ক্রস ফিলিংয়ে গ্যাস চুরি, ঠকছে গ্রাহক বাড়ছে দুর্ঘটনা

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৭:০৬ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯

>> প্রতিটি সিলিন্ডার থেকে গড়ে দুই লিটার গ্যাস চুরি করে তারা
>> ২০০ টাকা বেশি মুনাফার লোভে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে প্রতারক চক্রটি
>> ক্রস ফিলিংয়ের এ অবৈধ ব্যবসা দক্ষিণ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলী উপজেলায় অবৈধ ‘ক্রস ফিলিং’র মাধ্যমে এলপি গ্যাস চুরির অভিযোগ দিন দিন বাড়ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে কিংবা ছোট সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরি করে নেয়া হয় অন্য খালি সিলিন্ডারে। এতে প্রতিনিয়ত গ্রাহক যেমন ঠকছে তেমনি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন প্রতারক চক্রের সদস্যরাও।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিটি সিলিন্ডারে গড়ে দুই লিটার করে গ্যাস কম দিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেশি মুনাফার লোভে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের ঠকিয়ে একটি অসাধু চক্র এ ব্যবসা চালাচ্ছে।

মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) সকালে চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের বাইপাস মোড়ে বাবুল মিয়া নামে একজনের গ্যাস সিলিন্ডারের দোকানে অবৈধ ‘ক্রস ফিলিং’র মাধ্যমে এলপি গ্যাস চুরির সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ হন

প্রতারক চক্রটি প্রথমে ঘটনাটিকে মোবাইল চার্জার বিস্ফোরণ বলে চালাতে চেষ্টা করলেও দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, মোবাইলের চার্জার নয়, অবৈধভাবে ‘ক্রস ফিলিং’র সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ চট্টগ্রামে একাধিক প্রতারকচক্র এলপি গ্যাস চুরি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে কিংবা ছোট সিলিন্ডার থেকে গ্যাস চুরি করে নেয়া হয় খালি সিলিন্ডারে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিটি সিলিন্ডারে গড়ে দুই লিটার করে গ্যাস কম দেয়া হয়। চোরাই সিন্ডিকেট চক্রটি সাধারণ ক্রেতাদের ঠকিয়ে এভাবে গড়ে ২০০ টাকার বেশি মুনাফা করে।

খুচরা গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জানে আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘ছোট সিলিন্ডারগুলোতে কোম্পানিভেদে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ কেজি গ্যাস থাকার কথা। খুচরা পর্যায়ে গ্যাসের সিলিন্ডার ওজন করে বিক্রি করা হয় না। সাধারণ ক্রেতারা বিশ্বাস করে সিলিন্ডার কিনে নেন। যখন গ্যাস নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হয়ে যায় তখনই খুচরা গ্রাহকরা বুঝতে পারেন তারা ঠকেছেন। এতে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের দুর্নাম হচ্ছে।’

ক্রস ফিলিংয়ের অবৈধ ব্যবসা মূলত চন্দনাইশ থেকে দক্ষিণ চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলার জোয়ারা রাস্তার মাথার পূর্ব পাশে, গাছবাড়িয়া খানহাট ও বাগিচাহাট এলাকায় অবৈধ উপায়ে এলপি গ্যাস প্রতিস্থাপন করা হয়। এছাড়া পটিয়ার বৈলতলী রোড, স্টেশন রোড, ভট্টাচার্য্য হাট, দারোগা হাট, আমজুর হাট, অলিরহাট, শান্তির হাট, সফর আলী মুন্সির হাট, কর্ণফুলীর কলেজ বাজার, মইজ্যারটেক, মাস্টার হাট, ব্রিজঘাটা; বোয়ালখালী উপজেলার ফুলতল, অলি বেকারী, হাজীরহাট, কানুনগো পাড়া, শাকপুরা চৌমুহনী এলাকায় অবৈধ উপায়ে এলপি গ্যাস প্রতিস্থাপন করা হয়।

Gass-2

অভিযোগ রয়েছে, একটি অসাধু চক্র এলপি গ্যাসের ৩৫ বা ৪৫ কেজি সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে রেগুলেটর দিয়ে গ্যাস স্থানান্তর করে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি। আবার ছোট সিলিন্ডার থেকেও গ্যাস নিয়ে অন্য খালি সিলিন্ডার পূর্ণ করা হয়। এ ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতিতে গ্যাস স্থানান্তর করতে গিয়ে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। মঙ্গলবার পটিয়ায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৫ জন দগ্ধ হওয়া ছাড়াও এর আগে চন্দনাইশ, কর্ণফুলী ও লোহাগাড়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) পটিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধ পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই চন্দনাইশের বাসিন্দা। তারা হলেন- চন্দনাইশের এনায়েত হোসেনের ছেলে মো. রহিম (৩৩), মীর আহাম্মদের ছেলে মো. আলী (৩২) ও আব্দুল মাহবুবের ছেলে সাজ্জাদ (২০)।

চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মুহাম্মাদ মেহেদী ইসলাম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে মাত্র পাঁচ-সাতটি স্থানে বৈধভাবে গ্যাস ক্রস ফিলিংয়ের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামে তিনটি প্ল্যান্ট বসানোর কাজ চলমান। প্ল্যান্ট ছাড়া এ ধরনের ক্রস ফিলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে একটি অসাধু চক্র গ্রাহকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস ক্রস ফিলিং করে চলেছে। এতে গ্রাহকদের ঠকাচ্ছে আবার নিজেরাও দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।’

তিনি জানান, চলতি বছরের শুরুতে খাগড়াছড়ির খবংপুড়িয়া গ্রামে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে প্রথমে স্বাভাবিক দুর্ঘটনা মনে করা হলেও বিস্ফোরক পরিদফতরের বিশেষ প্রতিনিধি দলের তদন্তে জানা যায়, অবৈধভাবে বড় সিলিন্ডার থেকে ছোট সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে ঘরে গ্যাস জমে গিয়েছিল। পরে বিদ্যুতের সুইচ দিলে বিস্ফোরণ ঘটে।

জাগো নিউজকে মুহাম্মাদ মেহেদী ইসলাম খান বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রামে অবৈধভাবে গ্যাস ‘ক্রস ফিলিং’র অভিযোগ আগে থেকেই পাচ্ছিলাম। আজকের (মঙ্গলবার) দুর্ঘটনার খবর আপনাদের (সাংবাদিক) কাছ থেকে পেলাম। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আইনে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সাজা রয়েছে।

আরএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]