ঈদের কেনাকাটা : কোথাও ক্রেতা বেশি, কোথাও কম

আবু সালেহ সায়াদাত
আবু সালেহ সায়াদাত আবু সালেহ সায়াদাত , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১৭ পিএম, ২১ মে ২০১৯

রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ শপিংমল বসুন্ধরা সিটি। মূল গেট দিয়ে ঢোকার পথে নিরাপত্তাকর্মীদের তল্লাশি শেষে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল ঈদের কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতা-দর্শনার্থীদের বেশ ভিড়। তবে ১৫তম রোজায় ঈদের কেনাকাটা ঠিক যেমনটা জমে ওঠার কথা এখনও সেভাবে জমে ওঠেনি।

এক জায়গায় সব কেনাকাটা করতে রাজধানীবাসীর কাছে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত শপিং মলগুলোর একটি এই শপিং মল। বছরজুড়েই এখানে ক্রেতাদের ভিড় থাকে। আর ঈদের সময় প্রতিবার ঈদের কেনাকাটায় আরও জমজমাট হয়ে ওঠে শপিং মলটিতে। প্রবল ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকেও মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যায় ক্রেতা দর্শনার্থীরা। তবে এবার অর্থাৎ ১৫ রমজানে এসেও এই দৃশ্য কিছুটা ভিন্ন। অন্যান্য বারের মতো তেমন একটা ক্রেতাদের ভিড় নেই শপিং মলটিতে। আবার কিছু কিছু শোরুম-দোকানে রয়েছে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। পুরো বসুন্ধরা শপিং মল ঘুরে দেখা যায়- কোথাও ক্রেতা বেশি, কোথাও কম।

ভেতরে ঢোকার পথেই দেখা গেল মূল গেটের বাইরে সারি বেঁধে বসে আছেন ঈদের কেনাকাটা করতে আসে ক্রেতারা, সবার সঙ্গেই আছে বিভিন্ন পণ্যের একাধিক বাহারি সব প্যাকেট-ব্যাগ। বুঝতে বাকি রইলো না, তারা ঈদের শপিং শেষে মলের বাইরের সিঁড়িতে বসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিচ্ছেন।

বসুন্ধরা সিটির বেজমেন্ট থেকে শুরু করে লেভেল ৭ পর্যন্ত সারি সারি দোকান সাজানো হরেক রকম পণ্যে। মেয়েদের পোশাক, শাড়ি, বোরকা, জুতা-স্যান্ডেল, প্রসাধনী, গয়না, চশমা, ঘড়ি, মোবাইল ফোন, বাচ্চাদের খেলনা, শো-পিস, গৃহস্থালী সামগ্রীসহ আরও কত কিছু। নামীদামি ব্র্যান্ড থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা সব ধরনের পণ্য বিক্রি হচ্ছে এখানে। আর আট তলার ফুড কোর্ট ও সিনেপ্লেক্সও এই মার্কেটটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

eid

ঈদ উপলক্ষে শপিং মলটির সব দোকানই সেজেছে ঈদের আমাজে। সবাই নিজের দোকানের জন্য রেখেছে লেটেস্ট কালেকশনগুলো, নিত্যনতুন বাহারি সব পণ্য থরে থেরে সাজানো আছে এখানকার দোকানগুলোতে। বসুন্ধরা সিটির বিভিন্ন ফ্লোর ঘুরে দেখা গেছে- ইজি, দর্জিবাড়ি, ম্যানস ওয়ার্ড, জেন্টেল পার্ক, রিচ ম্যান, লুবনান, প্লাস পয়েন্ট, এক্সটেসি, ইয়োলো, ইনফিনিটি, দেশি দশ ওয়েস্টিশ, আড়ং, ফ্রিল্যান্ডসহ ব্র্যান্ডের দোকানগুলোতেই ক্রেতের সবচেয়ে বেশি ভিড় ছিল। শো-রুম গুলোতে ক্রেতেদের উপস্থিতিতে বিক্রেতাদের দম নেয়ার সময় নেই। এই দোকান বা শো-রুমগুলোতে ক্রেতাদের যেমন ভিড় তেমনি ভিড় ছিল দর্শনার্থী বা বিভিন্ন পণ্যের দাম যাচাই করতে আসা মানুষেরও ভিড় ছিল বেশ।

অপরদিকে ৩য় ও ৪র্থ তলায় আছে বাহারি সব পোশাক, নারীদের নামীদামি সব ড্রেস পাওয়া যাচ্ছে এখানে। দোকানের ভেতরে থরে থরে সাজানো আছে নানা ডিজানেইর মনকাড়া সব ড্রেস। আর বাইরে ডলে পরিয়ে ডিসপ্লে করা হয়েছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ড্রেসগুলো। এছাড়াও দোকানগুলোর সামনে যেতেই বিক্রেতাদের চিরচেনা হাক-ডাক। দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে গারারা বা সারারা-গারারা, ফ্লোর টাস, গাউন, লং ফর্গ, বিভিন্ন ধরনের নামীদামি সব শাড়ি। অথচ এই দোকানের ঈদের কেনাকাটা তেমন একটা জমে ওঠেনি। নেই ক্রেতাদের ভিড়।

১৫ রমজান চলছে, তারপরেও কেন এখনও কেনাকাটা জমে ওঠেনি- তা জানতে কথা হয় এখানকার দোকানি, কর্মচারি, ক্রেতা, দর্শনার্থীদের সঙ্গে। আলাপকালে তারা জানালেন এর কারণ।

এস ফ্যাশন দোকানের দায়িত্বে থাকা সেলস অ্যাসোসিয়েট দিপু আহমেদ বলেন, পুরো বসুন্ধরা সিটিতে মেয়েদের ড্রেস-শাড়ির প্রচুর দোকান। অথচ আজ ১৫ রোজা চলছে এখনও আমাদের ঈদের বেচা বিক্রি জমে ওঠেনি। গারারা বা সারারা-গারারা, ফ্লোর টাস, গাউন, লং ফর্গসহ মেয়েদের প্রচুর ড্রেস আমাদের কালেকশনে আছে। এসবের দাম ৪ হাজার থেকে ২২ হাজার বা তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করছি।

তিনি বলেন, মানুষ আসলে এখন দামি ড্রেস কেনাকাটা করতে ইন্ডিয়ায় বেশি যাচ্ছে, সেখানে হয়তোবা তুলনামূলক কম দামে কিনতে পারছে যে কারণে ঈদের কেনাকাটার পাশাপাশি ঘুরেও আসতে পারছে। তাই আমাদের দামি ড্রেস বিক্রি কিছুটা কমে গেছে। এছাড়া অনলাইনেও ইদানিং অনেকে কেনাকাটা করে ফলে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলের অন্য দোকানগুলোতে বেশি ভিড় থাকলেও মেয়েদের ড্রেস-শাড়ির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় নেই।

eid

দিল্লি ফ্যাশন, মুনা কালেকশনসহ বেশকয়টি দোকান ঘুরে দেখা গেল একই দৃশ্য। ‘শাড়ি সেন্টার’ এর দায়িত্বরত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ১৫ রমজানেও এত কম কাস্টমারের আনাগোনা এর আগে কখনই হয়নি। এ ইসময় যথেষ্ট জাঁকজমক থাকা উচিত ছিল এসব দোকানগুলো অথচ তেমন ক্রেতা নেই। এমনও হয়েছে বেচা-বিক্রি ভালো না থাকায় অনেকে বিক্রয় কর্মীদের ছুটি দিয়ে দিয়েছে। এখন অনেকেই ভারত গিয়ে শপিং করে নিয়ে আসে। আমারা ভালো কোয়ালিটির শাড়ি বিক্রি করি, কিন্তু এবার তেমন ক্রেতা পাচ্ছি না। আমাদের এখানে এবার কালেকশনে রেখেছি চেন্নাই কাতান, গুজরাটি কাতানসহ নামীদামি সব শাড়ি। এগুলো ১০ হাজার টাকা থেকে ৩৫/ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ক্রেতার এখনও বেতন-বোনাস পায়নি, তারা বেতন-বোনাস পেলে হয়তোবা ঈদের আগে জমজমাট হবে বেচা-বিক্রি।

