পায়েল হত্যা : ভুয়া জিম্মাদার দেয়ায় তিন আসামির জামিন বাতিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৯ পিএম, ২০ মার্চ ২০১৯

চাঞ্চল্যকর পায়েল হত্যা মামলার তিন আসামি হানিফ পরিবহনের বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। ভুয়া জিম্মাদার দেখিয়ে জামিন নেয়ার অপরাধে ওই জামিন বাতিল করে আদালত তাদের বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এ ঘটনায় আদালতের সঙ্গে প্রতারণা দায়ে আসামিদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহমিদা আফসানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের কাছে আদেশের কপি প্রেরণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে আগামী ২৭ মার্চ মামলার চার্জ গঠনের জন্য পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

বুধবার (২০ মার্চ) চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আবদুল হালিমের আদালত এসব আদেশ দেন।

এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পিপি অ্যাডভোকেট আইয়ুব খান বলেন, তিন আসামি ট্রাইব্যুনালে এসে ভুয়া জিম্মাদার দাখিল করে জামিন নেন। বিষয়টি বুধবার আদালতের নজরে আনা হলে ট্রাইব্যুনাল আদালতের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনায় তাদের জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে আসামিদের আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনজীবী সমিতির কাছে আদেশের কপি পাঠান ট্রাইব্যুনাল।

ভুয়া জিম্মাদার প্রসঙ্গে আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আইয়ুব খান বলেন, আদালতের আদেশ পেলে বিষয়টি দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়।

payel-2

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মার্চ আসামিরা হাইকোর্টের নির্দেশনার আলোকে স্থানীয় দুইজন ব্যক্তির জিম্মায় ২০ হাজার টাকা বন্ডে জামিননামা দাখিল করেন। আদালত তা গ্রহণ করে তাদের জামিন মঞ্জুর করেন। দুই জিম্মাদারের মধ্যে একজন শিউলি বেগম, ভোটার আইডি নম্বর ১৯৯১২৬৯৩৬২২০০০২৮৮। কিন্তু এই ভোটার আইডিতে একজন পুরুষের ছবি রয়েছে। এতে আদালতের সন্দেহ হয়। শিউলি বেগম পুরুষ হতে পারেন না। ট্রাইব্যুনাল এ ঘটনাকে আদালতের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে মর্মে আদেশ দেন।

আসামিদের সময়ের আবেদন নামঞ্জুর করে আসামি চালক জামাল হোসেন, সুপারভাইজার মো. জনি ও হেলপার মো. ফয়সাল হোসেনের জামিন বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন।

এ ঘটনায় আসামিদের আইনজীবী ফাহমিদা আফসানার বিরুদ্ধে এমন ঘটনায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা ট্রাইব্যুনালকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে লিখিতভাবে জানানোর জন্য চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদককে আদেশ দেন আদালত।

২০১৮ সালের ২১ জুলাই রাতে দুই বন্ধুর সঙ্গে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার পথে রওনা হওয়ার পর নিখোঁজ হন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. সাইদুর রহমান পায়েল। একদিন পর ২২ জুলাই মুন্সিগঞ্জ উপজেলার ভাটেরচর সেতুর নিচের খাল থেকে পায়েলের লাশ উদ্ধার করে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানা পুলিশ।

পায়েলের বন্ধু জনির কথা অনুযায়ী, পায়েলের গাড়ি থেকে নামার স্থান ও মরদেহ উদ্ধারের স্থানের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এই দূরত্ব এবং পায়েলের পরিবার ও দুই থানার ওসির বক্তব্যের ভিন্নতা মধ্যেই লুকিয়ে ছিল পায়েল হত্যার রহস্য। বিষয়টিকে সামনে এনে সাইদুর রহমান পায়েল নিখোঁজের তিনদিন পর ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই ‘বাস থেকে নেমেছিল কোথায় পায়েল?’ শিরোনামে জাগো নিউজে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

সংবাদ প্রকাশের একদিন পরেই ২৫ জুলাই হানিফ পরিবহনের সুপারভাইজার ও চালক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, ‘নারায়ণগঞ্জে নয়, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানার ভাটেরচরই বাস থেকে নেমেছিল পায়েল। পরবর্তীতে যানজট নিরসন হলে বাসটি দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করে। এমতাবস্থায় বাসে উঠতে গিয়ে বাসের দরজার সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে পায়েলের। এতে তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে থাকলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরবর্তীতে বাসচালক, চালকের সহযোগী ও সুপারভাইজার পায়েলকে মৃত ভেবে ব্রিজ থেকে ফেলে দিয়ে চলে আসে।’

গজারিয়া থানার পুলিশ ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর তিন আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয় পুলিশ। ২৪ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ মামলাটি চট্টগ্রামের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরে প্রজ্ঞাপন জারি করেন। প্রজ্ঞাপনটি ১৬ জানুয়ারি পায় পায়েলের পরিবার। চট্টগ্রামে বিচার শুরু হয় ১৩ মার্চ।

যেভাবে ধরা পড়লো ঘাতকদের মিথ্যাচার :

নিহত পায়েলের মরদেহ উদ্ধারের তিনদিন পর জাগো নিউজের পক্ষ থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানা ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানায় যোগাযোগ করা হয়। এসময় দুই থানার ওসি কে এম শাহীন মণ্ডল ও হারুন-উর-রশীদের সঙ্গে কথা বলে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানার ওসি হারুন-উর-রশীদ জাগো নিউজকে জানান, নিহতের পরিবার হানিফ পরিবহনের স্টাফ জনিকে ঘটনাস্থলে নিয়ে এসেছিল। তিনি নিশ্চিত করে পুলিশকে জানান, ঘটনার দিন ভোররাত সাড়ে ৪টায় বাসটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মদনপুর ক্যাসেল হোটেলের সামনে যানজটে পড়ে। তখন টয়লেটের প্রয়োজনে পায়েল বাস থেকে নামেন।

কিন্তু এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার ওসি কে এম শাহীন মণ্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ‘পায়েল নারায়ণগঞ্জে নামেইনি’।

সেসময় মোস্তাফিজুর রহমান নামে এক পুলিশ পরিদর্শকের বরাত দিয়ে ওসি জানান, পায়েল যে জায়গায় নেমেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করছে, সেটি কোনো বাসস্টপেজ নয়। আশপাশের অনেকের সঙ্গে কথা বলে ওই দিন রাতে গাড়ি থেকে কেউ নেমেছে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

ওসি কে এম শাহীন মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখেছি, ওই দিন রাতে আমার থানা এলাকায় নিহত পায়েল নামেননি। আর যেখানে তার মরদেহ পাওয়া গেছে তা আমার থানা থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। যতদূর জেনেছি ছেলেটি কুমিল্লার দিকে নেমেছে হয়তো।’

স্বাভাবিক ভাবেই ‘বাস থেকে নেমেছিল কোথায় পায়েল?’ জাগো নিউজের তোলা এই প্রশ্নে উত্তর সন্ধানে নামে মুন্সিগঞ্জের পুলিশ। শেষ পর্যন্ত সেই সূত্রেই উত্তর মেলে পায়েল হত্যার রহস্যের।

এমবিআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :