যে চাকরি দেয়ার ব্যবস্থা করে দিল তাকেই হত্যা করল কফিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪৮ পিএম, ১৯ মে ২০১৯
হত্যার কাজে ব্যবহৃত উদ্ধার হওয়া আলামত

এলিট ফোর্সের সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন শামীম। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেয়ার কথা বলে ২০১৮ সালে কুড়িগ্রামের কফিলকে ঢাকায় নিয়ে আসেন শামীম। রাজধানীর বাড্ডার সুবাস্তু টাওয়ার এলাকায় শামীমের বাসাতেই থাকতেন কফিল। চাকরি হবার পর অন্য বাসায় ওঠেন তিনি। পরে তার বিয়ের প্রস্তাব আসে। কিন্তু কফিলের স্বভাব-চরিত্র খারাপ ও পারিবারিক অসচ্ছলতার কথা মেয়েপক্ষকে জানিয়ে দেন শামীম। এতে কফিলের বিয়ে ভেঙে যায়।

শামীমের কাছে ২ হাজার টাকাও পেতেন কফিল। ওই টাকা না পাওয়ায় এবং বিয়ে ভেঙে দেয়ায় প্রতিশোধ দিতে শামীমকে হত্যা করেন কফিল।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে শামীমকে হত্যার দায় স্বীকার করে তিনি। তার স্বীকারোক্তির জের ধরে হত্যার কাজে ব্যবহৃত আলামত জব্দ করে পুলিশ। গত ১৭ মে সোপর্দ করা হলে শামীমকে হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দেন কফিল।

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি ভোরে বারিধারার জে-ব্লকের যমুনা ব্যাংকের বুথে ডিউটি করছিলেন শামীম। এ সময় ইউসিবি ব্যাংকের বুথের ডিউটি ছেড়ে শামীমের কাছে যান কফিল। এ সময় তার সঙ্গে হাতুড়ি ছিল। তিনি যমুনা ব্যাংকের বুথে ঘুমন্ত শামীমের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। এতে মৃত্যু হয় শামীমের। এরপর কফিল যমুনা ব্যাংকের ভেতরের ক্যামেরা ভেঙে বুথ থেকে বেরিয়ে যায়।

ঘটনার পর নিহতের বাবা নজরুল ইসলাম (৪৭) বাদী হয়ে ভাটারা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ৩০।

মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, নিহত শামীম (২২) এলিট ফোর্স সিকিউরিটি কোম্পানিতে প্রায় ৬-৭ বছর যাবৎ সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে চাকরি করছিলেন। ভাটারার ২৬, প্রগতি সরণি, বারিধারায় জে-ব্লকের যমুনা ব্যাংকের এটিএম বুথে প্রহরী হিসেবে চাকরি করতেন। ২১ জানুয়ারি সকালে জানতে পারেন, অজ্ঞাতরা শামীমকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করে লাশ ফেলে যান।

দায়েরকৃত মামলা প্রথমে ভাটারা থানা পুলিশ, এরপর ডিবি উত্তরের টিম তদন্ত করে। পরে গত ৩ এপ্রিল মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ন্যস্ত হবার পর তদন্ত করে আসছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (দক্ষিণ) এসআই পুলক সরকার।

killing

পিবিআই ঢাকা মেট্রো (দক্ষিণ) পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন জানান, মামলার তদন্তে প্রযুক্তির ব্যবহার, সোর্স নিয়োগ ও ওই এটিএম বুথের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শেষে গত ১৫ মে কফিলকে কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ি থানার পূর্বধনিরাম গ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়।

আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে কফিল জানান, তিনি ও শামীম সম্পর্কে প্রতিবেশী ভাই। শামীম এলিট ফোর্সে চাকরি দেয়ার কথা বলে ২০১৮ সালে তাকে ঢাকা নিয়ে আসেন। শামীমের বাসাতেই উঠেছিলেন তিনি। কফিল এলিট ফোর্সে প্রহরীর চাকরি নিয়ে ভাটারা এলিট ফোর্সের মেসে থাকা শুরু করেন। সেখানে সাবিনা নামে এক নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সাবিনা কিছুদিন পর তার সঙ্গে তার ছোট বোন শাহানাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে রাজি হন তিনি। পরে তার সম্পর্কে খোঁজ নিতে সাবিনা স্বামীকে নিয়ে কুড়িগ্রামে যান।

ঢাকায় ফেরার পর বিয়ের খবর শুনে শামীম সাবিনাকে জানান, কফিলের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ, বাড়িঘর এমনকি তার স্বভাব-চরিত্র ভালো না। কফিলের সঙ্গে বিয়ে দিলে তার বোন সুখী হবেন না। শামীমের কথায় কফিলের বিয়ে ভেঙে যায়। এ জন্য কফিল শামীমের ওপর ক্ষুব্দ হন। শামীমের কাছে কফিলের দুই হাজার টাকা পাওনা থাকলেও তা না দিয়ে ঘুরাতে থাকেন শামীম। এ ছাড়া তিনি কফিলের ব্যক্তিগত তথ্য এলিট ফোর্সের সিকিউরিটি ইনচার্জকে জানিয়ে দেন। এতে প্রতিশোধ নিতে শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন কফিল।

কফিল জানিয়েছেন, ঘটনার ২-৩ দিন আগে তিনি নতুন বাজার থেকে হাতুড়ি, সাদা প্যান্ট, সোয়েটার (জ্যাকেট) এবং মুখোশ কেনেন। ২০ জানুয়ারি দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত গুলশান-২ গোল চত্বরের সামনে ইউসিবি বুথে ডিউটি করেন। ওইদিনই শামীমকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিনি ইউসিবি বুথে ডিউটিতে যাওয়ার সময় ব্যাগে করে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাতুড়ি, পরিহিত পোশাক এবং মুখোশ সঙ্গে করে নিয়ে যান। রাত ১০টায় গুলশানের ডিউটি শেষ করে ভাটারা বারিধারার জে-ব্লকের ইউসিবি বুথে যান। শামীমও একই এলাকার যমুনা ব্যাংকে বুথে ডিউটিতে যান। রাতে ঘুমিয়ে ভোরে ওঠেন তিনি। পরিকল্পনামাফিক এটিএম বুথের ছাদে রাখা ব্যাগ নিয়ে পোশাক পরিবর্তন, হাতুড়ি ও মুখোশ নিয়ে বের হন। যমুনা ব্যাংকের বুথে গিয়ে ঘুমন্ত শামীমের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে হত্যা নিশ্চিত করেন। পরে বুথের ক্যামেরা ভেঙে পালিয়ে যান।

পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন জানান, পরবর্তীতে কফিল নিহতদের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করেন। লাশ ঢাকা থেকে কুড়িগ্রামে নিয়ে যাওয়া, দাফন করাসহ সবকিছুতে পরিবারকে সহযোগিতা করেন। হত্যাকাণ্ডের পর এলিট ফোর্সের চাকরি ছেড়েও দিয়েছিলেন তিনি।

জেইউ/এসআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :