ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের স্মৃতিতে বুলডোজার, ক্ষুব্ধ চট্টগ্রামবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ০৫ জানুয়ারি ২০২১

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত যাত্রা মোহন সেনগুপ্তের শত বছরের পুরনো স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টায় ক্ষোভে ফুঁসছে চট্টগ্রামের প্রগতিশীল শিল্পী-সাহিত্যিক ও সাধারণ মানুষ। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি করেছে তারা।

এর আগে সোমবার (৪ জানুয়ারি) সকালে নগরের কোতোয়ালি থানার রহমতগঞ্জে বাড়িটি দখলে নিতে যায় একটি মহল। এসময় সেখানে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের একজন নাজিরের উপস্থিতিতে শত বছরের পুরনো ভবনটি বুলডোজার দিয়ে ভাঙা শুরু করা হয়। পরে স্থানীয়দের বাঁধার মুখে ভবনটি সিলগালা করে দেয় প্রশাসন।

এদিকে ভবনটি রক্ষার দাবিতে মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ‘চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্র’। লিখিত বক্তব্যে চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আলীউর রহমান বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যে কয়জন বাঙালি ভারতবর্ষে ব্যাপক অবদান রেখেছিলেন, তাদের অন্যতম যাত্রা মোহন সেন, যতীন্দ্র মোহন সেন ও তার স্ত্রী নেলি সেন। তাদের প্রতিষ্ঠিত জেএম-সেন হল ব্রিটিশ আমল থেকে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত রহমতগঞ্জ এলাকার যাত্রামোহন সেনগুপ্তের বাড়িটিতে অবস্থান করেছেন মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা শওকত আলী, ড. আনসারী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, ব্যারিষ্টার আবদুল্লাহ রসুল প্রমুখ।

তিনি আরও বলেন, যাত্রা মোহন সেনের পুত্র যতীন্দ্র মোহন সেনকে চট্টগ্রামের মানুষ মুকুটহীন রাজা বলে অবহিত করতেন। তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি ১৮৮৫ সালে চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিই ব্যারিস্টারি করে আয় করা অর্থে বাড়িটি নির্মাণ করেন। ১৯২২-২৩ কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। তিনি পাঁচবার কলকাতার নির্বাচিত মেয়র ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে যুববিদ্রোহে নাগারখানা যুদ্ধে ও সরকারি টাকা লুটের মামলায় মাস্টার দা সূর্যসেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা পরিচালনা করেন।

jagonews24

আলীউর রহমান আরও জানান, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ছিলেন সর্বভারতীয় কংগ্রেসের নেতা। ১৯৩৩ সালের ২৩ জুলাই নিঃসন্তান অবস্থায় ব্রিটিশ ভারতের রাচিতে কারাবন্দি অবস্থায় মারা যান তিনি। তার স্ত্রী নেলি সেনগুপ্ত ১৯৭০ সাল পর্যন্ত রহমতগঞ্জ এলাকার বাড়িটিতে ছিলেন। ওই বছর তিনি ভারতের কংগ্রেস সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমন্ত্রণে চিকিৎসার জন্য সেখানে যান। এর মধ্যে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এরপর তিনি ভারতে চলে গেলে পাকিস্তান সরকার সেটিকে শত্রুসম্পত্তি ঘোষণা করে। স্বাধীনতার পর নেলি সেনগুপ্ত দেশে ফিরে দেখেন- তার বাড়িটি বেদখল হয়ে গেছে। ১৯৭৩ সালের ২৩ অক্টোবর তিনিও কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। পরে ১৯৭৫ সালে সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেই বাড়িতে ‘শিশুবাগ’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা পর শামসুদ্দিন মো. ইছহাক। এরপর থেকে তার সন্তানরা সেটি পরিচালনা করে আসছিলেন।

