ভিয়েতনামে আটক বাংলাদেশিরা চাকরিও পাচ্ছে না, ফিরতেও পারছে না

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪৩ পিএম, ০৯ জুলাই ২০২০

সুনাম ও চাহিদার কারণে বিদেশে শ্রমশক্তি রফতানি হচ্ছে। এ সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু দালাল চক্র স্বল্প আয়ের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশে অবৈধভাবে বিদেশে পাঠাচ্ছে। কিন্তু চাকরি না পেয়ে প্রতারণার শিকার অনেক নিরীহ বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশ যেতে পথে মৃত্যুর মুখে পড়ছে। অনেকে আবার অবৈধভাবে বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনার শিকার হচ্ছে।

সম্প্রতি ভিয়েতনাম থেকে ১১ বাংলাদেশি অভিবাসী দেশে ফেরেন। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে র‌্যাব অনুসন্ধানের পর বুধবার (৮ জুলাই) রাতে রাজধানীর পল্টন এলাকা হতে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিয়েতনামে পাঠানো পাচারচক্রের মূলহোতাসহ ৩ জন গ্রেফতার করা হয়। এ সময় জব্দ করা হয় বিভিন্ন নামীয় ২৫৪টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট। গ্রেফতাররা হলেন- মানবপাচারকারী চক্রের মূলহোতা জামাল উদ্দিন সোহাগ (৩৪), কামাল হোসেন (৩৯) ও জামাল হোসেন (৩৭)।

বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল রকিবুল হাসান।

তিনি বলেন, গত ৩ জুলাই বিশেষ ফ্লাইট নং-ভিজে ৬৯৫৮ যোগে ভিয়েতনাম থেকে ১১ বাংলাদেশি অভিবাসী ফেরেন। এছাড়া আরও ২৭ জন অভিবাসী ভিয়েতনামে আটক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে। ভিয়েতনাম ফেরত ১১ জনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে র‌্যাব প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ঘটনার সাথে মাশ ক্যারিয়ার সার্ভিস, দি জেকে ওভারসিস লিমিটেড, অ্যাডভেন্ট ওভারসিস লিমিটেড, মেসার্স সন্ধানী ওভারসিস লিমিটেড এবং আল নোমান হিউম্যান রিসোর্স লিমিটেডসহ স্থানীয় দালাল ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশি দালাল আব্দুল জব্বার, মোস্তফা, গোলাম আজম সুমন, কল্পনা, আজমির, মিলন, শোভন ও আতিকের সংশ্লিষ্টতার সত্যতা পাওয়া যায়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৩ এর একটি বিশেষ দল মাশ ক্যারিয়ার সার্ভিস ও দি জেকে ওভারসিস লিমিটেড ওই তিনজন মানবপাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গ্রেফতাররা একাধিকবার ভিয়েতনামে গিয়ে সেখানকার দালালদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ভিয়েতনামের দালালরা জানায়, বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায়িক উদ্যোক্তাদের ভিয়েতনামে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। এরপর উল্লেখিত এজেন্সিগুলো বাংলাদেশের সাধারণ লোকজনকে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ভিয়েতনামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আয় করা সম্ভব বলে প্রলোভন দেখায়। এমন প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে বিভিন্ন লোকজন ভিয়েতনামে যেতে আগ্রহ দেখায়। আগ্রহী প্রতিজনের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা করে নেয়। ওই টাকার বিনিময়ে পাসপোর্ট বানানো এবং পাসপোর্টের তথ্যসমূহ ভিয়েতনামের দালালদের কাছে পাঠানো হয়।

rab

ভিয়েতনামের দালালরা পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী ভিয়েতনাম হতে অফার লেটার (ভিয়েতনামের ভাষায়) বাংলাদেশের এজেন্সিগুলোতে প্রেরণ করে। ওই অফার লেটারের মাধ্যমে ভিয়েতনাম অ্যাম্বাসি থেকে ভিসা সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ভিয়েতনাম সরকার স্বল্প মেয়াদে (সর্বোচ্চ ১ বছরের জন্য) বিনিয়োগকারীকে ডিএন ভিসা দিয়ে থাকে।

উল্লেখ্য, ডিএন ভিসায় ভিয়েতনামে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে নগদ অর্থ নিয়ে যেতে হয়। এজন্য প্রত্যেক অভিবাসীকে দুই হাজার মার্কিন ডলার নিয়ে যেতে বাধ্য করে। এরপর বাংলাদেশি দালালদের মাধ্যমে আগ্রহীদের বিএমইটি কার্ড প্রদান করে। ভিয়েতনামে যাওয়ার পর সেখানকার দালালরা এয়ারপোর্টে রিসিভ করে, তাদের পাসপোর্টসহ করে ঘরে আটকে জিম্মি করে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। জিম্মিদের স্থায়ী কর্মসংস্থান না দিয়ে বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট কাজ দেয়া হয়। যে কারণে তাদের আর প্রত্যাবর্তন করা সম্ভবপর হয় না। তারা ভিয়েতনামে মানবেতর জীবনযাপন করে।

লে. কর্নেল রকিবুল হাসান বলেন, কুমিল্লা নিবাসী নাজমুল হাসান (২৬) মার্চের মাঝামাঝিতে অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসায় গত ৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। নাজমুলের স্বজনরা স্থানীয় দালাল ও জেকে ওভারসিসের সাথে যোগাযোগ করলেও কোনো ধরনের সহযোগিতা পায়নি। গত ২৭ জুন ভিয়েতনামের হো চি মিন সিটির মুসলিম কলোনিতে নাজমুল হাসানের দাফন সম্পন্ন হয়। জেকে ওভারসিস ২০১৯ সালের নভেম্বরে ডিএন ভিসার মাধ্যমে ১৪ জন বাংলাদেশিকে ভিয়েতনামে প্রেরণ করে যাদের কারোরই কাজের সুযোগ মেলেনি। যার ফলে এ সকল শ্রমিক অর্ধাহার-অনাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মাশ ক্যারিয়ার সার্ভিসের কোনো নিজস্ব রিক্রুটিং লাইসেন্স নেই, দীর্ঘদিন যাবৎ অন্যান্য এজেন্সির লাইসেন্স ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে দালাল নিয়োগের মাধ্যমে ভিয়েতনামে অভিবাসী প্রেরণ করে আসছে। গ্রেফতারদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

জেইউ/এমএসএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]