শর্ত ভেঙে ‘অযোগ্য’ প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিচ্ছে গণপূর্ত

আদনান রহমান
আদনান রহমান আদনান রহমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৪১ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯
দরপত্রের শর্ত ভেঙে একটি অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে সরকারি দুটি ভবনে ৬৮টি লিফট স্থাপনের কাজ দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর একটি মতিঝিলের এজিবি কলোনি। ছবি-বিপ্লব দীক্ষিত

দরপত্রের শর্ত ভেঙে সরকারি ভবনে ৬৮টি লিফট স্থাপনের কাজ রওশন এলিভেটরসকে দিতে যাচ্ছে গণপূর্ত অধিদফতর। চারটি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিলেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হওয়া প্রতিষ্ঠানকেই ‘যোগ্য’ হিসেবে বিবেচনা করেছে তারা। দরপত্রের নথি ও গণপূর্তের বিধি-বিধান যাচাই করে শর্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি জানা গেছে।

গত ৭ আগস্ট মতিঝিলের এজিবি কলোনি ও আজিমপুর সরকারি কলোনিতে মোট ৬৮টি লিফট স্থাপনের জন্য দরপত্রটি আহ্বান করে গণপূর্ত অধিদফতর। এর মধ্যে ১৫টি বসবে মতিঝিলে ও ৫৩টি আজিমপুরে। ই-জিপি, সিপিটিইউ (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট), গণপূর্তের ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে আহ্বান করা হয় দরপত্রটি।

৬৮টি লিফটের দরপত্র মোট ১২টি লটে আহ্বান করা হয়। এতে অংশ নেয় ড্যাফোডিল ইলেকট্রনিক্স, হরিজন টেকনোলজিস, রওশন এলিভেটরস এবং প্রোপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। সবকটি লটে একমাত্র রওশন এলিভেটরসই সর্বনিম্ন দর দিয়েছে।

তবে দরপত্রের নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, দরপত্রে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১৭টি শর্ত জুড়ে দিয়েছিল অধিদফতর। লিফট কোম্পানির উৎপাদন অভিজ্ঞতা (ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সপ্রেরিয়েন্স) কমপক্ষে ২০ বছর থাকা, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের লিফটের ট্র্যাকশন মেশিন, কন্ট্রোলার, কেবিন ডোর ড্রাইভের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ (মেজর কম্পোনেন্টস) তাদের নিজস্ব কোম্পানিতে তৈরি করা, প্রস্তাবিত লিফটসমূহ অবশ্যই একটি মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান যেমন-টিইউভি/ডিএনভি থেকে সার্টিফাই হওয়া এবং সেসব সার্টিফিকেশন ম্যানুফ্যাকচারিং কান্ট্রির ফরেন মিনিস্ট্রির/মিনিস্ট্রি অব কমার্স/চেম্বার অব কমার্স দ্বারা অথেনটিকেট করানো থাকতে হবে। তবে রওশনের ইতালীয় লিফট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এগুলোর কোনটি পূরণ করতে পারেনি। প্রতিষ্ঠানটির টিইউভি/ডিএনভি সার্টিফিকেটের সঠিকতা যাচাই না করেই তাদের দরপত্রকে প্রাথমিকভাবে রেসপনসিভ করা হয়েছে যা বিধির লঙ্ঘন।

রওশন এলিভেটরসের ইতালীয় লিফট সরবারহকারী প্রতিষ্ঠান ‘মোভিলিফট’ এর ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০০৫ থেকে তারা লিফটের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ (মেজর কম্পোনেন্টস) তৈরি করা শুরু করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বয়স ১৯ বছর। মোভিলিফটের ওয়েবসাইটে কমপ্লিট লিফট ম্যানুফ্যাকচারিং-ডিজাইনিংয়ের কোনো টিইউভি সার্টিফিকেট পাওয়া যায়নি। সুতরাং, তাদের দরপত্রে অংশ নেয়ার কতটুকু যোগ্যতা রয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অথচ এই মোভিলিফটকে ২০১৮ সালেই সরবরাহকারী ব্র্যান্ড হিসেবে তালিকাভুক্ত করে গণপূর্ত অধিদফতর। ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে কীভাবে একটি প্রতিষ্ঠানকে গণপূর্তে তালিকাভুক্ত করা হলো এ বিষয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।

জানা গেছে, গণপূর্তের দেয়া রেট সিডিউল থেকে রওশন এলিভেটরস প্রায় ১৯ শতাংশ ডিসকাউন্ট দিয়ে দরপত্র দাখিল করেছে যা অস্বাভাবিক। গণপূর্তের বেঁধে দেয়া রেটের চেয়ে প্রায় ১৯ শতাংশ কম দামে মানসম্মত লিফট স্থাপন করা সম্ভব কি-না তা নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। এর ফলে সরকারি টাকা এবং প্রকল্পটি বিনষ্টের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

ইতোমধ্যে শর্ত ভেঙে রওশন এলিভেটরসের দরপত্রে অংশগ্রহণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে দরপত্রে অংশ নেয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো। অভিযোগের ভিত্তিতে রওশন ও মোভিলিফটের বিষয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্তের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

গণপূর্ত অধিদফতরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ইএম জোন-ঢাকা) আবদুল মজিদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘তারা সর্বনিম্ন টেন্ডারার। তাই তাদের প্রাথমিকভাবে কাজ করার জন্য বাছাই করা হয়েছে। তবে তাদের অভিজ্ঞতার বিষয়ে কিছু প্রশ্ন উঠেছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ এসব যাচাই-বাছাই করছে। যদি তাদের দেয়া তথ্যে কোনো অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে তারা চূড়ান্ত কার্যাদেশ পাবে না। প্রয়োজনে নতুন করে সিডিউল করে আবার রিটেন্ডার আহ্বান করা হবে।’

রওশন এলিভেটরসের ত্রুটিপূর্ণ দরপত্র আহ্বানের বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী নিয়াজ তানভীর জাগো নিউজকে বলেন, ‘তারা সর্বনিম্ন বিড করেছে, এর মানে এই না যে তারা কাজ পেয়ে গেছে। তাদের আমরা কাজ দিয়ে দেইনি।’

তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত কার্যাদেশের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি রয়েছে। তারা অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখছে। আমরা ওই প্রতিষ্ঠানটির কাছে ই-মেইলে তথ্য চেয়েছি। তারা কিছু তথ্য দিয়েছে, আরও কিছু তথ্য দেবে। তবে তাদের দেয়া তথ্য যদি ঠিক না হয়, অসঙ্গতি থাকে সেকেন্ড লোয়েস্ট বিডারকে (দ্বিতীয় সর্বনিম্ন) কাজ করার জন্য নির্ধারণ করা হবে।’

গণপূর্ত অধিদফতরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী তৈমুর আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে টেন্ডারের মাধ্যমে তারা কাজটি করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে আমরা তাদের সব ধরনের কাগজ যাচাই-বাছাই করছি। তাদের কাগজপত্রে যদি কোনো ধরনের ল্যাকিংস (ঘাটতি) থাকে তাহলে তাদের চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেয়া যাবে না।’

এআর/এসআর/পিআর