পেঁয়াজের পাইকারি দোকানে আঙুর-আপেল-কমলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫৩ পিএম, ০৮ নভেম্বর ২০১৯

দেশের বাজারে পাগলা ঘোড়ার মতো ছুটছে পেঁয়াজের দাম। কোনো পদক্ষেপেই পেঁয়াজের দাম কমানো যাচ্ছে না। পেঁয়াজের এমন অস্বাভাকি দামের প্রভাব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের যে স্থানে আগে একাধিক বিক্রেতা পাইকারিভাবে পেঁয়াজ বিক্রি করতেন এখন সেখানে বসছেন ফল বিক্রেতারা। পেঁয়াজের বদলে দোকাগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে আপেল, আঙুর, কমলা, নাট ফল, বেদানাসহ বিভিন্ন ফল।

ওই স্থানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরেই আড়তের সামনের রাস্তার ফুটপাতে স্থায়ী দোকান তুলে একাধিক ব্যবসায়ী পাইকারিতে পেঁয়াজ বিক্রি করেন। কিন্তু সম্প্রতি অস্বাভাবিক হারে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা দিনের বেলা আড়তে ভিতরে বসছেন। পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা আড়তের ভিতরে বসায়, স্থানটিতে দিনের বেলা বসছেন ফল ব্যবসায়ীরা। তবে সন্ধ্যার পর ওই স্থানে বসেন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা।

এ বিষয়ে আলিম নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, বাড়তি দামের কারণে এখানে পেঁয়াজের ব্যবসায়ীরা বসেন না। জয়গা ফাঁকা থাকায় আমরা এখানে ফল বিক্রি করছি। তবে সন্ধ্যার পরে এখানে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীদের পাবেন।

দিনের বেলা ফুটপাতের দোকানে পেঁয়াজ বিক্রি না করার কারণ জানতে চাইলে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী জামাল বলেন, দিনের বেলা ওখানে বসলে ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানা করে। তাই দিনের বেলা পেঁয়াজ নিয়ে ভিতরে বসেন ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যা হলে ফুটপাতের দোকানে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে।

bazar

পেঁয়াজ বিক্রি করলে জরিমানা করে, ফল বিক্রি করলে করে না? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পেঁয়াজের তো এখন অনেক দাম। পেঁয়াজ নিয়ে সবার জ্বালা। তাই পেঁয়াজ নিয়েই যত ঝামেলা। তাছাড়া এখানকার ফুটপাত তো ব্যবসায়ীদের জন্যই। তাই ব্যবসায়ীরা ফল বিক্রি করলে কেউ কিছু বলে না।

এদিকে গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ভারত রফতানি বন্ধের পর ১০০ টাকা কেজিতে পৌঁছায় পেঁয়াজ। এরপর আর একশ টাকার নিচে নামেনি এ নিত্য পণ্যটি। উল্টো সম্প্রতি দাম আরও বেড়ে এখন ১৩০-১৪০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

শুক্রবার কারওয়ান বাজারে পেঁয়াজের পাল্লা ৫৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি পেঁয়াজের দাম পড়ছে ১১২ টাকা। তবে রামপুরা, খিলগাঁও, মালিবাগ হাজিপাড়া এলাকার খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি ১২০-১৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়।

পেঁয়াজের দামের বিষয়ে রামপুরার ব্যবসায়ী খায়রুল হোসেন বলেন, পাইকারিতে গত সপ্তাহে পেঁয়াজের দাম নতুন করে বেড়েছে। যে কারণে আমরাও কিছুটা দাম বাড়িয়েছি। গত সপ্তাহে যে পেঁয়াজ ১২০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি, আজ তা ১৩০ টাকা কেজি বিক্রি করতে হচ্ছে। যেভাবে পেঁয়াজের দাম বড়ছে তাতে একদিন দুইশ টাকা হলেও আবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এদিকে পেঁয়াজের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের একটি অংশ তুলনামূলক কম দামে পেঁয়াজ কিনতে টিসিবির ট্রাক সেল পয়েন্টে ভিড় করছেন।

গত কয়েকদিন সচিবালয় ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় পেঁয়াজ কিনতে দুপুরের কড়া রোদের মধ্যে শত শত মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

bazar

খিলগাঁওয়ের বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, এক মাসের বেশি সময় ধরে পেঁয়াজের দাম ভোগাচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমে প্রায় দেখি মন্ত্রী বলছেন- শিগগির পেঁয়াজের দাম কমে যাবে। কিন্তু দিন যায়, সপ্তাহ যায় বাজারে তো পেঁয়াজের দাম কমে না। বরং উল্টো আরও বাড়ে। আর আমাদের এ অঞ্চলে তো টিসিবিও পেঁয়াজ বিক্রি করে না। ফলে বাধ্য হয়ে ১৩০ টাকা কেজি পেঁয়াজ কিনতে হচ্ছে।

এদিক পেঁয়াজের দাম নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করেছে কনসাস কনজুমার্স সোসাইটি (সিসিএস) নামের একটি সংগঠন। সংগঠনটির দাবি- পেঁয়াজের বাজারে কারসাজির মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০ কোটি টাকা করে গত চার মাসে ভোক্তাদের তিন হাজার ১৭৯ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। পেঁয়াজের সিন্ডিকেট যে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে তা দিয়ে দ্বিতীয় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।

সংগঠনটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কারসাজির মাধ্যমে দাম বাড়িয়ে জুলাই মাসে ৩৯৭ কোটি ৬৭ লাখ, আগস্টে ৪৯১ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার, সেপ্টেম্বরে ৮২৫ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার এবং অক্টোবরে ১ হাজার ৪৬৪ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ভোক্তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে কারসাজি চক্র।

সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, সম্প্রতি পেঁয়াজের খুচরা মূল্য ১২০-১৫০ টাকা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি এখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র মানুষের পক্ষে এখন পেঁয়াজ দুর্লভ পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমএএস/এএইচ/এমকেএইচ