কোলের শিশু নিয়ে পথে পথে শামসু

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল
মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:৩১ পিএম, ১৪ জুলাই ২০২০

প্রায় সন্ধ্যা, রাজধানীর হাতিরপুল বাজারের অদূরে ফুটপাতে পান সিগারেটের একটি টুকরির সামনে বসে আছে গোলাপি রংয়ের ফ্রক পরিহিত চার বছর বয়সী এক শিশু। হঠাৎ চোখ পড়লে মনে হবে যেন বাচ্চাটিই দোকানদার। পানি সিগারেট বিক্রি করতেই যেন বসে আছে। পথচারীসহ এ রাস্তাটি দিয়ে যাতায়াতকারী সকলের চোখই এক মুহূর্তের জন্য শিশুটির দিকে আটকে যাচ্ছিল।

মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি আনমনে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় শিশুটির কাছেই সিগারেট আছে কিনা জানতে চেয়ে জিভ কেটে বললেন, কিরে দোকানদার কে? শিশু অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়, আব…বা।

এ সময় পাশের একটি ভবন থেকে এক যুবককে পানির গ্যালন হাতে বেরিয়ে এসে সেটি শিশুটির সামনে রেখে পান-সিগারেটের টুকরি গলায় বাঁধতে দেখা যায়। টুকরো থেকে বনরুটি বের করে তাকে খেতে দেয়। এরপর পানির বোতল থেকে পানি খাওয়ায়।

কৌতুহলবশত এগিয়ে কথা বলতেই জানা যায়, যুবকের নাম শামসু। এক সময় রিকশা চালাতেন। তিন সন্তানের জনক সে। হাতিরপুল এলাকায় সাত হাজার টাকা বাসাভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও কোলের এ সন্তানটিকে নিয়ে থাকেন। অপর দুই সন্তানকে দেশে বাবা-মার কাছে রেখে পড়াশোনা করান।

শামসু জানান, তিনি রিকশা চালিয়ে এবং তার স্ত্রী বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর চাকরি করে সংসার চালাত। কিন্তু করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশে দুই মাসেরও বেশি সময় সবধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় একদিকে তার রিকশা চালিয়ে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে যায় অপরদিকে স্ত্রীকে গৃহকর্মীর কাজ থেকে বাদ দেয় গৃহকত্রীরা।

চোখেমুখে অন্ধকার দেখে শামসু সাত হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে টুকরিতে করে পান সিগারেট বিক্রি শুরু করে। তার স্ত্রীও বাসা থেকে ফ্লাক্সে চা বানিয়ে বিক্রি করে। এ অবস্থায় কোলের মেয়ে শিশুটিকে পালা করে কখনও স্ত্রীর কাছে রেখে আবার কখনও নিজের সাথে করে নিয়ে আসেন। হকারি করার সময় মেয়েটিকেও সাথে নিয়ে ঘুরে বলে জানায় সে।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে শামসু জানায়, করোনার সময় প্রথম প্রথম পান সিগারেট বিক্রি ভালো ছিল। লাভও বেশ হত। কিন্তু বর্তমানে রাস্তা-ঘাটে তার মতো হকারের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। এখন আর আগের মতো বেচাকেনা হচ্ছে না। ‘গত দুই মাসের বাসাভাড়া বাকি পড়েছিল। বাড়িওয়ালা একমাসের ভাড়া মাফ করে দিয়েছে’।

শামসু জানায়, তার ওপর ৫০ হাজার টাকার ঋণের বোঝা ছিল। করোনার আগে তিনি জামালপুরের বাড়িতে ঘর বাঁধেন। এ সময় স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ২৪ মাসে পরিশোধযোগ্য ৫০ হাজার টাকা ঋণ করে ঘরটি বাঁধেন। আগে রিকশা চালিয়ে যা আয় হত তা দিয়ে ঢাকা শহরে বাসাভাড়া দেয়া ও খাবারের খরচ মিটিয়েও মাসের কিস্তি পরিশোধে অসুবিধা হত না।

কিন্তু বর্তমানে আয় রোজগার কমে যাওয়ায় ভীষণ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যেই এ হকারি করে কামানো টাকা থেকেই পুঁজি কমিয়ে কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন। কাঁধে টুকরি ঝুঁলিয়ে এবং শিশুটিকে নিয়ে বেশি হাঁটাহাঁটি করে বিক্রি করতে পারেন না। এ অবস্থায় কিভাবে ঢাকা শহরে টিকে থাকবেন তা ভেবে হতাশাগ্রস্ত বলে জানান শামসু।

এমইউ/এমআরএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]