সানজিদা তাসলিম নামের একজন ক্রেতা দুই বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বসুন্ধরা শপিং মলে। তিনি বলেন, আসলে কালেকশনগুলো ঘুরে দেখতে এসেছি। এখানে অনেক দাম, তবে ভালো কালেকশন আছে। মূলত সাধারণ ক্রেতারা শাড়ি, ড্রেস বাইরের দোকান থেকেই বেশি কেনে। এখান থেকে মূলত উচ্চবিত্ত বা বিয়ের বাজার মানুষ বেশি করে। এছাড়া অনেকেই আছে যারা নিজেরাই ভারত বা কলকাতা থেকে শপিং করে ঈদের সময় পাশাপাশি এখন অনলাইন শপেও লেটেস্ট সব কালেকশন পাওয়া যায়। যে কারণে হয়তোবা এখানে শাড়ি- ড্রেস তুলনামূলক কম বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, তবে বসুন্ধরায় অন্যান্য সব শো-রুম বা দোকানে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় রয়েছে, গহনা, অর্নামেন্ট, প্রসাধনীও প্রচুর বিক্রি হচ্ছে এখানে আসন্ন ঈদ উপলক্ষে।

মূলত এক ছাদের নিচে নামীদামি সব ব্র্যান্ড, বুটিক হাউস এবং অন্যসব অনুসঙ্গ এক সঙ্গে পাওয়ার কারণে বরাবরের মতো এবারও বসুন্ধরা সিটি মার্কেটে ক্রেতার ভিড় লক্ষ্যণীয়। ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে পছন্দের সব পণ্য দেখছেন এবং মান, দামে মিলে গেলে কিনে ফেলছেন। আর যে কোনো পোশাকের লেটেস্ট কালেশনের কথা এলে এই মার্কেটিতে আগে পাওয়া যায় বলে সবার একটি ধারণা আছে সে কারণে ঈদ বাজারে ক্রেতা-আগ্রহ আর হাল ফ্যাশন বিবেচনায় রেখে প্রতিটি দোকান সেজেছে নতুন সাজে, আছে লেটেস্ট সব কালেকশনগুলো।

যেসব দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় রয়েছে। এমন এক পাঞ্জাবির দোকানি হাবিবুর রহমান বলেন, অনেক রকমের পাঞ্জারির কালেকশন আছে আমাদের। ক্রেতাদের ভিড়ও রয়েছে প্রচুর। এর মধ্যে কটন ফ্রেব্রিক্স, কটন সিল্ক, তসর লিলেনের পাঞ্জারি বেশি চলছে। এগুলো দুই হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ছেলেদের শার্ট, প্যান্টও অন্যান্য দোকানে প্রচুর বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে ৫ তলায় জুয়েলারি, অর্নামেন্ট, চশমার দোকানগুলো অল্প সংখ্যা ক্রেতাদের আনাগোনা ছিল। তবে ৬ষ্ঠ ও ৭ম তলায় জুতার দোকানগুলোর মধ্যে বে, রিসেন্ট সু, বিউটি সু, এপেক্স ও বাটার শো-রুমে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল বেশ। ৭ম তলায় ইনফিনেটি, দেশি দশ, ইস্টাসিরসহ অন্যান্য শো-রুমগুলোতে নিত্য নতুন, বাহারি সব কালেকশন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে নানা পণ্য দেখছেন, আবার অনেকে সেরেই নিচ্ছেন কেনাকাটা।

অন্যদিকে ৮ম তলায় সিনে কমেপ্লেক্সে তেমন একটা ভিড় না থাকলেও পুরো অষ্টম তলায় ইফতারের সময় যেন মানুষের পা ফেলার জায়গাটুকুও থাকছে না। দেশি-বিদেশি সব খাবারের স্বাদ পেতে ইফতারির সময় ভিড় করছেন বসুন্ধরা শপিং মলে কেনাকাটা করতে আসে মানুষরা। সেখানকার খাবারের দোকানগুলোর মধ্যে হ্যালো, ঢাকাইয়া, বিএফসি, শর্মা হাউজ, ইন্ডিয়ান স্পাইসি দোকানগুলো ঘুরে জানা গেল, ইফতারির সময় না-কি এমন পরিস্থিতি হয় যে বসার চেয়ারগুলো সব পরিপূর্ণ হয়ে কাস্টমাররা ফ্লোরেও বসে পড়েন। আর সেখানে অতিরিক্ত কাস্টমারদের জন্য রাখা আছে পাটি-মাদুরসহ বসার নানা ব্যবস্থা।

সেখানকার দোকারিরা জানান, ইফতারের সময় দেশি-বিদেশি নানা খাবারের আয়োজন থাকে তাদের। এছাড়া রয়েছে ইফতারির নানা প্যাকেজ। প্যাকেজগুলোর মধ্যে ২০০ থেকে ৫০০ টাকার প্যাকেজগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

এএস/এমবিআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :