এগুলো কি চুরি যাওয়া হেলমেট?

আবু সালেহ সায়াদাত
আবু সালেহ সায়াদাত আবু সালেহ সায়াদাত , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯

রাজধানীর মহাখালী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন একটি গলির মাথায় বেশ কয়জন মোটরসাইকেল আরোহী একটি ভ্যান গাড়ি ঘিরে রেখেছে। ভ্যানের ওপর থেকে বেছে বেছে ভালো হেলমেট বের করছেন কেউ কেউ। কেউবা দরদাম করছেন। তাদের অনেকেই আবার পছন্দের হেলমেট কিনে ফিরছেন।

আসলে এখানে বিক্রি হচ্ছে পুরোনো হেলমেট। পুরোনো হলেও অনেকগুলো দেখতে নতুনের মতোই। অল্প দামে এসব ভালো মানের হেলমেট পেয়ে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে এসব কিনছেন। একটা ভ্যানগাড়ি ভর্তি এসব হেলমেট কিনতে পথচারী, মোটরসাইকেল আরোহীরা  ভিড় জমিয়েছেন। তিন-চারজন যুবক এসব হেলমেট বিক্রি করছেন। অনেকেই এসব হেলমেট আগ্রহ নিয়ে কিনলেও কেউ কেউ ক্রেতা হিসেবেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তারা এসব হেলমেট কোথায় পেল?’ ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেই ধারণা করছেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে রাখা মোটরসাইকেল থেকে চুরি যাওয়া হেলমেট এগুলো।’

হেলমেটগুলো কোথা থেকে এনে বিক্রি করছেন এমন প্রশ্নের কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারেননি বিক্রেতারা। সেখানে হেলমেট বিক্রেতাদের একজন এরশাদ আলী বলেন, আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এগুলো কিনি। কোনো কোনো দোকানদার পুরোনো হেলমেট অল্প দামে বিক্রি করে। আমরা অনেক সময় সেসব দোকান থেকে এগুলো কিনি। কোথায় সেসব দোকান জানতে চাইলে তিনি এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

তিনি স্বীকার করেন, মোটরসাইকেল আরোহী অনেকেই আমাদের কাছে পুরোনো হেলমেট বিক্রি করেন। আবার মোটরসাইকেল আরোহী ছাড়া অন্যরাও এসে হেলমেট বিক্রি করেন। কিন্তু তারা কোথা থেকে এনে বিক্রি করেন তা সঠিকভাবে আমরা জানি না।

Healmet

ভ্যানগাড়িতে থরে থরে সাজিয়ে রাখা হেলমেটের মধ্যে থেকে একটি হেলমেট কিনলেন জুবায়ের আহমেদ নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী। তিনি বলেন, দুদিন আগে মহাখালী আমতলী থেকে আমার একটি হেলমেট চুরি হয়েছে। যেহেতু হেলমেট ছাড়া আরোহী বা সহযাত্রী কেউই যেতে পারে না তাই এখান থেকে পুরোনো একটা হেলমেট কিনলাম ১০০ টাকা দিয়ে। আমার কাছে মনে হয় চুরি যাওয়া হেলমেট এরাই কিনে আবার আমাদের মতো মানুষের কাছে বিক্রি করে। হেলমেটের মান ভালোই, বাজার থেকে নতুন কিনলে ৪০০-৫০০ টাকা লাগতো, কিন্তু এখানে পুরোনো হেলমেট ১০০ টাকায়ই পেয়ে গেলাম।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট বলেন, রাজধানীতে মোটরসাইকেল চলাচলের দৃশ্য অনেকটা বদলে গেছে। এখন আর কেউ হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালায় না। এমনকি মোটরসাইকেলে যেসব সহযাত্রী থাকে তারও হেলমেট পরে। হেলমেটবিহীন কোনো চালক আর সচারচর চোখে পড়ে না। অনেককেই মোটরসাইকেলের পেছনে অতিরিক্ত হেলমেট রাখতে দেখা যায়। চালক, সহযাত্রীদের সবার হেলমেটের চাহিদা থাকার কারণে হেলমেট চুরির ঘটনাও ইদানিং বেশি শোনা যাচ্ছে।

পুরোনো হেলমেট বিক্রির সেই স্থান থেকে আরেক পথচারী রশিদ তালুকদারও একটি হেলমেট কিনেছেন। তিনি বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে গত বছর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর থেকে একটি সঠিক সিস্টেম চালু হয়েছে, হেলমেট ছাড়া কোনো চালক বা যাত্রী বাইকে চলতে পারবে না। যে কারণে সে সময়ের পর থেকে রাজধানীতে কোনো মোটরসাইকেল চালক বা সহযাত্রীকে হেলমেট ছাড়া দেখা যায় না। তখন থেকেই হেলমেটের প্রচুর চাহিদা বেড়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাস্তার পাশে বা কোনো পার্কিংয়ে মোটরসাইকেল রাখলে অনেকেরই প্রায় সময় হেলমেট হারিয়ে যায়। যারা এসব চুরি করে তারাই এসে হয়তবা এদের কাছে বিক্রি করে। তারা তা কম দামে কিনে আমাদের কাছে হয়তোবা বিক্রি করছে। আমার মোটরসাইকেল গ্যারেজে ঠিক করতে দিয়েছি। আমার দুটো হেলমেটের মধ্যে একটার গ্লাস ভেঙে গেছে, যে কারণে এখানে কম দামে ১৫০ টাকা দিয়ে হেলমেট কিনলাম। বাজার থেকে নতুন কিনতে গেলে হয়তোবা আমার আড়াইগুণ বেশি টাকা লাগতো।

খোরশেদ আলম নামের একজন মোটরসাইকেল আরোহী অভিযোগ জানিয়ে বলেন, টোকাই, মাদকসক্ত অথবা ছেঁচড়া চোর বিভিন্ন স্থানে স্ট্যান্ড করে রাখা মোটরসাইকেল থেকে হেলমেট চুরি করে কোথাও অল্প দামে বিক্রি করে। সেসব সংগ্রহ করেই অনেকে পুরোনো হেলমেট বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করে। আমাদের জন্য এরা এমন সুযোগ পায়। আমরা যদি কম দামের লোভে হেলমেট না কিনি তাহলে এরা এসব হেলমেট বিক্রির জায়গা পাবে না। ফলে হেলমেট চুরি বন্ধ হবে। তাই সবার আগে আমাদেরই সচেতন হতে হবে।

এএস/এএইচ/পিআর