ছেলেকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বৃদ্ধা মায়ের আবেদন

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১১:০১ পিএম, ১১ জুলাই ২০১৮

‘আমার ছেলে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তাকে বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাই। প্রতিদিন জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। এখন তার চিকিৎসার খরচ চালানোর মতো আর্থিক ক্ষমতা আর আমাদের নাই। টাকার অভাবে কি ধুঁকে ধুঁকে মারা যাবে আমার সন্তান।’

এ করুণ আকুতি এক বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মোহাম্মদ মোস্তফার স্ত্রী ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) অসুস্থ সিনিয়র সাংবাদিক ইনামুল হক বাবুলের সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) কেবিন ব্লকের ৬ষ্ঠ তলার ৬১১ নম্বর কেবিনে ব্রেন স্ট্রোকসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ইনামুক হক বাবুল।

অসুস্থ ছেলের শয্যাপাশে বসে আর্থিক অপারগতার কথা বলতে গিয়ে এই অসহায় মা দুহাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। গত দেড় মাসেরও বেশি সময় যাবত হাসপাতালে ছেলের কক্ষেই দিন কাটছে তার। এক মুহূর্তের জন্য কোথাও যেতে পারেননি তিনি।

f

মায়ের কান্না দেখে কয়েক সেকেন্ড হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন ইনামুল হক বাবুল। এ সময় পাশে দাঁড়ানো স্ত্রী, বোন, ভগ্নিপতিসহ অন্যান্যরা চোখের পানি লুকাতে চাইলেও নীরবেই তাদের চোখ থেকে টপটপ করে পানির ফোটা গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

এ দৃশ্যপট আজ (বুধবার) রাত আনুমানিক ৮টার দিকের। ঠিক তার কিছুক্ষণ আগেই এ প্রতিবেদক দরজায় কড়া নাড়তেই একজন কেয়ারটেকার এসে খুলে দিলেন। ভেতরে বাবুলের বৃদ্ধা মা তজবিহ হাতে বসে আছেন। তার ডাক্তার স্ত্রী রোজিনা রওশন হক স্বামীর চিকিৎসার বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। পাশেই বেডে শুয়ে ঘুমাচ্ছেন ইনামুল হক বাবুল।

মাত্র কয়েক মাস আগেও তথ্য সংগ্রহে মাঠ চষে বেড়ানো লম্বা সুঠামদেহী বাবুলকে দেখে চেনা দায়। শুঁকিয়ে কংকালসার দেহ হয়ে গেছে। মস্তিষ্কে রক্তজমাটজনিত ব্যাধিতে গত আড়াই মাস যাবত শরীরের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। গত ১ এপ্রিল অসুস্থ হন বাবুল। এরপর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতাল ও বিএসএমএমইউ’র আইসিইউতে মাসাধিকাল কাটাতে হয়েছে। দিনের পর দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকলেও এখন তার বিদেশে চিকিৎসা প্রয়োজন বলে জানালেন পরিবারের সদস্যরা।

j

 

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বাবুলের স্ত্রী জানান, স্বামীর চিকিৎসায় প্রতিদিন জলের মতো টাকা খরচ হচ্ছে। প্রতিদিন কেবিনভাড়া সাড়ে চার হাজার টাকা, দুটি ইনজেকশন ৯ হাজার টাকা, ফিজিওথেরাপিস্ট ফি দেড় হাজার টাকা, তাকে দেখভালের জন্য পরিচর্য়াকারী দুজনকে এক হাজার টাকাসহ প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। গত তিন মাসে দুটি হাসপাতালে আইসিইউ বিলসহ ২০ লাখেরও বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে।

তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকা, সাংবাদিক কল্যাণ ফান্ড থেকে দুই লাখসহ মোট আট লাখ টাকার মতো অনুদান পেয়েছেন। ওই টাকা শেষ হয়ে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের টাকাও শেষ। এখন আত্মীয়-স্বজনসহ বিভিন্নজনের কাছ থেকে ঋণ করে চিকিৎসা চলছে।

বাবুলের বোন লুৎফুন নাহার বলেন, সাংবাদিক ভাই আর ডাক্তার ভাবির যা আয় রোজগার হতো তা দিয়ে তাদের দুই সন্তানসহ সংসারের ভরণপোষণ ও সব খরচ স্বাচ্ছন্দ্যে চলে যেতো। কিন্তু গত তিন মাসে বিপুল টাকা খরচে সচল সংসার অচল হতে বসেছে।

j

কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবুল জানান, তার বাবা মোহাম্মদ মোস্তফা মুক্তিযুদ্ধে ৬ নম্বর সাব সেক্টর কমান্ডার নওয়াজেশের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে মুক্তিযুদেধর চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে সবসময় সাহসিকতার সাথে সাংবাদিকতা করেছেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মিডিয়া টিমের সিনিয়র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলেন, ওষুধ আর ইনজেকশন খেতে খেতে শরীর আর কুলায় না। তাছাড়া প্রতিদিন এত টাকা খরচ জোগাতে ঋণ করতে হচ্ছে। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন, জানি না বিনা চিকিৎসায় মারা যাবো কিনা?

বাবুলের স্ত্রী জানালেন, বিএসএমএমইউ’র চিকিৎসকরা জানিয়েছেন- এ দেশে আর তার চিকিৎসা নেই। অধিকতর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত বিদেশের উন্নত হাসপাতালে নিতে হবে। তারা ইতোমধ্যেই সিঙ্গাপুরের দুটি হাসপাতালে যোগাযোগ করে জেনেছেন এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় কমপক্ষে ৩০ লাখ টাকা খরচ হবে।

বাবুলের মা নুরজাহান বেগম বলেন, পারিবারিকভাবে কিছু টাকা জোগাড় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি দয়া করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তার সাংবাদিক ছেলেকে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে আনেন তবে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো।

এমইউ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :