দুই সন্তানসহ মায়ের মৃত্যু : ময়নাতদন্তেই আটকা মামলার প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৭ এএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯

রাজধানীর উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার একটি বাসার দরজা ভেঙে মাসহ দুই সন্তানের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার চার মাস অতিবাহিত হলেও চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি পুলিশ। তবে থানা পুলিশ বলছে, সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন।

গত ১২ মে রাতে রাজধানীর উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকায় ৩৪/বি বাসার একটি ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে একটি ঘর থেকে মা জাহানারা বেগম মুক্তা (৪৮), ছেলে কাজী মুহিব হাসান রশ্মি (২৮) ও মেয়ে আফিয়া সুলতানা মিমের (২০) গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হয় একটি রক্তমাখা বঁটি, রক্তমাখা কাপড় ও তাদের ব্যবহৃত মোবাইলফোন।

ঘটনার পর নিহত মুহিব হাসানের মামা মনিরুল হক বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তিনটি মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে প্রাথমিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ জানায়, মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধে এবং ছেলেকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে।

পরিবার ও থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অসচ্ছল পারিবারিক অবস্থার ওপর বোঝা ছিল বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যুবতী মেয়ে। ঘরে রেখে বাইরে যাওয়া বিড়ম্বনা, যাকে আবার বাইরে নিয়ে যাওয়াও বিড়ম্বনার। আর্থিক টানাপড়েনের মধ্যে স্বামীর অকাল মৃত্যু পারিবারিক সমস্যাকে তরান্বিত করছিল। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন মা জাহানারা বেগম মুক্তা (৪৮)। সব অশান্তির যবনিকা টানতেই দুই সন্তানকে হত্যার পাশাপাশি নিজেও আত্মহত্যা করেন

থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নিহত জাহানারা বেগমের স্বামীর নাম ইকবাল হোসেন। তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবের জগন্নাথপুর উত্তরপাড়া এলাকায়। নিহত জাহানারার স্বামী ইকবাল হোসেন বিআরডিবি অফিসের ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মস্থল মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় হলেও পরিবার নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বসবাস করতেন।

২০১৬ সালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান ইকবাল। এরপর পথে বসার দশা হয় পরিবারটির। কিছুদিন পর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে ঢাকার উত্তরখানের ময়নারটেক এলাকার ৩৪/বি বাসার ওই ফ্ল্যাটে ভাড়া উঠেছিলেন। ওই বাসা থেকেই তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ বিষয়ে উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হেলাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের তদন্ত মোটামুটি শেষ। এখন এক্সপার্ট অপিনিয়নের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্ট ও ময়নাতদন্তের বিস্তারিত প্রতিবেদন হাতে পেলেই আমরা মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করব।’

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিআইডির রাসায়নিক পরীক্ষাগারের প্রধান পরীক্ষক ড. দিলীপ কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছেলে ও মেয়ের শরীরে ডায়াজিপাম নামক ঘুমের ওষুধের আলামত পাওয়া গেছে। ডায়াজিপাম হচ্ছে বিশেষ শ্রেণির বেঞ্জোডায়াজেপিন গোত্রের ওষুধ, যা সচরাচর ঘুমের ওষুধ হিসেবে পরিচিত।’

তিনি বলেন, দুই সন্তানের শরীরে ডায়াপিজামের আলামত মিললেও মায়ের শরীরে কীটনাশকের আলামত মিলেছে। আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট পাঠিয়েছি।

সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আত্মহত্যার আগে মা জাহানারা বেগম ছেলেকে ও মেয়েকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান। এরপর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করে নিজে কীটনাশক পানে আত্মহত্যা করেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এখনো সিআইডির কাছ থেকে ভিসেরা রিপোর্ট পাইনি। ভিসেরা রিপোর্ট হাতে পেলে আমরা একটা উপসংহারে যেতে পারব যে কার মৃত্যু কখন ও কীভাবে হয়েছে এবং কে আগে ও কে পরে মারা গেছে।’

জেইউ/এসআর/পিআর