জেলেপাড়ায় অবসর, কর্ণফুলীর তীরে চলছে স্বপ্ন বুনন

আবু আজাদ
আবু আজাদ আবু আজাদ , নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০১:৩৭ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২০

চট্টগ্রামের ফিশারিঘাটে সেই চিরচেনা শোরগোল নেই। নেই মাছ ধরার ট্রলারের সেই ব্যস্ততা। হঠাৎ যেন নিস্তব্ধতা গিলে খেয়েছে সব। পাশেই কর্ণফুলীর তীরে সারি বেঁধে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে ফিশিং বোট আর ট্রলারগুলো। জেলেপাড়ায় আজ নিরন্তর অবসর।

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষার করতে ১৪ অক্টোবর থেকে টানা ২২ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ রেখেছে সরকার। তাই চট্টগ্রামের জেলেরা এখন কর্মহীন দিন কাটাচ্ছেন। তবে বসে থাকার সুযোগ যে তাদের খুব একটা নেই।

নিষেধাজ্ঞা ফুরোলেই আবারো সাগরে যেতে হবে। তাই কর্ণফুলীর তীরে এখন চলছে স্বপ্নের বুনন। জালের সুতায় আগামীর স্বপ্ন বুনছেন জেলেরা। চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট, ফিরিঙ্গিবাজার ও অভয়মিত্র ঘাট এলাকা ঘুরে এসব চিত্র দেখা যায়।

ctg-Jele

জেলেরা জানান, সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা এখন সাগরে মাছ শিকারে যাচ্ছেন না। কিন্তু আর মাত্র সপ্তাহ দুই। তার পরেই তো নতুন সিজন শুরু হবে। তাই এখন তারা আগামী দিনের জন্য জাল বুনে নিচ্ছেন। জেলেদের কেউ নতুন জাল বুনছেন, অনেকে আবার পুরোনো জালটি ঠিকঠাক করে নিচ্ছেন।

লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডারের জেলে হান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ‘গেল জ্যৈষ্ঠ মাসে সাগরে আইছি। সাগরের বিভিন্ন এলাকায় মাছ ধরছি। অভিযানের (নিষেধাজ্ঞা) তিনদিন আগে চট্টগ্রামে আসছি। এখন জালগুলো ঠিক করে নিতাছে জেলেরা। হের ফরে কেউ বাড়ি যামু, কেউ আবার ট্রলারেই থাকব।’

ctg-Jele-2

কোথায় কোথায় মাছ ধরেছেন জানতে চাইলে হান্নান বলেন, ‘এবার বেশিরভাগ সময় কক্সবাজারের নিচের দিকে মাছ ধরেছি। সালনার বয়া, বার্মা বর্ডার, বঙ্গোপসাগরে গ্যাস ক্ষেত্রের কাছাকাছি এলাকা থেকেও মাছ ধরেছি।’

তিনি জানান, জেলেরা অবসর পেলেই জাল বোনেন। সাগরে থাকার সময় জাল বোনার মতো সময় থাকে না। আগামী ২২ তারিখের মধ্যেই অধিকাংশ জেলেরা তাদের ট্রলারের পুরোনো জালগুলো ঠিকঠাক করে ফেলবেন। তবে লম্বা বন্ধের সময় (৬৫ দিন) তারা নতুন জাল বোনেন।

‘জাল বোনার জন্য সর্দার তেমন বেশি কিছু যে দেন তা নয়। মূলত আগামীর আশাতেই জেলেরা এই জাল বুনেছেন’ যোগ করেন এই জেলে।

ctg-Jele-3

রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে গিয়ে দেখা যায়, ফিশারিঘাট এলাকায় কর্ণফুলীর উত্তর পাড়ে নোঙর করে আছে হাজারেরও বেশি মাছের ট্রলার। প্রতিটি ট্রলারেই দু-একজন করে জেলে আছেন। জেলেদের কেউ তখনো শুয়ে আছেন আবার কেউ রান্না চড়িয়েছেন চুলায়। কেউ আবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বাড়ি যাওয়ার।

জেলেদের একজন বললেন, ‘সাত মাস পর বাড়ি যামু। এ কয়দিনে যা আয় হইছে, তা আগামী একমাস খেতে হবে। এলাকায় দেনা-পাওনা আছে, ওসবও মেটাতে হবে। কিছু বাজার-সদাই করছি।’

এ সময় নদীর পাড়ে অপেক্ষায় থাকা বাস দেখিয়ে তিনি বলেন, ৩৫ জন জেলে মিলে ওই বাসটা ভাড়া করেছেন। তারা সবাই নোয়াখালী যাবেন।

ctg-Jele-4

ভোলা মনপুরার বাসিন্দা তমিজউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘চার মাস আগে বাড়ি থেকে আসছি। এবার তেমন মাছ নেই, তাই আয় উপার্জনও ছিল না। কক্সবাজারে থাকতে কিছু টাকা বাড়িতে পাঠিয়েছিলাম, এখন হাত পুরোই খালি। মহাজন বেতন দেবে আরও কিছুদিন পরে। এর মধ্যে দাদনের টাকাও আছে। ট্রলারে থাকলে তো খাইতে পাই, এখন সেটাও বন্ধ। সবমিলিয়ে, আগামী একমাস কীভাবে চলব? বাড়ি গিয়েই বা কি খাব তা বুঝতে পারছি না।’

রফিক নামের আরেক মাঝি বলেন, ‘সরকারে নাকি চাল দেবে, কিন্তু আমরা কোনো কার্ড পাইনি। আমরা যারা ফিশিং বোটে থাকি, চট্টগ্রাম এলাকায় মাছ ধরি, তাদের মধ্যে শতকরা পাঁচজনও চাল পাইনি। ভালো ভালো লোকেরা পাইছে, আমরা পাইনি।’

ctg-Jele-6

মহেশখালীর জেলে জানে আলম জানান, তার ট্রলারের নাম শাহ আমানত। মাছ ধরা বন্ধ হলেও গত চারদিন ধরে জাল বুনেছেন। নতুন করে মাছ ধরা শুরু হলে যাতে অসুবিধা না হয়, সেই জন্যই অবসর পেলেও এই চারদিন তাকে জান বুনতে হয়েছে। আজকের মধ্যে জাল বোনা শেষ হয়ে গেলে রাতেই গাড়িতে উঠবেন।

তিনি বলেন, ‘গত জুন মাসের ২২ তারিখ সাগরে এসেছি। প্রায় ২০ লাখ টাকার মাছ শিকার করেছি। এ কয়দিন জান বুনেছি, এটাই নিয়ম। আজ জাল ডকে তুলে দিয়ে রাতেই গাড়িতে উঠব।’

এসআর/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]