‘আমি দুদক পরিচালক বলছি, আপনার নামে দুর্নীতির মামলা হচ্ছে’

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১৮ পিএম, ১২ অক্টোবর ২০১৯

‘জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দাখিল হয়েছে। সেটা আমরা তদন্ত করছি। বেশকিছু কাজে ত্রুটি পেয়েছি। সে জন্য আপনার বিরুদ্ধে দুদক আইনে মামলা হচ্ছে।’

এমন কথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার দশা হয় গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের (ছদ্মনাম ও পরিচয়)। নিজের অজান্তে ভুল-ত্রুটি হতে পারে ভেবে ম্যানেজের চেষ্টা করেন। ক্ষুদেবার্তায় আসে বিকাশ নম্বর। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে ঘুষের টাকা লেনদেন হয়। ঝামেলাও যেন চুকে যায়! কিন্তু পরে উঠে আসে ভুয়া দুদক কর্মকর্তার খপ্পরে পড়ে লাখ টাকা খুইয়েছেন তিনি।

দুদকের কর্মকর্তা পরিচয়ে বেশ কয়েকটি চক্র সরকারি-বেসরকারি দফতরের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ফোন করে এভাবেই ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সম্প্রতি কয়েকজনের দাখিল করা অভিযোগ ও থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরির সূত্রধরে তদন্ত করে আসছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ।

সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মীর মোদাচ্ছের হোসেন এবং এডিসি মাহমুদা আফরোজা লাকীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে শুটিং ইনসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের সহকারী কমিশনার আশরাফ উল্লাহ শুক্রবার রাতে রাজধানীর কামরাঙ্গীচর থানাধীন ঝাউলাহাটি খন্দকার গলির মাসুদ আলম খলিফার বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে দুজনকে গ্রেফতার করেন।

তারা হলেন- কাজী ওমর ফারুক (৫১) ও মো. আনিছুর রহমান ওরফে বাবুল মিয়া (৩৫)। দুজনের বাড়িই মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায়। গ্রেফতারকালে তাদের কাছ থেকে ১০টি মোবাইলফোন, ২৪টি সিম, টেলিফোন নির্দেশিকা ও ফোন ডাইরেক্টরিসহ ১১টি বই উদ্ধার করা হয়।

শুটিং ইনসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের সহকারী কমিশনার আশরাফ উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, প্রতারক কাজী ওমর ফারুক এবং আনিছুর রহমান সাত-আট বছর ধরে এভাবেই প্রতারণা করে আসছিলেন। কাজী ওমর ফারুক সম্পর্কে দুদককে অবহিত করা হলে জানা যায়, ওমর ফারুক দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের প্রতারণা করে আসছিলেন, যা দুদকও জানে। ওমর ফারুক দুদক কর্মকর্তার পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে বিকাশে টাকা নেয়া চক্রের মূলহোতা। ইতোপূর্বে তাকে গ্রেফতারের জন্য অনেকবার চেষ্টাও করা হয়।

সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রথমে টেলিফোন ডাইরেক্টরি থেকে শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত, এলজিইডিসহ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তাদের টেলিফোন ও মোবাইলফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে যোগাযোগ করেন। কাঙ্ক্ষিত কর্মকর্তাকে ফোনে করে কাজী ওমর ফারুক জানান, ‘আমি দুদকের পরিচালক। কখনো বা নিজেকে উপ-পরিচালক মো. মাহবুবুর রহমান বা মোশাররফ হোসেন অথবা সিরাজুল ইসলাম কখনো হাবিবুর রহমান ও ইফতেখার হিসেবেও পরিচয় দেন।’

কথিত দুদক কর্মকর্তা টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে নাম ধরে বলেন, আপনার বিরুদ্ধে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে তদন্তের জন্য আমাদের পাঠানো হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ভুলক্রটি পাওয়া গেছে।

তখন পরিচালক বা উপ-পরিচালক পরিচয়দানকারী কাজী ওমর ফারুক তার সহকারী আনিছুর রহমান ওরফে বাবুলকে ফোন হস্তান্তর করার সময় বলেন, আপনি তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলুন।

তদন্তকারী কর্মকর্তার পরিচয়দানকারী আনিছুর রহমান ওরফে বাবুল অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিকে তদন্তে পাওয়া ভুলক্রটির জন্য মামলা হবে বলে জানান।

টার্গেটকৃত ব্যক্তি মামলা না করে অভিযোগ সমাধানের প্রস্তাব দেন। এ সুযোগে তারা একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাতে বলেন। এভাবেই ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার মীর মোদাচ্ছের হোসেন বলেন, গ্রেফতার কাজী ওমর ফারুক ও আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে কামরাঙ্গীচর থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ২৪(২) ও ৩০(২) ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলা নং ২০। ওই মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ওই দুজনকে পাঁচদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। রিমান্ড মঞ্জুর হলে তাদের সঙ্গে আর কে বা কারা জড়িত সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

জেইউ/বিএ/জেআইএম