আলীউর রহমান বলেন, ‘যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত ও তার স্ত্রী নেলি সেনগুপ্ত নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান। এজন্য সরকার এই সম্পত্তিকে অর্পিতসম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। পরবর্তীতে তথাকথিত ওয়ারিশ সৃষ্টি করে জাল দলিল সৃজন করে আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ভবনটি ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে। যা চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য চিরতরে ধ্বংস করার একটি অপচেষ্টা।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশগুপ্ত, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক কবি আবুল মোমেন। মুঠোফোনে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন।

jagonews24

সাংবাদিক কবি আবুল মোমেন বলেন, ‘ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণে সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষা দেয়া আছে। এটি ঐতিহাসিক ভবন এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ। কীভাবে এসব সাংস্কৃতিক সম্পদ রক্ষা করা যাবে, তা সকলে মিলে রাষ্ট্রীয়ভাবে চিন্তা করতে হবে। অন্যথায় আমরা ভবন রক্ষায় মামলার দিকে যাব।’

রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘ভবনটি একদিকে ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত, অন্যদিকে হেরিটেইজ ভবনের আওতায় পড়ে। এজন্য সবরকার ভবনটিকে রক্ষায় ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করছি। চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক হিসেবে ভবনটি রক্ষা ও সংরক্ষণের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

পরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্ত্বরে আয়োজিত মানবন্ধনে রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘ব্রিটিশ ভারতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের রাজনীতি এ ভবনটিকে কেন্দ্র করে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের বাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে। তারা নানান স্লোগান দিয়ে বাড়িটি দখল করেছে। এতে সরকারি দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোমবার সকাল ১০টার দিকে এম ফরিদ চৌধুরীর ছেলে ফরহাদ ও ফয়সালসহ শতাধিক লোক বাড়িটি দখল নিতে আসেন। ফরহাদ ও ফয়সালের সঙ্গে যুবলীগ নেতা পরিচয় দেয়া গিয়াস উদ্দিন সুজন ও মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক তরুণ-যুবক স্কুলটির ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা পুলিশের উপস্থিতিতে স্কুলের শিক্ষক এবং সন্তানদের ভর্তি করাতে যাওয়া অভিভাবকদের ধাক্কা দিয়ে সেখান থেকে বের করে দেন।

jagonews24

পরে দুপুর ২টার দিকে সেখানে যান অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত। তিনি জানতে চান- ভবন কারা ভেঙেছেন, কেন ভাঙা হলো? জবাবে যুবলীগ নেতা গিয়াস উদ্দিন সুজন জানান, আদালতের আদেশে জেলা প্রশাসনের লোকজন তাদের ভবনের দখল বুঝিয়ে দিয়েছে, সেজন্য তারা ভাঙছেন। এসময় তরুণ-যুবকরা রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে অশোভন আচরণও করেন। তারা বলতে থাকেন- রানা দাশগুপ্তকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দাও, তার ওপর বুলডোজার চালিয়ে দাও। এসময় রানা দাশগুপ্ত বুলডোজারের সামনে বসে পড়েন। তার প্রতিরোধের মুখে জেলা প্রশাসন ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি সিলগালা করে দেয় । ভবনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে বলেও জানায় প্রশাসন।

এদিকে ঐতিহাসিক বাড়িটিতে ভাঙচুর চালানোর প্রতিবাদে সকালে মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। দুপুরে ‘চট্টগ্রামের বীর জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল করেছে সাধারণ মানুষ।

আঠারো শতকের খ্যাতিমান বাঙালি আইনজীবী যাত্রা মোহন সেনের গড়ে তোলা বাড়িটি স্বাধীনতার পর থেকে বেদখল হয়ে আছে। অর্পিতসম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত বাড়িসহ জমিটি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে শামসুদ্দিন মো. ইছহাক নামে এক ব্যক্তি ‘বাংলা কলেজ’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সর্বশেষ সেখানে ‘শিশুবাগ’ নামে একটি স্কুলের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল।

আবু আজাদ/এএএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]