কর্ণফুলী বাঁচাতে সাম্পান বাইচ

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩১ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২০

‘ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান/ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান। দইজ্জার কূলত বসত গড়ি/শিনা-দি ঠেহাই ঝড় তোয়ান।’ নাকিব খান, পার্থ বড়ুয়া আর রবি চৌধুরীর গাওয়া এই গানটিকে আবারও বাস্তব করে তুললেন চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র কর্ণফুলীর মাঝিরা।

ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল সাড়ে ৩টা ছুঁই-ছুঁই। কর্ণফুলীর পানিতে ইতোমধ্যেই ভাটার টান শুরু হয়ে গেছে। নদীর দক্ষিণ পাড়ের চরপাথরঘাটা ঘাট ঘেঁষে ১০টি সাম্পান একই রেখায় দাঁড়ানো। প্রতিটি সাম্পানে ১০ জন করে মাঝিমাল্লা। সবার অপেক্ষা হুইসেলের। হুইসেল বেজে উঠতেই শুরু হয় সাম্পান বাইচ। কিন্তু বাইচের প্রতিযোগীদের চেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াল ভাটার টান। সবগুলো সাম্পানকে স্রোত টেনে নিয়ে যাচ্ছে বঙ্গোপসাগরের মোহনার দিকে। কিন্তু না; তারা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান। ঘাম ঝরানো দাঁড় বেয়ে মাঝিমাল্লারা ঠিকই কর্ণফুলীর উত্তরপাড় অভয়মিত্র ঘাটে এসে পৌঁছান মাত্র পাঁচ মিনিটে! প্রচণ্ড স্রোত ঠেলে সবাইকে অবাক করে সাম্পান বাইচে প্রথম হন শেখ আহমদ মাঝি ও তার দল।

jagonews24

শনিবার বিকেলে কর্ণফুলী নদীতে মনোরম এই সাম্পান বাইচ দেখতে বিভিন্ন বয়সের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ভিড় করেন। বৈঠা নৌকা, ইঞ্জিনচালিত সাম্পান, নৌকা কিংবা স্পিডবোট নিয়ে নদীতে ঘুরে বেড়িয়েছেন তারা। উদ্দেশ্য সাম্পান খেলা বা বাইচ দেখা।

jagonews24

কর্ণফুলী দূষণের প্রতিবাদ জানাতে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার দ্বিতীয় দিনে আজ বিকেলে সাম্পান বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। সহযোগিতা করেছে চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র ও কর্ণফুলী নদী সাম্পান মাঝি কল্যাণ সমিতি।

jagonews24

প্রতিযোগিতায় সামান্য পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে মাদরাসাপাড়ার মোহাম্মদ তারেক ও তার দল, তৃতীয় স্থান অর্জন করে ইছানগর-বাংলাবাজার সাম্পান মালিক সমিতি। প্রথম হওয়া দলকে একটি মোটরসাইকেল, দ্বিতীয় দলকে একটি ফ্রিজ ও তৃতীয় দলকে ৩২ ইঞ্চি রঙিন টেলিভিশন পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয়।

jagonews24

প্রতিযোগিতায় প্রথমস্থান অর্জন করা শেখ আহমদ মাঝি জাগো নিউজকে বলেন, আমরা গত দুইদিন প্রশিক্ষণ নিয়েছি। জানতাম প্রতিযোগিতার সময় নদীতে ভাটির টান থাকবে তাই কৌশলের আশ্রয় নেই। ১৩ বছর ধরে প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছি, প্রতিবারই প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় হয় আমার দল। এবার প্রথম হয়ে আমি ও আমার দল অত্যন্ত আনন্দিত।

jagonews24

বাইচ দেখতে আড়াই শতাধিক ছোট-বড় নৌকা ও সাম্পান নিয়ে নদীতে ভিড় করেন উৎসুক জনতা। এছাড়া দুই পাড়েও ছিল হাজার হাজার মানুষ। তারা সাম্পান বাইচ দেখতে অধীর আগ্রহে বেলা ২টা থেকে অপেক্ষা করতে থাকেন।

jagonews24

কোনো কোনো দর্শনার্থীর নৌকায় ছিল মাইক ও শব্দযন্ত্র। সেখান থেকে ভেসে আসছিল কর্ণফুলী ও সাম্পান মাঝি নিয়ে লেখা বিভিন্ন জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান। ‘ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দিওয়ানা’, ‘কর্ণফুলীরে সাক্ষী রাখিলাম তারে’ গানের সঙ্গে নেচে-গেয়ে আনন্দ করেন তরুণ-তরুণীরা। এছাড়া বেজেছে ঢোলসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। সাম্পান খেলা উপলক্ষে বড় ইঞ্জিনচালিত স্টিমারের ছাদে শামিয়ানা দিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখান থেকেই বারবার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছিল।

jagonews24

দিনব্যাপী মেলা উপলক্ষে অভয়মিত্র ঘাটে বসে গ্রামীণ মেলা। সেখানে গৃহস্থালির বিভিন্ন সামগ্রী, হাঁড়ি-পাতিল, খেলনা ও অন্যসামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে। এসব কিনতে ভিড় করেছে শিশু-কিশোরের দল। এছাড়া নদীর উত্তরপাড় অভয়মিত্র ঘাটে ছিল মূল অনুষ্ঠানস্থল। প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন।

jagonews24

পুরস্কার বিতরণী সভায় বক্তারা বলেন, জনসাধারণের অসচেতনতা ও বেপরোয়া ব্যবহারে দিন দিন নদীগুলো অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। দখল ও ভরাটের করাল গ্রাসে অনেক নদী মরে গেছে। নদী বাঁচলে জীবন বাঁচবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে। তাই নদীকে বাঁচাতে জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ এই কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

jagonews24

বক্তারা আরও বলেন, কর্ণফুলীতেই চট্টগ্রাম বন্দর। দেশে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো বিকল্প বন্দর নেই। দখল-দূষণে কর্ণফুলী যদি গতিপথ হারায় তখন বন্দর বন্ধ হয়ে যাবে। তাই কর্ণফুলী রক্ষায় সকল আয়োজন চট্টগ্রাম বন্দরকেই করতে হবে। অথচ বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেদের খেয়ালখুশি মতো নদীর তীর ও নদী লিজ দিয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকার পরও কর্ণফুলীতে ড্রেজিং এবং পাড় দখলমুক্ত করেনি।

অতিথিরা বলেন, দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে কর্ণফুলীকে সচল রাখতে হবে। আজ সাম্পান খেলা ও চাটগাঁইয়া সাংস্কৃতিক মেলার মাধ্যমে কর্ণফুলী বাঁচানোর দাবি জানাতেই আমরা এসেছি।

আবু আজাদ/বিএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]