করোনার মধ্যে চসিক নির্বাচন নিয়ে সিইসি রোমসম্রাট নিরোর ভূমিকায়!

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৫৯ এএম, ১৭ মার্চ ২০২০

রোম নগরী যখন আগুনে পুড়ছিল তখন সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না রোম সম্রাটের। বরং তখন মনের আনন্দে বাঁশি বাজাচ্ছিলেন সম্রাট নিরো। ইতিহাসের এই ঘটনার সঙ্গে করোনাভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকা চট্টগ্রামের আজকের পরিস্থিতি একই। কারণ পুরো বিশ্ব আজ এ ভাইরাসের থাবায় বিপর্যস্ত, সেখানে চট্টগ্রাম নগরীতে চলছে নির্বাচনী প্রস্তুতি। এ নগরীকে ঘিরে সিইসির ভূমিকা যেন ঠিক রোম সম্রাট নিরোর মতো।

সোমবার (১৬ মার্চ) সন্ধ্যায় নগরের প্রাণকেন্দ্র চেরাগী পাহাড় মোড়ে কলেজ শিক্ষার্থী রাজিব হাসান রাজু তার বন্ধুর সঙ্গে আড্ডার সময় এসব কথা বলছিলেন।

আড্ডার সময় রাজুর বন্ধু বলেন, ‘সিভিল সার্জন ঘোষণা করেছেন চট্টগ্রামের পরিস্থিতি ভালো নয়, অথচ মেয়র আর কাউন্সিলর প্রার্থীদের সেদিকে কোনো দৃষ্টি নেই। তারা আছেন মিছিল-মিটিং আর প্রচার-প্রচারণা নিয়ে। দেশ কতটা ঝুঁকির মুখে আছে সেটা নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই তাদের। অথচ এমন মানুষগুলোই জনপ্রতিনিধি হতে চাইছেন।’

জবাবে চট্টগ্রাম কলেজের সম্মান শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রাজু বলেন, ‘প্রার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। নির্বাচন কমিশন না চাইলে এ প্রচারণা বন্ধ হবে না। আমাদের নির্বাচন কমিশনারের ভূমিকা এখন অনেকটাই রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিতর্কিত সম্রাট নিরোর মত। সারাবিশ্ব যখন একপ্রকার লকডাউনের পথে হাঁটছে, যখন বলা হচ্ছে চট্টগ্রাম দেশের সবচেয়ে ঝঁকিপূর্ণ এলাকা, তখনো তিনি নির্বাচন করার খোয়াব দেখছেন।’

শুধু এই দুই বন্ধু নয় চট্টগ্রাম নগরীর চায়ের দোকান থেকে অফিস-আদালতপাড়া সর্বত্র এখন চলছে চসিক নির্বাচন বন্ধের বিষয়ে ইসির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। করোনা আতঙ্কে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান স্থগিত করা হলেও নির্বাচন কমিশন চসিকসহ উপনির্বাচনগুলো স্থগিত না করায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোকে মূলত ঝুঁকির দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও নির্বাচন বন্ধের দাবি তুলেছেন অনেকেই।

ctg

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল সে মরে নাই’। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবিত ও মৃত’ গল্পের বিখ্যাত সেই উক্তির মত আমাদেরকেও মনে হয় মরিয়া প্রমাণ করিতে হইবে বাঁচিয়া আছি। জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের মতো দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত অনুষ্ঠান বেশ সীমিত করা হলো। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটিসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশ কয়েকটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মাঠ এখনো সরগরম। প্রচারণায় প্রতিদিন হাজারো জনতার সমাগম। নির্বাচনী প্রচারনায় অংশ নিতে অনেক প্রবাসী দেশে এসেছেন। পরিচিত প্রবাসী কাউকে দেখলেই স্বভাবজাতভাবে আমরা জড়িয়ে ধরি, হাত মেলানো তো মামুলি বিষয়। আল্লাহ রক্ষা করুক এদের কেউ করোনা আক্রান্ত থাকলে নিজের অজান্তেই হয়ত অনেকের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠবেন, সেই অনেক আরও অনেক অনেকের জন্য...। নির্বাচন কয়েকদিনের জন্য স্থগিত থাকলে জাতীর কি এমন ক্ষতি হত?’

সুচিন্তা ফাউন্ডেশন চট্টগ্রামের কো-ফাউন্ডার ও আইনজীবী জিনাত সোহানা চৌধুরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন, ঢাকা, গাইবান্ধা ও বাগেরহাটের উপনির্বাচন স্থগিত করা। ঝুঁকি শুধু নির্বাচনের দিনই নয়, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারণাও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ইতালীর কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নিত হবে। সব ধরনের মেলা, কনসার্ট, সমাবেশ স্থগিত চাই। প্রত্যেক ধরনের জনসমাগমের ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি চাই।’

দেশজুড়ে করোনা আতঙ্কের মাঝেই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন অনুষ্ঠানের নির্বাচন কমিশনের এই তোর-জোড়কে ভালো চোখে দেখছেন না প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও।

তারা বলছেন, ইতোমধ্যে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রবাসীদের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হচ্ছে। বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে বিমানবন্দরগুলোতে। সীমিত করা হয়েছে মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানও। এর পরেও নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা না দেয়া অবাক দৃষ্টান্ত।

সরকারের সকল বিভাগ যখন করোনা ঠেকাতে মাঠে, সেই সময় ঠিক উল্টো আচরণ করছে নির্বাচন কমিশন। করোনাভাইরাসের কারণে নিজের শঙ্কার কথা প্রকাশ করলেও নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা।

ctg

সোমবার রাজধানীতে ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সিইসি বলেন, ‘করোনাভাইরাস নিয়ে আমরা অত্যন্ত শঙ্কিত। তারপরও এই নির্বাচনে আমরা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। আগামী ২১ মার্চ ঢাকা-১০ আসনের উপ-নির্বাচন পেছাতে চাচ্ছি না। এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে। আল্লাহর রহমতে সব ঠিক হয়ে যাবে, হয়তো।’

যদিও ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জনসমাগম না করার কথাও বলা হয়েছে। এরপরেও কেন নির্বাচন? এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বী মিয়াজাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত আমরা এ নিয়ে বলছি। প্রতিটি মিটিংয়ে এ বিষয়ে বলা হচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন বন্ধের সিদ্ধান্ত আমরা নিতে পারি না। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক স্যারকেও অবহিত করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে ‘এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কথা বলার বলার এখতিয়ার নেই’ বলে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন।

এর আগে সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণায় গণজমায়েত ও মিছিল-সমাবেশ এড়িয়ে চলার জন্য প্রার্থীদের প্রতি আহ্বান জানান সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন মানে মিছিল, শোডাউন, গণজমায়েত। এবার জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় এটা অবশ্যই বিসর্জন দিতে হবে। ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতার পাশাপাশি কিছু সামষ্টিক প্রস্তুতিও নিতে হবে। এই মুহুর্তে করোনার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম।’

আবু আজাদ/এমএফ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]