ডেঙ্গু মোকাবিলার বিষয়ে যা বললেন ডিএনসিসির মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১৩ পিএম, ০৩ জুন ২০২০

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের নিয়ে ডিএনসিসির প্রথম করপোরেশন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (৩ জুন) মেয়র মো. আতিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মিরপুর মাজার রোডে অবস্থিত ডিএনসিসির ১০ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবং যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

সভার শুরুতেই প্রয়াত সাবেক মেয়র আনিসুল হক, প্যানেল মেয়র ওসমান গণি এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। এরপর মেয়র আতিকুল ইসলাম নবনির্বাচিত সব ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলরদের স্বাগত জানান।

কাউন্সিলরদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা সৌভাগ্যবান যে, মুজিববর্ষে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি।’ তারপর করোনা, ডেঙ্গু, রাজস্ব আদায়, জলাবদ্ধতা ইত্যাদি প্রসঙ্গে মেয়র বক্তব্য রাখেন।

করোনা মোকাবিলা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘করোনাকালে ডিএনসিসি এক দিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। প্রতিদিন ডিএনসিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। মেয়র পদে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে থেকেই এ মহাদুর্যোগের সময়ে আমিও নগরবাসীর পাশে থেকে কাজ করে যাচ্ছি। সিটি করপোরেশনের কর্মীদের পাশে থেকে তাদের অনুপ্রেরণা যোগানোর মাধ্যমে এবং ডিএনসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে আমি নগরবাসীর জন্য সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। এই দুর্যোগের সময়ে নগরবাসীর জীবনযাপন স্বাভাবিক রাখতে আপনাদের সঙ্গে নিয়ে এই প্রচেষ্টা চলমান থাকবে।’

atik

করোনা মোকাবিলায় ডিএনসিসির বিভিন্ন কার্যক্রম তিনি কাউন্সিলরদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘৩১ মে পর্যন্ত ডিএনসিসি ১০টি ওয়াটার বাউজারের সাহায্যে ৮৬ লাখ ১০ হাজার লিটার তরল জীবাণুনাশক ডিএনসিসির প্রায় ১২ কোটি ৯২ লাখ বর্গফুট এলাকায় ছিটানো হয়। এছাড়া ৭টি স্থানে করোনা স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া কোভিড-১৯ টেস্টিং ল্যাব (পিসিআর মেশিন) স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে সাময়িকভাবে মহাখালী ডিএনসিসি মার্কেট করোনা হাসপাতাল ও আইসোলেশন সেন্টার নির্মাণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় ডিএনসিসির নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে করোনার চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। ডিএনসিসির ১৬টি কাঁচাবাজার উন্মুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে যেন জনগণ আরও নিরাপদে দৈনন্দিন বাজার সম্পন্ন করতে পারে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের প্রায় ৫ লক্ষাধিক অসহায়, দুস্থ পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে ডিএনসিসি।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা আক্রান্তের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে পরীক্ষামূলকভাবে ডিএনসিসির একটি ওয়ার্ড ৩টি জোনে ভাগ করা হবে- গ্রিন, ইয়েলো ও রেড। সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রসঙ্গে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া যেন গত বছরের মতো ভয়াবহ রূপ নিতে না পারে, সেই জন্য আমি আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। ১০ মে থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। গতকাল পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে মোবাইল কোর্ট অব্যাহত থাকবে। কোথাও জমে থাকা পানি বা এডিস মশার বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ পাওয়া গেলে, সেটি যদি সরকারি প্রতিষ্ঠানও হয়, সেখানে আইন অনুযায়ী অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। ১৬ মে থেকে পরিচ্ছন্নতা ও মশককর্মী দ্বারা ৫টি ওয়ার্ডে ঈদের আগ পর্যন্ত চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আগামী ৬ জুন থেকে প্রতিটি ওয়ার্ডে চিরুনি অভিযান শুরু করা হবে। অন্তত আগস্ট পর্যন্ত প্রতি মাসে ১০ দিনব্যাপী চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হবে। নগরবাসীকে ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষা দিতে বিনামূল্যে ডিএনসিসি এলাকার ৫টি নগর মাতৃসদন ও ২২টি নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১১ মে থেকে ডেঙ্গু পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শুক্রবার ব্যতীত প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে।’

