চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল দ্রুত নির্মাণের তাগিদ ব্যবসায়ীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৭:০৩ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২০

চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল আলোচিত বে-টার্মিনাল নির্মাণকাজ শেষ করার একটি নির্দিষ্ট ‘টাইম ফ্রেম’ চেয়ে ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দ্রুততম সময়ে যদি বে-টার্মিনাল চালু করা না যায়, তাহলে ৬০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি বাণিজ্যের যে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার অর্জন করা সম্ভব নয়।

রোববার (১৯ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সম্মেলন কক্ষে ‘চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোবাবিলায় কর্মপন্থা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম চৌধুরী বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর কীভাবে একুশ শতকের উপযোগী বন্দর হবে, তা যদি আমরা এখনই নির্ধারণ করতে না পারি তাহলে ৬০ বিলিয়ন ডলারের রফতানির যে লক্ষমাত্রা তা কখনোই পূরণ হবে না। এ জন্য কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে বে-টার্মিনাল চালুর বিকল্প নেই। এ প্রকল্পটি ২০২১ সালের মধ্যে শেষ না হলে ৬০ বিলিয়ন রফতানি বাণিজ্যের যে লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার অর্জন করা সম্ভব নয়। বে-টার্মিনাল হয়ে গেলে আগামী ১০০ বছরে আমাদের আর নতুন বন্দর তৈরির প্রয়োজন হবে না।

ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ট্রান্সশিপমেন্ট দিচ্ছেন কোনো সমস্যা নেই। এতে আমার দেশ রাজস্ব পাবে। কিন্তু সে জন্য আমাদের সড়ক প্রস্তুত কিনা তা দেখতে হবে। ঢাকার পোশাক কারখানাগুলোর ৯৪ শতাংশ মালামাল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সড়কপথে আনা-নেয়া করা হয়। তাই এই মহাসড়কক আট লেনে উন্নিত করতে হবে। চট্টগ্রামে একটি ট্রাক টার্মিনাল নেই, শহরের যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়। এ জন্য ওয়েটিং ইয়ার্ড করতে হবে। বন্দর থেকে যাতে দ্রুত মালামাল পরিবহন করা যায় সে জন্য আউটার রিং রোডের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।

বে-টার্মিনাল নিয়ে চেম্বারের সভাপতির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, বে-টার্মিনালের একটি গেজেট করা উচিত। আমিও মনেকরি চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে বে-টার্মিনালের কাজ শেষ করার কোনো বিকল্প নেই। আমি মনেকরি বে-টার্মিনালের পরিকল্পনা কুমিরা পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা উচিত। এসব এলাকায় যাতে কেউ স্থাপনা গড়তে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইউরোপের হামবুর্গ শহরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, বন্দরের কার্গো পরিবহনের জন্য ডেলিগেটেড কার্গো রোড ও ডেলিগেটেড রেলপথ থাকতে হবে। হামবুর্গ পোর্টে দেখেছি ইউরোপের ১৪টি দেশের জন্য ডেলিগেটেড রেললাইন আছে। ডেলিগেটেড রুট না হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে না। আগামী ৫০ বছর আমাদের চাহিদা কেমন হবে, পরের ৫০ বছরে কী পরিমাণ জাহাজ আসবে, সে পরিমাণ জায়গা আছে কিনা তা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

bay-turminal-2.jpg

বিজিএমইএ’র প্রথম সহ-সভাপতি এমএ সালাম বলেন, গত ৩৭-৩৮ বছরে এ প্রথম আরএমজিতে নেগেটিভ গ্রোথে আছি। ইতোমধ্যে হোঁচট খেয়েছি, তাই শিক্ষা নিতে হবে। আপনাদের উচিত এসব সংসদে বলা। ভিয়েতনাম-কম্বোডিয়ার সঙ্গে আমরা পেরে উঠছি না। তারা চারদিনে পণ্য সরবরাহ করতে পারলেও আমরা কেন পারছি না। পণ্য এসে বন্দরে ১৭-১৮ দিন পড়ে থাকে, এর ক্ষতিপূরণ কে দেবে? টাইমিং ও ডেলিভারিতে আমাদের সহায়তা করুন। বন্দরের লিড টাইম ও কস্ট কমাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, রফতানি পণ্যের ৯৪ শতাংশ কনটেইনার যায় সড়কপথে। রেলে কনটেইনারের সিরিয়াল পেতে ১৫ দিন লাগে। প্রয়োজনে কনটেইনার পরিবহন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া যায়। খরচ কমানোর চেষ্টা করুন। সমস্যার ১০ শতাংশ হয় কাস্টমসে। কাস্টমসের দক্ষতা বাড়াতে হবে। সহকারী কমিশনার এসেছেন। উচ্চপদের কেউ আসতে পারতেন।

ব্যবসায়ীদের তুলে ধরা সমস্যার বিষয়ে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, সংসদীয় কমিটি আর মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আমাদের কাজ ভিন্ন ভিন্ন। আজ এখানে আরও বড় মাপের কেউ থাকলে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। আমরা সুপারিশ করতে পারব। শিপিং মিনিস্ট্রি ও ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি একসঙ্গে কাজ করলে বন্দর কাস্টমস কেন্দ্রিক সমস্যা থাকবে না।

কাস্টমসের লিমিটেশন আছে উল্লেখ করে মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার দেখায় কাস্টমস এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখন বন্দর ও কাস্টমস বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। কাস্টমস অনুধাবন করতে পারছে না তারা কোথায় পিছিয়ে আছে। আমি মনেকরি আপনারা যখন উন্নত বন্দর পরিদর্শনে যান, তখন কাস্টমসের প্রতিনিধিদেরও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া উচিত। এতে তারা উন্নত দেশের কাস্টমস কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে জানতে পারবেন।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন- নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য রণজিৎ কুমার রায়, মাহফুজুর রহমান, ডা. সামিল উদ্দিন আহমেদ শিমুল, এসএম শাহজাদা, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুছ ছাত্তার, উপসচিব বেগম মালেকা পারভীন, ড. দয়াল চাঁদ মণ্ডল, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের উপপরিচালক আবদুল জব্বার, সিনিয়র সহকারী সচিব এসএম আমিনুল ইসলাম, বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ, মেট্রোপলিটন চেম্বারের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এএম মাহবুব চৌধুরী, চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম, সদস্য (প্রশাসন) মো. জাফর আলম, সদস্য (প্রকৌশল) ক্যাপ্টেন মহিদুল হাসান চৌধুরী, হারবার মেরিন কমডোর শফিউল বারী, চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার এম আরিফুর রহমান, সচিব মো. ওমর ফারুক, ডেপুটি ম্যানেজার (এস্টেট) জিল্লুর রহমান, উপসচিব আজিজুল মওলা, শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী, বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে ইকরাম চৌধুরী, বাফার পরিচালক খায়রুল আলম সুজনসহ চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা।

আবু আজাদ/বিএ/এমএস