গ্রাম আদালত কার্যকর রাখলে আদালতে মামলার চাপ কমবে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৭ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০২০

গ্রাম আদালত কার্যকর রাখতে পারলে আদালতের ওপর চাপ কমে যাবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। সে জন্যই সরকার গ্রাম আদালতকে যুগােপযােগী, জনবান্ধব ও অধিকতর কার্যকরী করার লক্ষ্যে ‘গ্রাম আদালত আইন-২০০৬’ সংশােধনের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ সম্পর্কিত আইনি কাঠামাে সংস্কার এবং সংশােধনীর ক্ষেত্রসমূহ চূড়ান্তকরণের উদ্দেশ্যে রোববার (২৯ নভেম্বর) ঢাকার একটি হােটেলে জাতীয় পর্যায়ের একটি পরামর্শ সভা আয়ােজন করা হয়। ইউরােপীয় ইউনিয়ন ও ইউএনডিপির সহায়তায় স্থানীয় সরকার বিভাগ এই পরামর্শ সভার আয়ােজন করে।

পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। শহর ও গ্রাম উভয় স্থানের মানুষের জন্য সরকারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। আমাদের অবশ্যই বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ সুবিধা দিতে হবে। গ্রাম আদালত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি দারুণ বিষয়। কারণ অনেক মানুষ ভুল বোঝাবুঝির কারণে আদালতের দ্বারস্থ হন, ফলে সেখানেও চাপ বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত ৩৭ লাখ মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। খুব ছোট ছোট বিষয় নিয়েও মামলা হচ্ছে। আমি মনে করি আমরা গ্রাম আদালতকে কার্যকর করতে পারলে আদালতের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে যাবে। এরফলে মানুষই সুবিধা পাবে, তাদের সময়- অর্থ সবই বেঁচে যাবে।

তিনি বলেন, গ্রাম আদালত আইন ২০০৬ সালে জারির পর ২০১৩ সালে প্রথম সংশােধনী এবং ২০১৬ সালে বিধিমালা জারি করা হয়। কিন্তু নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে গ্রাম আদালত যথাযথভাবে কার্যকরী করা সম্ভব হয়নি। গ্রাম আদালতের বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকারের মূলনীতিগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়। প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় দোষীকে অপরাধী বলা হয় কিন্তু গ্রাম আদালতে তাকে বলা হয় প্রতিবাদী। গ্রাম আদালতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলাে- এমনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাতে বিবাদমান পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সহাবস্থান, সহমর্মিতা, ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি ও সমঝােতা সৃষ্টি হয়, যাতে ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে পুনরায় বিরােধ সৃষ্টি হওয়ার সুযােগ বন্ধ হয়ে যায় এবং পুনর্মিলন ঘটে।

এ সভায় শিখন, সুপারিশ, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও প্রতিফলন এবং অর্জিত অভিজ্ঞতা ইত্যাদির আলােকে গ্রাম আদালতের আইনি কাঠামাে সংশােধনীর প্রস্তাবনা বিষয়ে বক্তাদের প্রদত্ত সুচিন্তিত অভিমত গ্রামপর্যায়ে স্থানীয় বিচারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করবে, জেলা পর্যায়ের আদালতগুলোতে মামলার সংখ্যা উল্লেখযােগ্য হারে হ্রাস করতে ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গ্রাম আদালত সক্রিয় করার কার্যক্রম পরিচালনায় একদশকজুড়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারের পাশে থাকায় ইউরােপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইউএনডিপি বাংলাদেশকে কৃতজ্ঞতা ও সাধুবাদ জানান মন্ত্রী।

সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, গ্রাম আদালতের মতো ইমিউক্যাবল সলিউশনের দিকে যদি আমরা যেতে পারি তাহলে সরকারি কর্মকর্তা এবং অন্যান্য নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত এই মামলাগুলো সহজে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। পেনাল কোডের অনেক ধারা আপসযোগ্য কারণ, যিনি এই পেনাল কোড প্রচলন করেছেন তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর বাঙালিদের মনমানসিকতা, সামাজিক বৈশিষ্ট্য এবং অপরাধের ধরন দেখে পেনাল কোডটি চালু করেছে। আমাদের দেশের মানুষে বড় একটি ট্রেন্ড হচ্ছে মিথ্যা মালালা দিয়ে আরেকজনকে ফাঁসিয়ে দেয়া। সে জন্য পেনাল কোডে কিছু ধারা আপসযোগ্য করা হয়েছে, যাতে দুই পক্ষ যদি মিলে যায় বিচারক যেন সেটি আপস করে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামগুলোকে আমরা শহরের সুবিধা দিতে পারি এবং গ্রামের মধ্যে যাতে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে পারি। আমরা যাতে পুলিশ-র্যাবের ওপর নির্ভরশীল না হই, আদালতের ওপর নির্ভরশীল না হই। নিজেদের সমস্যা যেন নিজেরা সমাধান বরতে পারি। সেটা করতে পারলে গ্রামেগঞ্জে শান্তি বিরাজ করবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরােপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত রেনসে তিরিঙ্ক ও ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি। সভায় অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ প্রকল্পের জাতীয় প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব মরণ কুমার চক্রবর্তী, স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী, প্রকল্প এলাকা থেকে আগত জেলা প্রশাসকবৃন্দ এবং বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ দ্বিতীয় পর্যায় প্রকল্পের সিনিয়র প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরদার এম আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভােকেট ও বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (২য় পর্যায়) প্রকল্পের আইন সংশােধন বিষয়ক পরামর্শক মাে. তাজুল ইসলাম তার মূল নিবন্ধে বলেন, আইনটি সংশােধনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে গ্রাম আদালতের আর্থিক এখতিয়ার বৃদ্ধি, অন্যান্য আইনের সাথে সামঞ্জস্য ও সুস্পষ্টতা আনয়ন, গ্রাম আদালত পরিচালন প্রক্রিয়া সহজতর করা, সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্রাম আদালতে নারীর অভিগম্যতা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নতুন বিষয়বস্তুগত এখতিয়ার যুক্ত করে বিরােধের পরিসর বৃদ্ধি করা।

আইএইচআর/বিএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]