মেয়র বলেন, ‘মশক নিধন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে দুটি অ্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। একটি অ্যাপের মাধ্যমে ডিএনসিসি এলাকার এডিস মশার লার্ভা পাওয়া সব বাড়ি বা স্থাপনার ছবিসহ তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যা পরবর্তীতে মনিটরিংয়ের কাজে ব্যবহৃত হবে।’

মশক নিধনকর্মীদের মনিটরিং প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘সমগ্র ডিএনসিসিকে ৪০০ মিটার বাই ৪০০ মিটার গ্রিডে ভাগ করা হবে। প্রতিটি গ্রিডে বসবাসরত একজন গৃহিণীকে মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেয়া হবে। একটি গ্রিডে কর্মরত মশককর্মীর কাজে ওই গ্রিডে বসবাসরত গৃহিণী সন্তুষ্ট কি না ডিএনসিসির একটি অ্যাপের মাধ্যমে তিনি তা প্রকাশ করবেন। তার সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করবে মশক নিধন কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি। ওই অ্যাপের মাধ্যমে মেয়রসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো এলাকার মশক নিধন কার্যক্রমের কী অবস্থা তাৎক্ষণিক জানতে পারবেন। জনগণকে মশকনিধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতেই এ ব্যবস্থা চালু করা হবে।’

atik-1

জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে মেয়র বলেন, ‘বর্ষাকালে রাস্তায় যেন পানি না জমে, সেই জন্য নগরীর ড্রেন, খাল পরিষ্কার এবং খনন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে কালশি খাল খনন করা হয়েছে। আশকোনা এলাকায় সিভিল অ্যাভিয়েশনের এডি-৮ খাল খনন শুরু করে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বনানী প্রধান সড়ক ও উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে।’

তিনি বলেন, ‘ডিএনসিসির ৩৬টি ওয়ার্ডে একটি করে ৩৬টি স্যাটেলাইট অগ্নিনির্বাপণ স্টেশন স্থাপন করা হবে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। এ স্যাটেলাইট স্টেশনে মশা নিধন, প্রাথমিক চিকিৎসা ইত্যাদির ব্যবস্থাও থাকবে।’

ডিজিটালি নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকল্পে ‘সবার ঢাকা’ অ্যাপের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে। ‘সবার ঢাকা’ অ্যাপের মাধ্যমে নগরবাসী যেকোনো স্থান থেকে ডিএনসিসির সেবা এবং কাজের বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ সমাধানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। তাছাড়া নাগরিকরা যাতে অনলাইনে যেকোনো স্থান থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদান, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধনসহ অনেক নাগরিক সেবা গ্রহণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

প্রতি মাসে একবার ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে নগরবাসীর অভিযোগ, চাওয়া-পাওয়া, সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে সরাসরি কথা বলার জন্য তিনি কাউন্সিলরদের আহ্বান জানান। এর ফলে নগরবাসীর সমস্যাগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিক বা দ্রুততম সময়ে সমাধান করা সম্ভব হবে।

মেয়র সব কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর উদ্দেশে বলেন, “দুর্নীতিবাজ যেই হোক না কেন, তাকে কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না। দুর্নীতির বিষয়ে আমাদের ‘জিরো টলারেন্স’।”

রাজস্ব আদায় সম্পর্কে মেয়র বলেন, ‘মার্চ থেকে ডিএনসিসির হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় বন্ধ রয়েছে।’ হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন। তবে এ তিন মাসে যে ১৫ শতাংশ সারচার্জ/জরিমানা হয়েছে তা দিতে হবে না বলে তিনি জানান। আগামী অর্থবছর থেকে সম্প্রসারিত এলাকার ১৮টি ওয়ার্ডে অবস্থিত শিল্প, কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে রাজস্ব আদায় করা হবে বলে মেয়র জানান। তবে এখনই হোল্ডিং ট্যাক্স/গৃহকর আদায় করা হবে না।

করপোরেশন সভায় অন্যান্যের মধ্যে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হাই, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর সাইদুর রহমান, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুর রহমান মামুন, প্রধান প্রকৌশলী আমিরুল ইসলাম, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

এএস/এফআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]