনি অাক্তারের শরীরের প্রায় ১৫ শতাংশ পুড়ে গেছে অাশা করছি দুই মাসের মধ্যে সে সুস্থ হতে পারবে। ইতোমধ্যে হাতের অপারেশন করা হয়েছে। ক্ষতগুলোও শুকাতে শুরু করেছে।

বিএ/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :