অথচ আসাদ বলেছিল ‘মা আমি মরিনি’

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

‘মা আমি মরিনি। আমি বেঁচে আছি। মা আমার অবস্থা খুব খারাপ। তোমরা তাড়াতাড়ি মেডিকেলে চলে আসো।’ কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে নিজে দগ্ধ হওয়ার পর ১৪ বছর বয়সী আসাদ ফোন করে মা শাহনাজ বেগমকে এভাবেই বেঁচে থাকার খবর দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁচা হলো না আসাদের। মা-বাবা, স্বজনদের কঁদিয়ে সত্যি সত্যি না ফেরার দেশে চলে গেল সে।

শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) সকালে শেখ হাসিনা ন্যাশনাল বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসাদের মৃত্যু হয়েছে। দুপুরে মরদেহ আনা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে।

আসাদের মরদেহ নিতে ঢামেকে এসেছেন তার বাবা শাহ আলম, বড়ভাই সোহেল ও মামী মুন্নী বেগম।

মুন্নী বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগুনের ঘটনার পর সবাই আসাদকে খোঁজাখুঁজি করছিল। তার মা প্রথমে তার ছবি নিয়ে কারখানায় যান। কিন্তু তাকে খুঁজে পাননি। দিশেহারা হয়ে ঘরে ফিরে যান তিনি। তবে সন্ধ্যার দিকে হঠাৎ তার মোবাইলে আসাদের নম্বর থেকে কল আসে। আসাদ তার মাকে ঢাকা মেডিকেলে যেতে বলে।’

‘পরিবারের সবাইকে নিয়ে মেডিকেলে যান তার মা। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে একজন পুলিশ সদস্যের সাহায্যে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে খুঁজে পাওয়া যায় তাকে।’

আসাদের ভাই সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসাদ ও আমি মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) একসাথে একই দাওয়াত খেয়ে বাসায় ফিরি। আমাদের মধ্যে অনেক কথাবার্তা হয়। আমরা দুই ভাই মা-বাবার শক্তি ছিলাম। ওর জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমাদের সবার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। কেমন লাগছে বলতে পারবো না।’

asad1

ঢামেকে গত দুইদিন ভাইয়ের সেবা-শুশ্রুষা করা সোহেল বলেন, ‘গতকালও সে আমাকে বলেছে, ভাই আমার ক্ষুধা লেগেছে। আমাকে খেতে দাও। আমি তাকে নিজ হাতে ডিম ও স্যালাইন খাওয়াই।’

আসাদদের বাড়ি বরগুনা। চার ভাই-বোনের মধ্যে আসাদ তৃতীয়। তাদের পরিবার থাকে কেরানীগঞ্জে। সেখানেই থাকতো আসাদ। তার বাবা শাহ আলম ইট ভাঙার কাজ করেন। মা শাহনাজ বেগম মাটি কাটেন। চার বছর ধরে আসাদ ওই প্লাস্টিক কারখানায় কাজ করছিল।

সোহেল বলেন, ‘ঝুঁকির কারণে মাঝে আমরা তার কাজ বন্ধ করিয়ে দেই। পরে কারখানায় তার বেতন ২০০০ টাকা বাড়িয়ে ৭০০০ টাকা করে দেয়। পরিবারের জন্যই আবার সেখানে যায় আসাদ। কিন্তু শেষে কী হয়ে গেলো…’

গত বুধবার (১১ ডিসেম্বর) কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়া এলাকায় ‘প্রাইম প্লেট অ্যান্ড প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’র কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে সেদিনই একজনের মরদেহ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।

আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে কয়েকজনকে শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়। আসাদসহ বাকি ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এখনো আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৭ জন।

মৃত্যুর সঙ্গে আসাদের লড়াইয়ের বিষয়ে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন (আরএস) ডা. পার্থ শঙ্কর জাগো নিউজকে জানান, আসাদের শরীরের ৫৫ ভাগই পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন থাকা আসাদকে আর ফেরানো গেলো না।

এআর/এইচএ/এমএস