দুই শিশুসহ স্ত্রীকে হত্যার আলামত ময়নাতদন্তেও, সন্দেহে স্বামী

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৮ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
স্ত্রী মুন্নী বেগম ও দুই সন্তানের সঙ্গে রকিব উদ্দিন আহমেদ

রাজধানীর দক্ষিণখানের প্রেমবাগান এলাকার একটি বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া তিন মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দুই সন্তান ও তাদের মায়ের মরদেহের ময়নাতদন্তের রিপোর্ট বলছে, তিনজনই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। আলামত ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, স্পষ্টতই এটা হত্যাকাণ্ড, এক্ষেত্রে প্রধান সন্দেহভাজন গৃহকর্তা রকিব উদ্দিন আহমেদই (৪৬)। এমনকি এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায়ও আসামি করা হয়েছে রকিবকে।

গত শুক্রবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় দক্ষিণখানের প্রেমবাগান এলাকার ৮৩৮ নম্বর প্রেমবাগানের পাঁচতলাবিশিষ্ট একটি আবাসিক ভবনের চতুর্থ তলার ভাড়া বাসা থেকে মা মুন্নী বেগম (৩৭) এবং তার দুই সন্তান ফারহান উদ্দিন বিপ্লব (১২) ও লাইভা ভুঁইয়ার (৩) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ মুন্নীর স্বামী বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপ-সহকারী প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন আহমেদ। প্রায় ১০ বছর ধরে পরিবার নিয়ে ওই বাসায় ভাড়ায় থাকছিলেন রকিব। সম্প্রতি তিনি বিটিসিএলের গুলশান কার্যালয় থেকে উত্তরা কার্যালয়ে বদলি হন।

শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তিন মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর রাতেই গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মুন্নী ও তার দুই সন্তানের মরদেহ দাফন করা হয়।

ময়নাতদন্ত সম্পর্কে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক ডা. এ কে এম মাইনুদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তিনটি মরদেহে পচন ধরেছিল। নিহত গৃহবধূ মুন্নীর মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। দুই শিশুকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে আলামত মিলেছে।’

‘তিন মরদেহের ভিসেরা, রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসবের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে আলামত দেখে প্রাথমিকভাবে স্পষ্ট যে, তিনজনই হত্যাকাণ্ডের শিকার।’

দক্ষিণখানের চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় থানা পুলিশের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ, র‌্যাব ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একাধিক টিম।

jagonews24ছেলে ফারহান উদ্দিন বিপ্লবের সঙ্গে রকিব, ডানে ছোট্ট মেয়ে লাইভা ভুঁইয়া

আলামত সংগ্রহ, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ওই বাসার একটি কক্ষের বিছানায় মা ও মেয়ের মরদেহ এবং অপর কক্ষের মেঝেতে ছেলের মরদেহ পড়েছিল। আঘাতের কারণে মুন্নীর মাথার পেছনে ক্ষত দেখা গেছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতুড়ি উদ্ধার হওয়ায় মনে হচ্ছে, ওই হাতুড়ি দিয়েই আঘাত করা হয়েছিল। এছাড়া ওই ফ্ল্যাট থেকে দুটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফিউল্লাহ বুলবুল জাগো নিউজকে বলেন, গৃহকর্তা রকিবকে সবশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেখা গেছে দক্ষিণখান এলাকায়। তারপর থেকে তিনি নিখোঁজ। তার ফোনও বন্ধ। ঘটনার আলামত, পারিবারিক আত্মীয়-স্বজনদের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে এটা স্পষ্ট যে, তিনজনই হত্যার শিকার এবং এ হত্যায় গৃহকর্তা রকিবই জড়িত। আমরা তার অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করছি।

রকিব কেন প্রধান সন্দেহভাজন জানতে চাইলে র‍্যাব-১ এর সিও বলেন, রকিব উদ্দিনের ঋণের পরিমাণ ৬০ লাখ টাকা। সেই টাকা তিনি কোনোভাবে পরিশোধ করতে না পেরে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে টাকা চান। ঋণ পরিশোধে কেউ সহযোগিতা না করলে তিনি সপরিবারে আত্মঘাতী হতে পারেন বলে হুমকি দেন। তাছাড়া তিনি অপ্রকৃতস্থ একজন মানুষ। বিগত কয়েক মাসে তাকে মানসিকভাবে বির্পযস্ত দেখেছেন ভাড়া বাসার মালিক, আত্মীয়-স্বজনরা। তাকে গ্রেফতার করা গেলে ঘটনার মোটিভ সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ডিএমপি’র উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, তিন মরদেহ অর্ধগলিত অবস্থায় উদ্ধারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। ফুটেজ উদ্ধারের পর প্রয়োজনে এক্সপার্টদের সহযোগিতা নেয়া হবে।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ডিসি শৈবাল বলেন, ৪-৫ মাস আগে রকিব একবার নিখোঁজ হয়েছিলেন বলে জেনেছি। তবে এ ব্যাপারে থানায় জিডি হয়নি। দক্ষিণখানের পরিচিত কেউ কেউ তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বললেও রকিবকে ধরে তার শারীরিক অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগের এডিসি শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ডিবি পুলিশ এটা নিয়ে কাজ করছে। প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে গৃহকর্তাই তিন হত্যায় জড়িত। তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। যদিও এখন পর্যন্ত তার হদিস মেলেনি।

jagonews24

তিন মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর প্রেমবাগানে রকিব উদ্দিনের সেই বাড়িতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ উৎসুক জনতা

তিন মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর ওই বাড়ির মালিক মনোয়ার হোসেন জানান, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে রকিব ভাড়ায় তার বাসায় ওঠেন। এত বছরে পারিবারিক বিবাদের কথা তিনি শোনেননি। তবে কিছুদিন আগে রকিব উদ্দিনের ঋণগ্রস্ততার কথা শোনেন তিনি। গত বুধবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দিনের বেলায় রকিবের সঙ্গে তার কথোপকথন হয়েছে বলেও জানান মনোয়ার।

এদিকে এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা করেছেন মুন্নীর ভাই মুন্না রহমান। দক্ষিণখান থানায় দায়ের হওয়া মামলায় (নং ২৪) আসামি করা হয়েছে রকিব উদ্দিনকেই।

মামলার এজাহার অনুসারে, রকিবের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ভাতশালা এলাকায়। তিনি আশরাফ উদ্দিন ভূঁইয়া ও নাজিরা আক্তারের ছেলে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) মো. নাসির উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, আপাতত কোনো আপডেট নেই। রকিবের খোঁজে তল্লাশি চলছে।

জেইউ/এইচএ/এমকেএইচ