জরিমানা করলেই ৫ হাজার, খামু কী?

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৩৩ পিএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

ফার্মগেট হয়ে আসাদগেট অভিমুখে যাচ্ছিল দ্বিতল বিআরটিসির একটি বাস। দুটি গেটই খোলা। সিটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যাত্রীদের। বাসটির বাইরের অংশে লেখা ‘ইহা রাষ্ট্রীয় সম্পদ, এর সংরক্ষণ করুন ও সেবা নিন’। কিন্তু বাসটির সামনে কিংবা পেছনে কোথাও নেমপ্লেট দেখা যায়নি। স্প্রিড ব্রেকার থাকার পরও সড়কে না থামিয়ে দু’জন যাত্রীকে চলন্ত অবস্থায় নামিয়ে চলে যায়। আবার পাশেই চলছিল বিআরটিএ-র ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সোমবার (১৮ নভেম্বর) ১ নভেম্বর কার্যকর হওয়া নতুন সড়ক পরিবহন আইনের প্রথম প্রয়োগ শুরু করেছে বিআরটিএ। এ উপলক্ষে রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় দুই লেনেই পৃথক দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত চলছিল। সোমবার দুপুর ২টা ২৪ মিনিটের দিকে মানিক মিয়া এভিনিউ সড়কে এ দৃশ্য দেখা যায়।

কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালতকে কোনো ব্যবস্থা নিতে না দেখে এগিয়ে আসেন গাবতলী-গুলিস্তান রুটে চলাচলকারী ৮ নম্বর বাসের মালিক নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া মেরাজ।

তিনি বলেন, ‘এই দেখেন সাংবাদিক সাব, আমার গাড়িতে নাকি ওভার লোড। যাত্রীও বেশি! সেজন্য মামলা দিয়েছে, আমার গাড়িতে নাকি ভাড়ার চার্ট নাই সেজন্যও মামলা দিছে। আমার ৪০টা গাড়ির মধ্যে চলছে ২৯টা। এর মধ্যে ৬টারে এমনে মামলা দিলো মোবাইল কোর্ট। অথচ দেখেন সরষের মধ্যে ভূত। বিআরটিসির এই বাসটির নম্বর প্লেট নাই, দুই গেটই খোলা, যাত্রীতে ঠাসা। বাহির থাইক্কাও দেহন যায়। কিন্তু ওইডা মোবাইল কোর্টের চোখে পড়বো না।’

ক্ষুব্ধ মেরাজ বলেন, ‘সরষের মধ্যে যদি ভূত থাকে তাহলে তাড়াবে কে? পরিস্থিতি যা, তাতে সরষের ভূত কেউ তাড়াইবো না। বরং যা যায় সব আমগো মতো মালিকের ওপর দিয়া। আমগো ব্যবসা করা আরও কঠিন হইয়া যাইতেছে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে মেরাজ বলেন, ‘হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে একলোক গিয়ে বলেছিল আমার ছেলে মিষ্টি বেশি খায়। মুহাম্মদ (সা.) সাতদিন পর আসতে বলেন। তিনি নিজে মিষ্টি খাওয়ানো কমিয়ে দিয়ে তারপর মিষ্টি খাওয়া কমানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। অথচ যে অথরিটি বা সরকার আমাদের ওপর আমাদের আইনটা চাপিয়ে দিছে আমরা মানবো। কিন্তু তাদের দুরবস্থা কেন? বিআরটিসির গাড়ির কাগজপত্র নেই, গেটে ৫০ জন ঝুলছে। গেট অলওয়েজ খোলা, চালকের লাইসেন্স না থাকলেও চালায়। আমাদের যদি না চলে তাহলে তাদের কেমনে চলে?

jagonews24

তিনি বলেন, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকার পর মালিকরা গাড়ি বসায় রাখছে। কারণ কি? দিনে পামু ১২শ’, কিন্তু জরিমানা করলেই সর্বনিম্ন ৫ হাজার, সে টাকা কই থেকে দিমু?’

পাশ থেকে ৮ নম্বর বাসের আরেক মালিক সানাউল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা অন্যায় করছি না। আমাদের সব ঠিক আছে। আমরা চালকদের এক বছর না হলে গাড়ি দিচ্ছি না। কিন্তু মধ্যম মানের লাইসেন্স করতে দিলে বিআরটিএ দেয় না। ভারী পরিবহনের চাইলে দেয় মধ্যম মানের লাইসেন্স। রিনিউ করতে দিলেও দেয় না। ঝুঁলে থাকে। তাহলে আমরা কোথায় যাব?’

বিকাশ পরিবহনের মালিক মজিবর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের লাইসেন্স না দিয়ে গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেয় কেন? আমরা কি জোর করে চাইছিলাম? দ্বৈতনীতি কেন? আমার বাসের এক গেইট খোলা থাকলেই মামলা আর বিআরটিসির দুই গেইট খোলা মামলা হয় না। সরষের মধ্যে ভূত কেন থাকবে। বিআরটিসি ওভারলোড যায়, ওটাও তো চার চাক্কার গাড়ি। আমার তো প্রমাণ আছে আমার চালকের লাইসেন্স আছে। তাহলে রিনিউ করতে গেলে দেয় না কেন? মনে হচ্ছে যে আমি গাড়ি নামাইছি তা পাপ হইছে।’

ভ্রাম্যমাণ আদালত চলাকালেই দেখা যায়, মাঝের লেন ঘেঁষে কিছু পরিবহন দ্রুুতগতিতে মোবাইল কোর্ট এলাকা এড়িয়ে যাচ্ছে। একই সময় আসাদগেট এলাকা থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতে দেখা যায় বিআরটিসির আরেকটি বাস (ঢাকা-মেট্রো-ব-১১-৬০৮৯)। চলন্ত অবস্থায় গেট বন্ধ রাখার নিয়ম থাকলেও তা তোয়াক্কা না করে দুই গেট খুলেই চলছে বিআরটিসির বাসটি।

একটি বেসরকারি পরিবহনের মালিক মজনু শাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কথা বলার যেন কেউ নাই। সব জগাখিচুড়ি অবস্থা। মামলার পর মামলা হয়, কিন্তু ফয়সালা করার কেউ নাই। একটা লাইসেন্স করতে সাত-আট হাজার টাকা ঘুষ লাগে। গরিব ড্রাইভার এত পাইবো কই। লাইসেন্স নবায়ন করতেও টাকা। টাকা দিলেও দিনের পর দিন পেরিয়ে যায়, গাড়ির কাগজ বাইর হয় না, আর রাস্তায় গাড়ি নামালেই মামলা দেয়। এসব দেখার কেউ নাই।’

বিআরটিএর পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) এ কে এম মাসুদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ভয় ও আতঙ্কের কারণে পরিবহন মালিকপক্ষের অনেকেই আজ গাড়ি নামাননি। নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রয়োগের প্রথম দিন, তাই সড়কে পরিবহন সংখ্যা। যেসব পরিবহনের কাগজপত্র নেই স্বাভাবিকভাবেই তারা পরিবহন সড়কে নামাননি। যে কারণে পরিবহনের সংখ্যা কম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিআরটিএ কর্তৃক পরিচালিত আটটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় ব্যাপক সাড়া পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি কয়েকটি পরিদর্শন করেছি। ব্যাপক সাড়া পড়েছে লক্ষ্য করছি। যাদের হেলমেট নেই তারা হেলমেট কিনছেন। বিআরটিএ কার্যালয়ে ভিড় বেড়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করছেন। নতুন আইনের প্রভাব পড়েছে।

জেইউ/এমআরএম