প্যারাসাইটিক টুইন আবদুল্লাহ সুস্থ হয়ে ফিরল মায়ের কোলে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫০ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

জন্মের সময় শিশু আবদুল্লাহর অঙ্গে যুক্ত হয়ে আসে আরেক অসম্পূর্ণ দেহ। ওই দেহের ছিল দুই পা, দুই হাত, নিতম্ব এবং আলাদা পায়খানা-প্রসাবের রাস্তাও। কেবল মাথা ও বুকের অংশবিশেষ ছিল না। এক মাস বয়সী আবদুল্লাহকে ওই অসম্পূর্ণ যমজ থেকে আলাদা করে সুস্থ-সবলভাবে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢামেক হাসপাতালে সংবাদ সম্মেলন করে আবদুল্লাহর অস্ত্রোপচারের বিস্তারিত তুলে ধরেন হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা। এতে বক্তব্য রাখেন ঢামেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন এবং শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজল।

গত ২৫ জানুয়ারি নোয়াখালীর এজবালিয়া গ্রামের সালাউদ্দিন ও পারভীন আক্তারের ঘরে জন্ম নেয় আবদুল্লাহ। কিন্তু শরীরে অস্বাভাবিকতার কারণে মা-বাবা তাকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার চিকিৎসকরা আবদুল্লাহকে ঢাকায় আনার পরামর্শ দেন। পরে ২৮ জানুয়ারি ঢামেকের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজলের তত্ত্বাবধানে ২০৫ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয় আবদুল্লাহকে।

চিকিৎসকদের ভাষ্যে, আবদুল্লাহর জন্ম হয় প্যারাসাইটিক টুইন (পরজীবী যমজ) হিসেবে। প্যারাসাইটিক টুইন জোড়া লাগানো বাচ্চারই একটি প্রকার। বিশ্বে এমন শিশুর জন্মের হার প্রায় ১০ লাখে একজন।

আব্দুল্লাহর আগে ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের একটি শিশুর সফল অস্ত্রোপচার হয়। আর জোড়া লাগানো বাচ্চা হিসেবে জন্ম নিয়েও সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফেরা শিশুদের তালিকায় রয়েছে তোহফা-তহুরা ও রাবেয়া-রোকাইয়ার নাম।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আবদুল্লাহকে ভর্তির পর থেকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তার ও অসম্পূর্ণ অঙ্গের প্রকৃত অবস্থা নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয়। সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই ঝুঁকিপূর্ণ জটিল অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১৬ ফেব্রুয়ারি ডা. কাজলের নেতৃত্বে সুদক্ষ সার্জিক্যাল ও এনেসথেসিয়া টিমের তত্ত্বাবধানে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। অস্ত্রোপচারের সময় অপূর্ণাঙ্গ শিশুটিকে সুস্থ শিশু (আবদুল্লাহ) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয় এবং সুস্থ শিশুটির নাভীর ছিদ্র বন্ধ করা হয়।

শিশুটির (আবদুল্লাহ) বয়স ৩১ দিন জানিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমানে শিশুটি সম্পূর্ণ সুস্থ আছে এবং মায়ের দুধ পান করছে। আগামী শনিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) শিশুটিকে হাসপাতাল থেকেই ছাড়পত্র দেয়ার কথা রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডা. আশরাফ উল হক কাজল বলেন, ঢামেকে এই প্রথম পরজীবী যমজ শিশুর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। অস্ত্রোপচারে সময় লেগেছে চার ঘণ্টা।

আবদুল্লাহর অস্বাভাবিক শরীরে জন্মগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি শিশুর পেটে আরেকটি শিশুর মাথাবিহীন শরীর ছিল। পেটের বাইরে ছিল দুই পা, দুই হাত, নিতম্ব ও পায়খানা-প্রসাবের রাস্তা। কিন্তু মাথা ও বুকের অংশবিশেষ অনুপস্থিত ছিল। সুস্থ শিশুটির নাভীতে বড় একটি ছিদ্র ছিল। তবে আমরা সফলভাবে অস্ত্রোপচার করে মাথাবিহীন শরীরটি কেটে ফেলেছি। এখন শিশুটি সুস্থ আছে।

ডা. কাজল বলেন, আগাছা যেমন অন্য গাছ থেকে রস নেয় তেমনি অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি বড় হচ্ছিল আবদুল্লাহর শরীর থেকে পুষ্টি নিয়ে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এ ধরনের শিশুকে কনজেনিটাল প্যারাসাইটিক টুইন বা অপূর্ণাঙ্গ যমজ বলা হয়। বিশ্বে এই রোগে জন্মানো শিশুর হার প্রায় দশ লাখে একজন।

শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. কাজল বলেন, শিশুটি (আবদুল্লাহ) এখন ভালো আছে। অস্ত্রোপচারের ছয় দিন পর থেকে তাকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। শিশুটি দুই হাত দুই পা নাড়াতে পারছে। বর্তমানে তার অর্গানের কোনো সমস্যা নেই। আশা করছি সে সুস্থ-সবলভাবে বেড়ে উঠবে।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অনেক জটিল অপারেশন আমাদের হাসপাতালে সফলভাবে হয়েছে। এটি আরেকটি প্রমাণ। শিশুটি প্রথম থেকেই জটিল অবস্থায় ছিল। আমাদের হাসপাতালে অসাধারণ সব চিকিৎসক রয়েছেন, যারা সংকটময় সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান।

জেইউ/এইচএ/পিআর